
ভোরবেলা সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর প্রতিটি কোণে মানুষ ঘুম থেকে জেগে ওঠে। কেউ স্কুলে যায়, কেউ কাজে বের হয়, কেউবা কৃষি কাজ শুরু করে। কিন্তু এই সাধারণ জীবনের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক অদৃশ্য ভয়—একটা দেশ আরেকটা দেশকে কীভাবে দেখে, কতটা আস্থাশীল বা শত্রু মনে করে। সেই ভয়ের গভীরে রয়েছে রাজনীতি, ইতিহাস, ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তাহীনতার জটিল মিশ্রণ। ২০২৫ সালের পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত একটি জরিপ বলছে, বিশ্বজুড়ে মানুষ কাকে সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করছে, তা আর কেবল কূটনীতিক বা সেনাপ্রধানদের আলোচনার বিষয় নয়—এটা এখন সাধারণ মানুষের উপলব্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
এই প্রতিবেদনে আমরা সেই বৈশ্বিক মনোভাব বিশ্লেষণ করব। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, ঐতিহাসিক পটভূমি, সামরিক সংঘাত এবং কূটনৈতিক উত্তেজনার পেছনের বাস্তবতাগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এই ভয় ও শত্রুভাবাপন্নতার অনুভব।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কাছে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে চীন। ৪২ শতাংশ আমেরিকান মনে করে চীন এখন তাদের স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এটি কেবল বাণিজ্যযুদ্ধ বা প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল নয়, বরং সামরিক আধিপত্য, তাইওয়ান প্রশ্ন এবং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আধিপত্য বিস্তারের উদ্যোগ এই প্রতিক্রিয়ার মূল চালিকা শক্তি। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় শুরু হওয়া কূটনৈতিক শীতলতা বাইডেন প্রশাসনেও অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, কানাডাবাসীদের ৫৯ শতাংশই মনে করে সবচেয়ে বড় হুমকি যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। এই তথ্য শুনে প্রথমে বিস্মিত হওয়ার মতো মনে হতে পারে, তবে এতে কানাডার স্বাধীনতাবোধ, সীমান্ত প্রশ্ন, পরিবেশনীতি এবং রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পার্থক্যের প্রভাব রয়েছে। ট্রাম্প আমলে মেক্সিকো সীমান্তে গঠিত দেয়াল ও অভিবাসন নীতির কড়া অবস্থান উত্তর প্রতিবেশী কানাডার দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলেছিল।
ইউরোপের দিকে নজর দিলে, বিশেষত পশ্চিম ইউরোপে, রাশিয়ার প্রতি বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি প্রবলভাবে লক্ষ করা যায়। ফ্রান্সের ৫০ শতাংশ, জার্মানির ৫৯ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসের ৫৭ শতাংশ, এবং সুইডেনের ৭৭ শতাংশ মানুষ মনে করে রাশিয়া হচ্ছে তাদের নিরাপত্তার প্রধান হুমকি। পোল্যান্ডে এই অনুপাত আরও বেশি—৮১ শতাংশ। ইউক্রেন যুদ্ধ, ন্যাটোর পূর্ব ইউরোপে সম্প্রসারণ এবং রুশ হ্যাকার আক্রমণ এসব দেশের জনমনে এই ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও আছে। হাঙ্গেরির মতো দেশ, যেটি রাশিয়ার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখে, সেখানে মাত্র ৩৩ শতাংশ মানুষ রাশিয়াকে হুমকি মনে করে। এ থেকে স্পষ্ট যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক অভিমুখ জনমতের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে।
গ্রিসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তুরস্ক। ৭৪ শতাংশ গ্রিক নাগরিক তুরস্ককে সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে দেখে। এটি এক ঐতিহাসিক শত্রুতা—সাইপ্রাস দ্বীপ প্রশ্ন, এজিয়ান সাগরে সীমান্ত বিরোধ, এবং ধর্মীয়-জাতিগত বিভাজন এই অনুভূতির পেছনে কাজ করছে।
এশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতীয় জনগণের ৪১ শতাংশ পাকিস্তানকে সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করে। এটি এক পুরোনো শত্রুতা, যা ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের বিভাজনের পর থেকেই চলে আসছে। তিনটি যুদ্ধ, কাশ্মীর ইস্যু, সন্ত্রাসবাদ, সীমান্তে বারবার সংঘর্ষ—এই সব মিলেই ভারতীয়দের দৃষ্টিতে পাকিস্তান এখনো এক ‘প্রধান শত্রু’। পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে উল্লেখ না থাকলেও আন্দাজ করা কঠিন নয় যে, একইরকমভাবে তারা ভারতকে শত্রু হিসেবে দেখে।
জাপানের নাগরিকদের ৫৩ শতাংশ চীনকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সামুদ্রিক বিরোধের ইতিহাস রয়েছে। চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিও জাপানের জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ৪০ শতাংশ নাগরিক উত্তর কোরিয়াকে প্রধান হুমকি মনে করে, যা স্বাভাবিক। সীমান্তে দুই দেশের সেনাবাহিনীর সরাসরি মুখোমুখি অবস্থান, পারমাণবিক পরীক্ষা এবং দুঃসাহসী ক্ষেপণাস্ত্র মহড়া দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ।
ইসরায়েলিদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় হুমকি ইরান, যেখানে ৫২ শতাংশ নাগরিক এই দেশটিকে তাদের শত্রু হিসেবে দেখে। এ অঞ্চলের ভূরাজনীতি চিরকালই জটিল। হিজবুল্লাহ, হামাস, সিরিয়া ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের প্রতি ইরানের সমর্থন এবং পারমাণবিক কর্মসূচি ইসরায়েলের দুশ্চিন্তার কারণ।
তুরস্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ইসরায়েল, যেখানে ৪৩ শতাংশ তুর্কি নাগরিক এমনটা মনে করেন। এই পরিসংখ্যান অনেককে অবাক করতে পারে, তবে এতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং গাজা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নের প্রতিফলন রয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, তুরস্ক এখন আগের মতো পশ্চিমাপন্থী নয়, বরং নতুনভাবে নিজের পরিচয় গড়ে তুলছে।
আফ্রিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, কেনিয়ার ২৫ শতাংশ মানুষ সোমালিয়াকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে মনে করে। এই অঞ্চলজুড়ে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গি হামলা, সীমান্তে অনুপ্রবেশ এবং জলসম্পদের প্রশ্নে সংঘর্ষ রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ৩৫ শতাংশ নাগরিক মনে করে যুক্তরাষ্ট্রই তাদের প্রধান হুমকি। এটি কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক অভিমুখের দিকনির্দেশনা। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এবং পশ্চিমা প্রভাব দক্ষিণ আফ্রিকার সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে।
লাতিন আমেরিকায় দৃশ্যপটটা আরও ভিন্ন। মেক্সিকোর ৬৮ শতাংশ নাগরিক মনে করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সবচেয়ে বড় হুমকি। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি, মাদকবিরোধী অভিযান, সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ এবং অর্থনৈতিক শোষণের অভিযোগ এই অনুভূতির পেছনে আছে। আর্জেন্টিনার ২৪ শতাংশ এবং ব্রাজিলের ২৯ শতাংশ নাগরিকও যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি মনে করে। এই পরিসংখ্যান গ্লোবাল সাউথ বনাম গ্লোবাল নর্থের এক অন্তর্নিহিত উত্তেজনার ইঙ্গিত দেয়।
এই পুরো চিত্রটি বিশ্বের এক গভীর বিভাজনের প্রতিচ্ছবি। পশ্চিম ইউরোপ রাশিয়াকে হুমকি মনে করে, অথচ আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার বহু দেশ যুক্তরাষ্ট্রকেই তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে দেখে। এটি কেবল ভূরাজনীতি নয়, বরং ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল মিশ্রণ।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের এই জরিপ শুধু দেশের সরকারের কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন নয়, বরং সাধারণ মানুষের মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। এটি আমাদের দেখায়, কিভাবে যুদ্ধ, দখল, অর্থনৈতিক আধিপত্য, ধর্মীয় বিভাজন এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা আমাদের চিন্তাভাবনাকে আকার দেয়।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কনফ্লিক্ট নিউজ এবং রাজনৈতিক বক্তৃতা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে দ্রুত প্রভাবিত করে। এক দেশের নাগরিক অন্য দেশের সংস্কৃতি বা জনগণের প্রতি যে শত্রুভাব পোষণ করে, তা অনেকাংশেই রাষ্ট্রের প্রচারণা এবং মিডিয়া পরিবেশের ফসল।
অথচ এই শত্রুতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বিশ্বের প্রতিটি জাতির সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে এক অভিন্নতা—নিরাপদ জীবন, শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যত এবং পারস্পরিক সম্মান। জরিপের ফলাফলে আমরা যাদের শত্রু বলে দেখছি, তারা হয়তো অন্যদিন আমাদের ব্যবসায়িক অংশীদার, সাংস্কৃতিক সহযোগী বা কূটনৈতিক মিত্র হয়ে উঠতে পারে।
এই জরিপ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কেবল রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সাধারণ মানুষের চিন্তাজগতে প্রভাব বিস্তার করে। শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ার জন্য এই মানসিক বিভাজন কাটিয়ে ওঠা এক বড় চ্যালেঞ্জ। সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার—আমরা কি সত্যিই একে অপরকে এত ভয় পাই, নাকি আমাদের ভয়টি তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে?
বিশ্ব যখন বারবার যুদ্ধ, সংঘাত এবং হুমকির মুখে পড়ে, তখন এমন একটি গবেষণা আমাদের শেখায়—শত্রু কে, এই প্রশ্নটা কখনোই কেবল সামরিক বা কূটনৈতিক নয়, এটি মূলত মনস্তাত্ত্বিক। এবং এই মনস্তত্ত্বই গড়ে দেয় আগামী দিনের সম্পর্ক, সংঘাত ও সম্ভাবনার দিকরেখা।