
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এই যুগান্তকারী আইনটি দেশের হাওর, বাওড়, বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রদান করেছে। আইন অনুযায়ী, জলাভূমির ক্ষতিসাধন, অবৈধ দখল বা অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহারের দায়ে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে পরিবেশবাদীরা স্বাগত জানালেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। আইন যখন কাগুজে শক্তিতে সীমাবদ্ধ, তখন হাওরপাড়ের বোরো ফসলি জমিতে চলছে উচ্চমাত্রার রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার, যা নিঃশব্দে ধ্বংস করে দিচ্ছে দেশের মিঠা পানির অন্যতম প্রধান আধার—আমাদের হাওর, বাউড় ও বিলগুলোর বাস্তুসংস্থান।
কি-পয়েন্ট
# গত তিন দশকে ৫৭ শতাংশ হাওর জলাভূমি বিলুপ্ত হয়েছে
# নতুন আইন হলেও মাঠপর্যায়ে নেই কোনো কার্যকর তদারকি
# অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহারে ধ্বংস হাওরের জীববৈচিত্র্য
# কীটনাশনে-রাসায়নিকে নষ্ট হচ্ছে মাছের প্রজনন ক্ষমতা
# বিষাক্ত খাদ্যশৃঙ্খলে হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য ও প্রকৃতি
# অতিথি পাখির খাদ্যশৃঙ্খলে পড়েছে বিষের নেতিবাচক প্রভাব
# রাসায়নিকের প্রভাবে মৎস্যজীবীরা এখন চরম জীবিকা সংকটে
# মাঠপর্যায়ে রয়েছে কঠোর মনিটরিং ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাব
ধ্বংসের পরিসংখ্যান ও প্রেক্ষাপট:
আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আইইউসিএন’ এবং বৈশ্বিক পরিবেশ পোর্টাল ‘দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ’-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের পর থেকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দখলের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ একর জলাভূমি বিলুপ্ত হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর ও বিল অঞ্চল। গত তিন দশকে এসব অঞ্চলের ৫৭ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দখলের কারণে। জলাভূমি হলো প্রকৃতির ‘কিডনি’, যা পানি পরিশোধন করে। কিন্তু এই কিডনি আজ বিষাক্ত রাসায়নিকের ভারে নিজেই অসুস্থ। আইন প্রণীত হলেও মাঠপর্যায়ে কৃষি জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক ও সার রোধে কার্যকর তদারকির অভাব রয়েই গেছে।
আইনে অপরাধ ও শাস্তির বিধান:
‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন, ২০২৬’-এর বিভিন্ন ধারায় জলাভূমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। আইনের অধীনে দেশের যেকোনো অঞ্চলের নিবন্ধিত হাওর, বাওড়, বিল বা প্রাকৃতিক জলাশয় বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে ভরাট করা বা সীমানা দখল করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া জলাশয়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বা প্রবাহ পরিবর্তন করা, বিষটোপ বা অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহার করে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা, এবং পরিযায়ী পাখিসহ সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনা হবে।
আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহে উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো জলাশয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ বা বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করে জলজ প্রাণিকুলের ক্ষতিসাধন করেন, তবে তিনি সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনধিক ৩ বছর কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়া জলাভূমি ভরাট বা এর প্রাকৃতিক রূপরেখা পরিবর্তনের মতো অপরাধে একই রকম শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ৪ নম্বর ধারার অধীনে গঠিত ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর’ (ডিবিএইচডব্লিউডি) এখন থেকে এই সংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করবে।
কীটনাশকের মরণফাঁদ:
হাওর ও বিল অঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বোরো ধান। তবে ধান বাঁচাতে কৃষকরা এখন কীটনাশকের ওপর অন্ধের মতো নির্ভরশীল। বোরো মৌসুমে ফসলের সুরক্ষায় কৃষকেরা কার্বোফুরান ও ডায়াজিনন গ্রুপের মারাত্মক সব কীটনাশক ব্যবহার করছেন। কীটনাশকের বিষয়ে সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের কৃষক করিম মিয়া বলেন, ‘পোকার আক্রমণে যখন চোখের সামনে সোনালি ফসল নষ্ট হতে দেখি, তখন বুক কেঁপে ওঠে। ধারদেনা করে জমি চাষ করি, তাই ফসল বাঁচাতে উচ্চমাত্রার কীটনাশক ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকে না।’
একই হাওরের আরেক কৃষক মো. রইছ উদ্দিন বলেন, ‘গত কয়েক বছরে পোকার উপদ্রব এত বেড়েছে যে, সপ্তাহে অন্তত দুবার করে কীটনাশক দিতে হয়। আমরা জানি এই বিষ পানির সাথে মিশছে, কিন্তু ধান না হলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।’
রাসায়নিক সারের নীরব থাবা:
কীটনাশকের পাশাপাশি ফলন বাড়াতে রাসায়নিক সারের অতিব্যবহার এখন হাওর ও বাওড় অঞ্চলের মাটির উর্বরতা ও পানির গুণমান নষ্ট করছে। কিশোরগঞ্জের ইটনা হাওর এলাকার কৃষক আব্দুর রাজ্জাকের মতে, ‘আমরা মনে করি যত বেশি ইউরিয়া ও টিএসপি দেব, ধান তত বেশি হবে। কিন্তু এই সার বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যখন বিলে যায়, তখন বিলের পানি একদম কালচে হয়ে যায়। আগের মতো মাছও নেই, আর জমির মাটিও দিন দিন শক্ত হয়ে যাচ্ছে।’
মৎস্যজীবীদের চোখে হাওরের বর্তমান অবস্থা:
এদিকে বিষাক্ত পানির কারণে জীবিকা হারিয়ে দিশেহারা হাওর, বাওড় ও বিলপাড়ের মৎস্যজীবীরা। দেখার হাওর এলাকার প্রবীণ মৎস্যজীবী সুবল দাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘হাওরে এখন আর আগের মতো চিতল, পাবদা বা আইড় মাছ চোখে পড়ে না। বিষাক্ত পানির কারণে পোনা মাছগুলো শুরুতেই মরে ভেসে উঠছে। আমাদের জীবিকা এখন হুমকির মুখে। আগে এক জাল ফেললে যে পরিমাণ মাছ পেতাম, এখন সারাদিনে তার সিকিভাগও পাই না।’
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও ভয়াবহ প্রজনন সংকট:
সার ও কীটনাশকের এই দ্বিমুখী আঘাত মৎস্য প্রজননকে ধ্বংস করছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আনিসুর রহমান জানান, ‘বোরো জমি থেকে ধুয়ে আসা সার ও কীটনাশক মা মাছের ডিম্বাশয় স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দিচ্ছে। এছাড়া, মাছের প্রধান খাদ্য ‘জুপ্ল্যাঙ্কটন’ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফলে মাছ ডিম ছাড়লেও পোনা মাছের বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এটি হাওর ও বিল অঞ্চলের প্রাকৃতিক প্রজনন চক্রের জন্য একটি অশনিসংকেত।’
পরিবেশবাদীদের ভাষ্য:
কীটনাশক শুধু মাছ নয়, অতিথি পাখিদের জন্যও হুমকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, ‘জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক যখন হাওর ও বাউড়ে মিশে, তখন পুরো জলাভূমি মারণফাঁদে পরিণত হয়। বিষাক্ত শামুক খেয়ে পরিযায়ী পাখিরা মারা যাচ্ছে অথবা চারণভূমি পরিবর্তন করছে। এভাবে চলতে থাকলে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়বে। শুধু তাই নয়, এই বিষাক্ত পদার্থ পরোক্ষভাবে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খল বা ‘ফুড চেইন’-এ প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি।’
পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, ‘আইন প্রণয়ন একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, কিন্তু এটি কার্যকর করাই মূল চ্যালেঞ্জ। হাওরের মাটি ও পানির ধরন অনুযায়ী কার্বোফুরান বা ডায়াজিনন গ্রুপের মতো মারাত্মক কীটনাশক ভূগর্ভস্থ পানিকেও বিষাক্ত করে তুলছে। কেবল নীতিমালা দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়; দীর্ঘমেয়াদে হাওরের প্রাণবৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে হলে কৃষকদের হাতে-কলমে বিকল্প জৈব বালাইনাশক ও সার পৌঁছে দেওয়া এবং তা ব্যবহারের জন্য ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি।’
সরকারি উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ:
মাঠপর্যায়ের এই পরিস্থিতির বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তারা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলছেন, তারা কৃষকদের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) এবং জৈব সার ব্যবহারের পরামর্শ দেন। কিন্তু কৃষকরা দ্রুত ফলন পেতে রাসায়নিকের দিকেই ঝুঁকে থাকেন। তাদের মতে আইন থাকলেও কৃষকের বিকল্প অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কেবল কঠোরতা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
উত্তরণের পথ:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন পাস যথেষ্ট নয়। কৃষি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে গভীর সমন্বয় প্রয়োজন। তাদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাওর উন্নয়ন অধিদপ্তরের সঙ্গে কৃষি বিভাগের সমন্বয় ও মনিটরিং সেল গঠন। কৃষকদের রাসায়নিকের বদলে ফেরোমোন ট্র্যাপ ও জৈব সারে ব্যাপক ভর্তুকি প্রদান। হাওর, বাওড় ও বিলের পানি ও মাটি নিয়মিত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা। এবং কৃষকদের অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কুফল সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া।