
ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) লিমিটেডের স্থায়ী প্রকৃতির কাজে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োজিত ফিল্ড টেকনিশিয়ান ও অফিস স্টাফদের স্থায়ী নিয়োগ, শ্রম আইন অনুযায়ী ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং চাকরিচ্যুত ১০৪ শ্রমিককে পুনর্বহালের দাবি জানানো হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিএটিবি ফিল্ড টেকনিশিয়ান ও অফিস স্টাফ শ্রমিক কল্যাণ ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এসব দাবি জানানো হয়।
বৈঠকের সভাপতি, উপস্থিত আলোচক, অতিথি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আগত শ্রমিক ভাই-বোনদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য শুরু করেন শ্রমিকদের প্রতিনিধি। একই সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনের জন্য ফেডারেশনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি।
বক্তব্যে বিএটিবির স্থায়ী পদে অস্থায়ী নিয়োগ এবং শ্রম আইন ও বিধি লঙ্ঘনের মূল বিষয় তুলে ধরে বলা হয়, বিএটিবির বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত প্রায় ৫ শতাধিক ফিল্ড টেকনিশিয়ান ও অফিস স্টাফ দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানির নিয়মিত ও স্থায়ী প্রকৃতির কাজ করে আসছেন। কিন্তু তাদের সরাসরি কোম্পানির অধীনে নিয়োগ না দিয়ে MSM Logistics (প্রা.) লিমিটেড এবং ISSL-এর মতো তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
শ্রমিকদের দাবি, ২০০৭ ও ২০১০ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে কোম্পানির কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও তারা চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা এবং স্থায়ী কর্মীদের সমতুল্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বক্তব্যে বলা হয়, ফিল্ড টেকনিশিয়ানরা কোম্পানির কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে তামাক চাষের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম, কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ প্রদান, বীজ বিতরণ, বীজতলা প্রস্তুতকরণ, চারা রোপণ, পরিচর্যা, সার ও কীটনাশক ব্যবহারে পরামর্শ, তামাক সংগ্রহ, শুকানো, গ্রেডিং, বেল তৈরি, গুণগত মান যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
এসব কাজ কোম্পানির নিয়মিত কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং সারা বছর ধরে পরিচালিত হয়। পূর্বে এসব পদ কোম্পানির স্থায়ী পদ ছিল বলেও শ্রমিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
বক্তব্যে আরও বলা হয়, অতীতে একই ধরনের পদে সরাসরি স্থায়ী কর্মী নিয়োজিত ছিলেন। পূর্ববর্তী কর্মীরা কোম্পানির বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও মুনাফায় অংশগ্রহণের সুবিধা ভোগ করতেন। অথচ বর্তমানে একই ধরনের কাজ দীর্ঘদিন ধরে করেও শ্রমিকরা সমান সুযোগ-সুবিধা ও চাকরির নিরাপত্তা পাচ্ছেন না।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
শ্রমিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ১৩ জুন ২০২৬ তারিখে বিএটিবির স্থায়ী পদে স্থায়ীকরণের দাবিতে মহাপরিদর্শক, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বরাবর আবেদন করা হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার অনুরোধ জানানো হয়।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া কলকারখানা পরিদর্শক তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রদান করেন। শ্রমিকদের দাবি, ওই প্রতিবেদনে তারা যে পদে কাজ করেন, তা স্থায়ী প্রকৃতির এবং দীর্ঘদিন ধরে তাদের অস্থায়ী হিসেবে কাজ করানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে ঠিকাদারি সংস্থাও স্থায়ী পদে লোক নিয়োগ করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে দুঃখজনকভাবে ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন শ্রমিকরা।
১০৪ শ্রমিককে চাকরিচ্যুতির অভিযোগ
শ্রমিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থায়ী পদে স্থায়ীকরণের দাবিতে গণতান্ত্রিকভাবে কার্যক্রম শুরু করলে বিএটিবি ও ঠিকাদারি সংস্থা ১০৪ জন শ্রমিককে চাকরি থেকে টারমিনেশন করে। এছাড়া আরও অনেক শ্রমিককে অটো রিজাইন, সাসপেন্ড ও গণহারে বদলি করা হয়।
এমনকি শ্রমিকদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে রংপুরের কোতোয়ালি থানায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
শ্রমিকদের দাবি, তাদের আন্দোলন ও দাবি বন্ধ করার জন্য পুলিশ ও এলাকার প্রভাবশালীদের দিয়ে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হয়রানি করা হয়েছে এবং এখনো করা হচ্ছে।
শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্যবস্থা না নেওয়ার দাবি
বৈঠকে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বিএটিবি ও ঠিকাদারি সংস্থার শ্রম আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর অবগত হওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
বরং কলকারখানা পরিদর্শনের যেসব কর্মকর্তা নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শ্রমিকরা।
এ বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
শ্রমিকদের পাঁচ দফা দাবি
বৈঠকে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত পাঁচটি দাবি তুলে ধরা হয়।
১. চাকরিচ্যুত ১০৪ শ্রমিককে পুনর্বহাল: টারমিনেশন করা ১০৪ জন শ্রমিককে অবিলম্বে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে। হয়রানি ও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের অভিযোগের প্রতিকার হিসেবে আইনসম্মতভাবে দাবি উত্থাপনকারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অন্যায় আচরণ, ভয়ভীতি বা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২. স্থায়ী নিয়োগ: দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী প্রকৃতির কাজ করা ফিল্ড টেকনিশিয়ান ও সংশ্লিষ্ট অফিস স্টাফদের স্থায়ী নিয়োগব্যবস্থা করতে হবে।
৩. তদন্ত প্রতিবেদন বাস্তবায়ন: গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, কুষ্টিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে তা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।
৪. শ্রম আইন ও বিধিমালার বাস্তবায়ন: শ্রমিকদের নিয়োগের প্রকৃতি, চাকরির মেয়াদ, দায়িত্ব, প্রাপ্য সুবিধা এবং নিয়োগকারী ও প্রকৃত কর্মস্থলের প্রতিষ্ঠানের আইনগত দায়িত্ব যাচাই করে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৫. ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা ও চাকরির নিরাপত্তা: প্রযোজ্য আইন ও বিধান অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ড, মুনাফায় অংশগ্রহণ, চাকরির নিরাপত্তা এবং অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা পর্যালোচনা ও নিশ্চিত করতে হবে।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচারের আহ্বান
বৈঠকে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, শ্রম অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়, শ্রমিকদের উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায্য শুনানি এবং আইনানুগ প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে বিএটিবি এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়, শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি, চাকরিচ্যুতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা এবং চাকরির স্থায়িত্ব ও প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে স্বচ্ছ অবস্থান তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি শ্রম আইন, বিধি এবং আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে চলতে হবে।
সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের প্রতি বিষয়টি বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরার অনুরোধ জানিয়ে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, যাতে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে আসে এবং শ্রমজীবীদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক আলোচনার মাধ্যমে, শ্রমিকদের মর্যাদা ও আইনের শাসন নিশ্চিত হোক বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে।
বিএটিবি ফিল্ড টেকনিশিয়ান এবং অফিস স্টাফ শ্রমিক কল্যাণ ইউনিয়নের সভাপতি আরিফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সামিউল ইসলামের পক্ষ থেকে এসব দাবি জানানো হয়।