
বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চামড়াশিল্পকে বিবেচনা করা হয়। দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে এক সময় টেক্সটাইলের পরেই ছিল এই শিল্প। বিশেষ করে ঈদ-উল-আজহার সময় যে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ হয়, তা দেশের চামড়াশিল্পের মূল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু এই ঈদকেন্দ্রিক চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণনে বছরের পর বছর ধরে যে ধরনের অব্যবস্থা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, এবং নীতিনির্ধারণী দুর্বলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা একদিকে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান কাঁচামালের অপচয় ঘটায়, অন্যদিকে দেশ হারায় কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা। এই প্রতিবেদনে আমরা এই শিল্পের প্রেক্ষাপট, ঈদকেন্দ্রিক কাঁচা চামড়ার অপচয়, তার অর্থনৈতিক প্রভাব, এর অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট, এবং সম্ভাবনার দিকগুলো বিশ্লেষণ করে তুলব।
বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে চামড়াশিল্পের ইতিহাস ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হলেও স্বাধীনতার পর এই খাত পরিকল্পিতভাবে শিল্পায়নের পথে এগোয়। ১৯৮০’র দশকে ঢাকার হাজারীবাগ ছিল দেশের চামড়াশিল্পের মূল কেন্দ্র। এখানে গড়ে ওঠে শতাধিক ট্যানারি, যা দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করে। তবে পরিবেশদূষণ, শ্রমিক নিরাপত্তা এবং পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের কারণে এই শিল্প ধীরে ধীরে সংকটে পড়ে। পরবর্তীতে সরকার ট্যানারি শিল্পকে সাভারে স্থানান্তর করলেও কাঙ্ক্ষিত পরিকল্পনা ও পরিকাঠামো ছাড়া এই স্থানান্তর কার্যকর হয়নি। এর ফলে শিল্পটি পড়ে নতুন সমস্যার মুখে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০০-৩৫০ মিলিয়ন বর্গফুট চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ৫০-৬০ শতাংশ আসে কোরবানির ঈদের সময়। কিন্তু এই চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে যে অব্যবস্থা রয়েছে, তা এই বিপুল সম্পদকে বছরে বছরে নষ্ট করে দিচ্ছে। চামড়াশিল্পে প্রায় ৮ লাখের বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। অথচ সরকারি নীতিনির্ধারণ, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি নীতিতে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতায় এ শিল্প তার পুরো সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে গিয়েও মুখ থুবড়ে পড়ছে।