#ওলবাকিয়া প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া যা মশার ডেঙ্গু সংক্রমণ রোধ করে
#দেশের বিজ্ঞানীরা দেশি ও বিদেশি মশার সফল সংকরায়ণ ঘটিয়েছেন
# এই বিশেষ মশা কামড়ালেও মানুষের শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ায় না
#ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ ৭৭ শতাংশ কমেছে
#ঢাকার আবহাওয়ার উপযোগী বিশেষ ওলবাকিয়া মশার স্ট্রেইন প্রস্তুত
#‘ডব্লিউ-এএলবি-বি২-ঢাকা’ বিশেষ স্ট্রেইনটি গরমেও বংশবৃদ্ধিতে সক্ষম
# ভালো মশা ছাড়ার পর এলাকায় ফগিং বা বিষ ছিটালেও মশা মরবে না
ডেঙ্গু কী জিনিস, তা কেবল তিনিই বোঝেন—যার শরীরে এই ভাইরাসটি একবার কামড় বসিয়েছে। হাড়ভাঙা অসহ্য যন্ত্রণা, তীব্র জ্বর, চোখের কোটরে প্রচণ্ড ব্যথা আর রক্তের প্লাটিলেট নামতে নামতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যাওয়া দিনগুলো যে কতটা বিভীষিকাময়, তা কোনো পরিসংখ্যান বা শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এটি কেবল একটি রোগ নয়; এটি একটি পুরো পরিবারের ঘুম কেড়ে নেওয়া এক দুঃস্বপ্ন।
মশা মারার চিরাচরিত ধোঁয়া (ফগিং) কিংবা রাসায়নিকের বিষাক্ত স্প্রে আমাদের এই নরকযন্ত্রণা থেকে বিন্দুমাত্র মুক্তি দিতে পারছে না। প্রতিদিন মশার কয়েল আর স্প্রের বিষাক্ত ধোঁয়ায় আমাদের ফুসফুস ভারী হচ্ছে, অথচ ড্রেন থেকে শুরু করে ঘরের কোণে বহাল তবিয়তে রাজত্ব করে যাচ্ছে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা।
রাজধানী মাহখালী দক্ষিণপাড়া এলাকার বাসিন্দা আহমেদ রেজওয়ান (৩৫) গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে টানা ১২ দিন হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। সুস্থ হয়ে ফিরে আসার পর সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘শরীরের প্রতিটি হাড় যেন কেউ হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙে দিচ্ছিল। প্লাটিলেট যখন ১০ হাজারে নামল, তখন মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছি। সেই ১২টি দিন আমার পুরো পরিবারের জন্য ছিল এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্ন।’ এটি কেবল আহমেদ রেজওয়ানের গল্প নয়, এটি আজ বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা:
অনেকেই মনে করেন ডেঙ্গু শুধু বর্ষাকালের একটি সাধারণ রোগ। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের দিকে তাকালে শরীর শিউরে ওঠে। ২০২৩ সাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। সে বছর সরকারি হিসেবেই আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি এবং প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি মানুষ। ২০২৪ সালেও ডেঙ্গু তার দাপট বজায় রাখে এবং রেকর্ডসংখ্যক মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হন। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়ায় ১ লাখ ১ হাজার। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালেও ডেঙ্গু থামেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেটা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ২ হাজার ৫৬২ জন মানুষ এবং মৃত্যু হয়েছে ৪১২ জনের। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, প্রচলিত মশা নিধন পদ্ধতি বাংলাদেশে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এবং একটি স্থায়ী বৈজ্ঞানিক সমাধানের সময় এসেছে।
নতুন সমাধান ‘ওলবাকিয়া’ পদ্ধতি
বিষ ছিটানোর এই ব্যর্থ নাটকের বাইরে বেরিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথে হাঁটছেন। বিষ নয়, বরং মশা দিয়েই মশা মারার এক জাদুকরী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সামনে এসেছে— যার নাম ‘ওলবাকিয়া’ পদ্ধতি। যেখানে ল্যাবরেটরিতে তৈরি বিশেষ এক ধরনের ‘ভালো মশা’ প্রকৃতিতে ছেড়ে দিয়ে ডেঙ্গুর বংশবিস্তার চিরতরে থামিয়ে দেওয়া হয়। ওলবাকিয়া হলো প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া একটি ব্যাকটেরিয়া, যা বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ পোকামাকড়ের দেহে বাস করে। এটি প্রজাপতি, মৌমাছি এমনকি ফলের মাছির শরীরেও থাকে। কিন্তু যে এডিস মশা ডেঙ্গু ছড়ায়, তাদের শরীরে এই ব্যাকটেরিয়াটি প্রাকৃতিকভাবে থাকে না। বিজ্ঞানীরা এই প্রাকৃতিক অভাবটিকেই বিজ্ঞানের মাধ্যমে পূরণ করেছেন যা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম।
যেভাবে কাজ করে এই ‘ভালো মশা’
বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে এই ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া এডিস মশার ডিমের ভেতর সফলভাবে প্রবেশ করিয়েছেন। এই ব্যাকটেরিয়াযুক্ত মশাকেই গবেষকরা বলছেন ‘ভালো মশা’। এটি প্রকৃতিতে ছেড়ে দিলে মূলত দুটি বৈজ্ঞানিক উপায়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করে।
ভাইরাস ব্লক করা: ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া এডিস মশার দেহের ভেতরের পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করে নিজে বেঁচে থাকে। ফলে ডেঙ্গু ভাইরাস মশার শরীরে বংশবৃদ্ধি করার মতো প্রয়োজনীয় শক্তি পায় না। অর্থাৎ ওলবাকিয়া এবং ডেঙ্গু ভাইরাসের মধ্যে মশার শরীরের ভেতরেই এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ওলবাকিয়া এই প্রতিযোগিতায় জয়ী হয় এবং ভাইরাসটিকে দুর্বল করে ফেলে। এ কারণে মশার শরীরে ভাইরাস নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায়, ওই মশা মানুষকে কামড়ালেও আর ডেঙ্গু ছড়াতে পারে না।
প্রাকৃতিক বন্ধ্যাত্বকরণ: ল্যাবে তৈরি ওলবাকিয়াযুক্ত পুরুষ মশা যখন বাইরের সাধারণ বুনো স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন সেই ডিমগুলো আর ফুটে বাচ্চা হয় না। একে বলা হয় ‘সাইটোপ্লাজমিক ইনকম্প্যাটিবিলিটি’। আর ওলবাকিয়াযুক্ত স্ত্রী মশা যখন সাধারণ পুরুষ মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন তাদের পরবর্তী সব প্রজন্মই ওলবাকিয়া নিয়ে জন্মায়। এভাবে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট এলাকার প্রায় সব মশা ওলবাকিয়াযুক্ত হয়ে যায়। এটি একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না এবং প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট না করেই মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণ করে।
কাজের কৌশল:
বিজ্ঞানীরা ল্যাবে এই প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়াযুক্ত পুরুষ ও স্ত্রী মশা তৈরি করেছেন। প্রকৃতিতে ছাড়ার পর এরা মূলত দুটি প্রধান কৌশলে কাজ করে।
দমন কৌশল: এই কৌশলে লোকালয়ে শুধুমাত্র পুরুষ ওলবাকিয়া মশা ছাড়া হয়। যেহেতু পুরুষ মশা মানুষকে কামড়ায় না, তাই এতে মানুষের কোনো ক্ষতি হওয়ার ভয় থাকে না। এই ভালো পুরুষ মশাগুলো যখন প্রকৃতির সাধারণ বুনো স্ত্রী মশার সাথে মিলিত হয়, তখন ওই স্ত্রী মশার ডিমগুলো আর ফুটে বাচ্চা হয় না। এভাবে ধীরে ধীরে ওই এলাকায় মশার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমতে থাকে। এটি একটি স্বল্পমেয়াদী কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা যা দ্রুত মশার উপদ্রব কমাতে সাহায্য করে।
প্রতিস্থাপন কৌশল: এই কৌশলে ল্যাব থেকে উভয় লিঙ্গের ওলবাকিয়া মশা ছাড়া হয়। ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াটি বংশপরম্পরায় মায়ের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে স্থানান্তরিত হয়। ওলবাকিয়াযুক্ত একটি স্ত্রী মশা যখন সাধারণ মশার সঙ্গে মিলিত হবে, তার পরবর্তী সব প্রজন্মই ওলবাকিয়া নিয়ে জন্মাবে। এভাবে কয়েক মাসের মধ্যে পুরো এলাকার সাধারণ ক্ষতিকর মশাগুলো ওলবাকিয়াযুক্ত নির্দোষ মশায় প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়। এটি সবচেয়ে টেকসই পদ্ধতি কারণ এটি প্রকৃতিতে নিজেই নিজেকে টিকিয়ে রাখে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা ও সাফল্য
বিশ্বজুড়ে অলাভজনক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড মস্কিটো প্রোগ্রাম’ (ডব্লিউএমপি) ওলবাকিয়া মশা নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করছে। বিশ্বের ১৬টিরও বেশি দেশে এই পদ্ধতির সফল প্রয়োগ হয়েছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি কতটা কার্যকর।
ইন্দোনেশিয়া: সেখানে তিন বছরের এক ট্রায়ালে দেখা গেছে, ওলবাকিয়াযুক্ত মশা ছাড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ ৭৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আর ডেঙ্গুজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার কমেছে প্রায় ৮৬ শতাংশ। এই সাফল্য বিশ্বের বিজ্ঞানীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলে এই পদ্ধতি প্রয়োগের পর মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ানো প্রায় ৯৮ শতাংশ বন্ধ গেছে। দেশটির সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোকে এখন ডেঙ্গুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
ব্রাজিল ও কলম্বিয়া: ব্রাজিলের কয়েকটি শহরে ওলবাকিয়া মশা ছাড়ার পর ডেঙ্গুর সংক্রমণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এমনকি ব্রাজিল সরকার আগামী ১০ বছরে কোটি কোটি মানুষের সুরক্ষায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় মশা উৎপাদনকারী কারখানা স্থাপনের কাজ করছে। ডব্লিউএমপি-এর পরিচালক ড. স্কট ও’নিল বলেন, বাংলাদেশ বা ইন্দোনেশিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোতে ওলবাকিয়া পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সম্পৃক্ততা ও গবেষণা
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ঢাকার আবহাওয়ার উপযোগী এই ‘ভালো মশা’ নিয়ে ২০১৮-২০১৯ সালের দিকে গবেষণার প্রাথমিক পরিকল্পনা শুরু করে। ২০২১-২২ সালের দিকে সরাসরি ল্যাবরেটরিতে সফলভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ওলবাকিয়া পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণার ফলাফল ২০২৪ সালে বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক জার্নাল ‘সাইন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, ঢাকার স্থানীয় এডিস মশার সঙ্গে ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়ার সংকরায়ণে তৈরি নতুন স্ট্রেইন ‘ডব্লিউ-এএলবি-বি২-ঢাকা’ ল্যাব পরীক্ষায় ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর সক্ষমতা প্রায় ৯২.৭ শতাংশ কমিয়ে দিতে সক্ষম।
আইসিডিডিআর,বি-এর প্রধান বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ শফিউল আলমের নেতৃত্বে দেশীয় বিজ্ঞানী এবং অস্ট্রেলিয়ার কিউআইএমআর বার্গোফার মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একদল গবেষক যৌথভাবে এই গবেষণাটি সম্পন্ন করেছেন। ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ‘ভালো মশা’র শরীরে একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া রয়েছে যা সম্পূর্ণ অক্ষতিকর। এটি কোনো জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএমও) মশা নয়। ওলবাকিয়া পদ্ধতি বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হতে পারে।
কেন এটি বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে ওলবাকিয়া পদ্ধতি গেম-চেঞ্জার হতে পারে। গবেষকদের মতে, আবদ্ধ বাক্সে ফগিংয়ের কার্যকারিতা বেশি পাওয়া গেলেও খোলা বাতাসে এর কার্যকারিতা সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ। খোলা জায়গায় ফগিং করতে গেলে এর বিকট শব্দ শুনেই এডিস মশা উড়ে পালিয়ে যায়। আইসিডিডিআর,বি এবং সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরীক্ষায় দেখা গেছে, বছরের পর বছর একই ওষুধ ব্যবহারের ফলে মশা সেই বিষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে ফেলেছে। ওলবাকিয়া পদ্ধতি সফলভাবে প্রয়োগ করা গেলে দেশের চিকিৎসা খাতের ওপর থেকে ডেঙ্গুর চাপ স্থায়ীভাবে হ্রাস পাবে এবং মশার ওষুধের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি বন্ধ হবে। এটিই হতে পারে ডেঙ্গু থেকে মুক্তির সবচেয়ে টেকসই ও স্থায়ী পথ।
বিটি-র ব্যর্থতায় ওলবাকিয়াই শেষ ভরসা
২০২৩ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ‘বিটিআই’ নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া আমদানির মাধ্যমে ‘জৈব নিয়ন্ত্রণ’ পদ্ধতির সূচনা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে মানহীন ও অকার্যকর রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়েছে, যার পেছনে জনগণের কোটি কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এখানেই ওলবাকিয়া পদ্ধতি অনন্য। এটি কোনো আমদানিকৃত রাসায়নিক নয় যা দিয়ে সহজে টেন্ডারবাজি করা সম্ভব। এটি সরাসরি আইসিডিডিআর,বি-র ল্যাবরেটরিতে স্থানীয় মশার সঙ্গে সংকরায়ণ করে তৈরি করা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার বদলে প্রকৃতির নিজস্ব শক্তিকেই এখানে স্থায়ী সমাধান হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ঢাকার জন্য ‘ডব্লিউ-এএলবি-বি২-ঢাকা’ উপযোগী কেন?
রাজধানী ঢাকার আবহাওয়ার ওপর ভিত্তি করে আইসিডিডিআর,বি-র গবেষকরা যে ‘ডব্লিউ-এএলবি-বি২-ঢাকা’ স্ট্রেইন তৈরি করেছেন, তা বাংলাদেশের জন্য তিনটি কারণে উপযোগী।
স্থানীয় মশার সংকরায়ণ: অস্ট্রেলিয়ার ল্যাবরেটরিতে ঢাকার বুনো এডিস মশার সাথে ওলবাকিয়া আক্রান্ত মশার প্রজনন করানো হয়েছে। ফলে নতুন মশার স্ট্রেইনটি ঢাকার আবহাওয়ার সাথে সম্পূর্ণ খাপ খাওয়ানো।
গরমেও বংশবৃদ্ধি স্বাভাবিক: ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ঢাকার তীব্র গরম এবং আর্দ্রতায় এই ‘ভালো মশা’গুলোর ডিম পাড়ার ক্ষমতা এবং ওড়ার শক্তি সাধারণ মশার মতোই সমান।
কীটনাশক প্রতিরোধী ক্ষমতা: ঢাকার সাধারণ এডিস মশাগুলো বিষের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে ফেলেছে। বিজ্ঞানীরা ওলবাকিয়া মশাগুলোকে এমনভাবে তৈরি করেছেন, যা স্থানীয় মশার সেই প্রতিরোধী গুণটি ধারণ করে। এর মানে হলো, ওলবাকিয়া মশা ছাড়ার পর এলাকায় বিষ ছিটালেও ‘ভালো মশা’গুলো মরবে না, বরং টিকে থেকে বংশবিস্তার করবে!
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, আমরা মাঠপর্যায়ে এই ওলবাকিয়া মশার ট্রায়াল শুরু করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এজন্য সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের আইনি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। সরকার অনুমতি দিলেই আমরা ফিল্ড ট্রায়াল শুরু করতে পারব। এটি সফল হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের জন্য এটি হবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, আমরা গত কয়েক বছর ধরে দেখছি যে, ফগিং বা লার্ভিসাইডের মতো প্রচলিত পদ্ধতিতে মশা আর মরছে না। মশা এখন কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় ওলবাকিয়া পদ্ধতি আমাদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে। তবে এটি এক দিনে কাজ করবে না, অন্তত ৬ মাস থেকে ১ বছর ধৈর্য ধরে এই মশা প্রকৃতিতে ছাড়তে হবে এবং পর্যবেক্ষণ করতে হবে।


