ঢাকারবিবার , ২৫ অক্টোবর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. নিরাপদ খাদ্য

শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তা শেখাতে প্রাথমিকে কৃষি শিক্ষার তাগিদ

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩:৫৮ বিকাল

Link Copied!

শিশুদের সঠিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, সুস্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গঠন এবং দেশের ভবিষ্যতের টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই কৃষিশিক্ষা ও বই পড়ার অভ্যাস গড়ার ওপর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কেবল গতানুগতিক শ্রেণিকক্ষের পড়ালেখা নয়, বরং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, লাইব্রেরি এবং ব্যবহারিক কৃষিশিক্ষার মধ্যে একটি মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। এটি করা সম্ভব হলে শিশুদের মধ্যে প্রকৃতি, মাটি, পানি ও কৃষকের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং তারা ভবিষ্যতের সচেতন ভোক্তা, কৃষি-উদ্ভাবক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) ক্যাটালগার মো. আশরাফুল আলম এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী শিক্ষক মোছা. তাহেরা আক্তারের এক যৌথ নিবন্ধে এসব তথ্য ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

# স্কুল লাইব্রেরিতে শিশুতোষ কৃষি ও পুষ্টির বই রাখার প্রস্তাব
# প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতি মাসে কৃষি দিবসের সুপারিশ
# বিদ্যালয়ে সবজি বাগান ও লার্নিং প্ল্যাটফর্ম গড়ার আহ্বান

শিশুদের অপুষ্টির চিত্র ও বাস্তবতা :
প্রতিবেদনে দেশের শিশুদের পুষ্টি ও শারীরিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশই শিশু। কিন্তু এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিশু অপুষ্টি এখনো এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে খর্বতা ও পুষ্টিহীনতার হার বেশ উদ্বেগজনক।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউএনআইসিইএফ)-এর ২০২৪ সালের এক রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে নিবন্ধে জানানো হয়, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি তিন শিশুর মধ্যে প্রায় দুইজন শিশুই খাদ্য-দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। এছাড়া প্রায় এক কোটি শিশুর খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় খাদ্যবৈচিত্র্যের গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবস্থা নিরসনে শৈশব থেকেই নিরাপদ খাদ্য, সুষম খাদ্য উপাদান এবং কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পর্কে শিশুদের মনে স্পষ্ট ও সঠিক ধারণা দেওয়া জরুরি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ক্যাটালগার মো. আশরাফুল আলম জানান, একটি শিশুর জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের মূল ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিকেই। শৈশব থেকেই যদি শিশুদের নিরাপদ খাদ্য, সুষম খাদ্য উপাদান এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতে অপুষ্টি সংকট কাটানো সহজ হবে। আর এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরি সবচেয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংস্থার সুপারিশ ও স্কুল লাইব্রেরির ভূমিকা :
কৃষি শিক্ষার প্রসারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারকে (লাইব্রেরি) একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, স্কুলভিত্তিক বাগানগুলোকে কেবল খাদ্য উৎপাদনের প্রথাগত ক্ষেত্র হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলোকে একটি বাস্তব লার্নিং প্ল্যাটফর্ম (শিখন কেন্দ্র) হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিশুরা হাতে-কলমে কৃষি, পুষ্টি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও জীবনদক্ষতার নানা পাঠ গ্রহণ করবে।

নিবন্ধে IFLA-UNESCO-এর ২০২৫ সালের ‘স্কুল লাইব্রেরি ম্যানিফেস্টো’ তুলে ধরে বলা হয়েছে, মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষায় স্কুল লাইব্রেরির ভূমিকা অপরিসীম। লাইব্রেরিতে সহজ ভাষায় লেখা শিশুতোষ কৃষি বই, ছবিনির্ভর বই, স্থানীয় ফল-সবজির পরিচিতি, পুষ্টি ও পরিবেশভিত্তিক গল্প এবং কৃষি প্রযুক্তির বই রাখা উচিত। এর ফলে খাবার কীভাবে উৎপাদিত হয় এবং পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক কী, তা শিশুরা আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারবে।

চার উপাদানের সমন্বিত শিক্ষা পরিবেশ :
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক পর্যায়ে সফল কৃষিশিক্ষা নিশ্চিত করতে চারটি মূল উপাদানের মেলবন্ধন প্রয়োজন। এগুলো হলো—বিদ্যালয়ে একটি সক্রিয় লাইব্রেরি, শিশুদের উপযোগী কৃষি ও পুষ্টির বই, বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক এবং বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি ছোট সবজি বাগান। এই চার উপাদান একত্রিত হলে শিশুদের জন্য এক চমৎকার ও কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য যেন দুর্বল না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। UNICEF-এর ২০২৫ সালের MICS জরিপের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পাঠদক্ষতা এবং ৩৯.২ শতাংশের মৌলিক গণনাদক্ষতা রয়েছে। আর আর্লি-গ্রেড লার্নিংয়ের ফলাফলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ২৪ শতাংশ মৌলিক পাঠ এবং ১৮ শতাংশ মৌলিক গণিতের সব মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে। তাই কৃষিশিক্ষাকে মূল বিষয়গুলোর ওপর বাড়তি চাপ হিসেবে না এনে, বাংলা বা গণিত শেখার একটি প্রায়োগিক ও উপভোগ্য মাধ্যম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সহকারী শিক্ষক মোছা. তাহেরা আক্তার বলেন, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষায় মূল শিখন দক্ষতার ঘাটতি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে কৃষিশিক্ষাকে অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে চাপিয়ে না দিয়ে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত শেখার একটি আনন্দদায়ক ও প্রায়োগিক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সবজি বাগান আর লাইব্রেরির বইয়ের মাধ্যমে শিশুরা খেলাচ্ছলেই এটি শিখতে পারবে।’

জলবায়ু সংকট ও প্রাণিজ আমিষের সচেতনতা :
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সামলাতে কৃষিশিক্ষা কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তাও প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে জলবায়ুজনিত বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে তিন কোটে শিশুর পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে শিশুদের দীর্ঘ সময় বিদ্যালয় থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। এ অবস্থায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, মাটির ক্ষয় রোধ, গাছপালার গুরুত্ব এবং লবণাক্ত আবহাওয়ায় কৃষির খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপায়গুলো শিশুদের জানা প্রয়োজন।

পাশাপাশি প্রাণিজ আমিষের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। মাছ, ডিম, দুধ ও মাংসের মতো প্রাণিজ খাদ্য শিশুদের টিস্যু গঠন, পেশির বিকাশ ও মেধা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিদ্যালয়ের অভিভাবক সম্মেলনের মাধ্যমে পরিবারের মা-বাবাদের সহজলভ্য উপাদানে সুষম ও নিরাপদ খাবার তৈরির সঠিক নিয়ম শেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

বাস্তবায়নে যৌথ উদ্যোগের আহ্বান :
প্রাথমিক পর্যায়ে এই শিক্ষা বাস্তবায়নে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)-এর পাশাপাশি দেশের শীর্ষ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি), বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (কিআরআরিআই) এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান ব্যবহার করে শিশুদের উপযোগী গল্প, ছবি ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

এছাড়াও প্রতি মাসে একদিন বিদ্যালয়ে ‘কৃষি জ্ঞান বিতরণ দিবস’ পালনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যেখানে স্থানীয় কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা, গবেষক বা পুষ্টিবিদরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে শিশুদের সঙ্গে সরাসরি অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বিনিময় করবেন। সব স্তরের সমন্বিত এই উদ্যোগ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, বিজ্ঞানমনস্ক ও কৃষিবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে যৌথ প্রতিবেদনে আশা প্রকাশ করা হয়।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কার মধ্যে দেশের যেসব অঞ্চলে বৃষ্টি হতে পারে

হাতিয়ায় নদীভাঙন রোধে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি

কাজীপুরে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই বৃদ্ধের মৃত্যু

সাভারে বায়ুদূষণ রোধে নাগরিকদের সম্পৃক্ততার আহ্বান

আজ বৃষ্টি হবে যেসব এলাকায়, বাড়তে পারে দিনের তাপমাত্রা

পঞ্চগড়ে তাপমাত্রা ১৭.৪ ডিগ্রি, শীতের আগমনী বার্তা

টানা চতুর্থবার কমল স্বর্ণের দাম, ভরি কত?

বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ, অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা

৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি ও স্মার্ট ফিচারে ভিভো ওয়াই৩২

vivo Y32: An All-in-One Smart Performer

OPPO Launches ‘Make Your Puja Moment’ Photography Campaign

ফটোগ্রাফিতে আগ্রহীদের জন্য অপো নিয়ে এলো ‘মেক ইওর পূজা মোমেন্ট উইথ অপো’ কনটেস্ট