ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

প্রজনন হার ২০২৩: জনসংখ্যার ভবিষ্যৎ চিত্র ও বৈশ্বিক বৈষম্য

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৫ জুলাই ২০২৫, ১২:১৯ বিকাল

Link Copied!

শীতের সকাল। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি গ্রামে সদ্যসূর্য ওঠা আকাশের নিচে হাঁটছেন এক বৃদ্ধা। তার কাঁধে একটি মুড়ি কাপড়, হাতে ছেলের ছোট বাচ্চাটি। ছেলে-মেয়েরা শহরে কাজ করে, নাতিকে দেখভাল করেন তিনি। পাশের বাড়ির এক তরুণী চুলে তেল দিয়ে জানালার ধারে বসে ভাবছে—সন্তান কি নেব? এখন না পরে? এই প্রশ্ন শুধু তার একার নয়, বরং গোটা বিশ্বের নারীসমাজের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ, ২০২৩ সালে দাঁড়িয়ে বিশ্বের অর্থনীতি, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে একটি অনাড়ম্বর পরিসংখ্যান: প্রজনন হার।

প্রজনন হার অর্থাৎ একটি নারীর গড় জীবদ্দশায় কতটি সন্তান জন্ম দেন—এই সংখ্যাটি পরিমাপে ছোট হলেও তার প্রভাব বিশাল। এটি শুধু একটি দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারই নির্ধারণ করে না, এটি বলে দেয় সেই জাতির শ্রমবাজার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যতও।

২০২৩ সালের প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে যে সংখ্যাগুলো দেখা গেছে, তাতে কিছু চমকপ্রদ বৈসাদৃশ্য ধরা পড়েছে। যেমন, দক্ষিণ কোরিয়ায় একজন নারীর সন্তানসংখ্যা মাত্র ০.৭। অপরদিকে পাকিস্তানে সেই সংখ্যা ৩.৬। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন, জাপানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়—বিশ্ব একদিকে বয়স্কদের দিকে ধাবিত হচ্ছে, অন্যদিকে কিছু অঞ্চলে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের দ্বারপ্রান্তে।

পূর্ব থেকে পশ্চিমে: এক বিপরীত প্রবণতা
পূর্ব এশিয়ার তিনটি প্রধান দেশ—জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন—বর্তমানে এক ভয়াবহ জনসংখ্যাগত চ্যালেঞ্জের মুখে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০২৩ সালের গড় প্রজনন হার ০.৭, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। অর্থাৎ, প্রত্যেক ১০ জন নারীর বদলে ভবিষ্যতে কেবল ৭ জন নতুন শিশু জন্মাবে। কল্পনা করুন, প্রতিটি প্রজন্মে কী পরিমাণ জনসংখ্যা হ্রাস পাবে! জাপানের অবস্থাও কাছাকাছি—১.২। এর ফলে দেশটিতে স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, গ্রামগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ছে, এবং কর্মক্ষম লোকের অভাবে অর্থনীতি ধীর হয়ে পড়ছে।

চীনের হার ১.৩—একসময়ের “এক সন্তান নীতি”-র প্রভাব এখানেই এসে জমেছে। যদিও এখন সরকার উল্টো তৃতীয় সন্তানের জন্য প্রণোদনা দিচ্ছে, কিন্তু সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কেউই আর বড় পরিবার চায় না। শহুরে জীবনের ব্যয়, নারীর কর্মজীবন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—সবকিছু মিলিয়ে সন্তান সংখ্যা কমছে।

অপরদিকে দক্ষিণ এশিয়া এখনো তুলনামূলক উচ্চ হারে অবস্থান করছে। পাকিস্তানের গড় সন্তান ৩.৬, বাংলাদেশের ২.২, ভারতের ২.০। এ অঞ্চল একসময় জনসংখ্যা বিস্ফোরণের প্রতীক ছিল, কিন্তু এখন এখানে দেখা যাচ্ছে নিয়ন্ত্রিত ও স্থিতিশীল প্রবণতা। বিশেষত বাংলাদেশ তার পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতায় অগ্রগতি এনে জন্মহার অনেক কমিয়ে এনেছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্ব: উচ্চ হার ধরে রাখা দেশগুলো
ইসরায়েলে প্রজনন হার ২.৯, যা উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। দেশটির সামাজিক কাঠামো—বিশেষ করে ধর্মীয় পরিবারগুলোর সন্তান ধারণের প্রবণতা এখানে বড় ভূমিকা রাখে। পাকিস্তানের মতো মুসলিম দেশগুলোতেও সন্তান জন্মকে এখনো ‘আল্লাহর দান’ হিসেবে দেখা হয়। এই বিশ্বাস, সঙ্গে শিক্ষা ও নারীর কর্মসংস্থান হ্রাস—সব মিলিয়ে জন্মহার তুলনামূলকভাবে বেশি।

মিশরের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রজনন হার এখনো ৩ এর ঘরে, যা জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে সচল রাখে। তবে এমন প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য, পানি, বাসস্থান, এবং কর্মসংস্থানের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করে।

পশ্চিমা বিশ্ব: উদ্বেগের হার
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো উন্নত দেশগুলোতে প্রজনন হার এখন ১.৬–১.৪-এর মধ্যে। যা ‘Population Replacement Level’ (২.১)-এর নিচে। অর্থাৎ, যদি কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে ২.১-এর নিচে জন্মহার ধরে রাখে, তাহলে তার জনসংখ্যা সংকুচিত হবে।

এই হার কমে যাওয়ার পেছনে প্রধানত রয়েছে—নারীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা ও চাকরি গ্রহণের হার, দেরিতে বিয়ে বা সন্তান নেওয়ার প্রবণতা, মহামারির প্রভাব, শহরভিত্তিক ব্যয়বহুল জীবন, এবং যৌথ পরিবারের বিলুপ্তি। একসময়ের ‘পারিবারিক মূল্যবোধে’ গর্বিত পশ্চিমা সমাজগুলো এখন ‘ইনডিপেনডেন্ট লাইফ’-এ মনোনিবেশ করছে। এর ফলে সন্তান জন্ম দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা হ্রাস পাচ্ছে।

ফলে পশ্চিমা বিশ্ব এখন অভিবাসী নির্ভর হয়ে পড়েছে। ল্যাটিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আসা তরুণ কর্মশক্তি দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার উৎপাদন এবং সেবাখাত টিকে আছে।

ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকা: ক্রমবর্ধমান চাপ
ব্রাজিলের প্রজনন হার এখন ১.৬, যা অনেকটা উন্নত দেশের সমান। শহরায়ন ও মিডিয়া সচেতনতা এখানে কাজ করেছে। কিন্তু অপরদিকে নাইজেরিয়া, উগান্ডা, ইথিওপিয়া, ডিআর কঙ্গো বা দক্ষিণ সুদান—এই অঞ্চলের অনেক দেশে প্রজনন হার এখনো ৪–৬ এর মধ্যে। এই উচ্চ হার একদিকে অল্পবয়সী জনগোষ্ঠী তৈরি করে, যা শ্রমবাজারের জন্য ভালো; কিন্তু অপরদিকে তা সরকারের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান ও অবকাঠামোগত দিক দিয়ে।

বাংলাদেশ: মাঝামাঝি অবস্থানে
বাংলাদেশ ২০২৩ সালে ২.২ হার ধরে রেখেছে। এটি একসময় ৬ ছিল, এখন প্রায় ‘স্ট্যাবিলিটি জোন’-এ পৌঁছেছে। এর পেছনে কাজ করেছে গণসচেতনতা, পরিবার পরিকল্পনার সরবরাহ, নারীশিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু অঞ্চলে জন্মহার আবার বাড়ছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এই হার দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ জনগোষ্ঠী এখন দেশের প্রধান শক্তি, তবে যদি তারা শিক্ষিত না হয় বা দক্ষ না হয়, তাহলে তা বোঝায় পরিণত হতে পারে।

প্রজনন হারের ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক পরিণতি
বিশ্বে এখন এক অদ্ভুত বাস্তবতা বিরাজ করছে—একদল দেশ জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন, আরেকদল অতিরিক্ত জনসংখ্যায় হিমশিম খাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন বা ইতালির মতো দেশে সরকার অর্থ দিচ্ছে সন্তান নিতে। কর্মঘণ্টা কমানো হচ্ছে, ছুটি বাড়ানো হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের মতো দেশে কিশোরী মায়েদের সংখ্যা বাড়ছে, অনেক পরিবারে এখনো চার-পাঁচটি সন্তান দেখা যায়।

জাতিসংঘ বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা মাত্র ৯টি দেশে কেন্দ্রীভূত হবে—ভারত, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, কঙ্গো, ইথিওপিয়া, তানজানিয়া, মিসর, ইন্দোনেশিয়া ও আমেরিকা। এর মানে, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যও নতুন করে রচিত হবে।

প্রজনন হার একটি নিছক সংখ্যা নয়—এটি একটি জাতির আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের মূলচাবি। এটি বলে দেয়, একটি দেশ কতটা প্রস্তুত তার ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য। একজন নারী কত সন্তান নেবেন, তা শুধু তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়—তার শিক্ষা, জীবনের নিরাপত্তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সবকিছু তার ওপর প্রভাব ফেলে।

বিশ্বের যাত্রাপথ আজ দুই মেরুর দিকে এগোচ্ছে—কিছু দেশে শিশুদের অভাব, অন্যদিকে কিছু দেশে খাদ্যের অভাব। এই বৈষম্য ঘোচাতে হলে দরকার হবে বৈশ্বিক বোঝাপড়া, স্থানীয় উদ্যোগ এবং প্রজনন সচেতনতা। কারণ, একটি দেশের ভবিষ্যৎ ঠিক করে সে দেশের আজকের জনসংখ্যাগত সিদ্ধান্ত। ঠিক যেমন একটি শিশুর কান্না জাগিয়ে তোলে একটি জাতির জেগে ওঠার ঘন্টাধ্বনি।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস