
হাসান মাহমুদ: বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের হার গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে এইডস নির্মূলের জাতীয় ও বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ জার্নাল-এর ১১তম খণ্ডের প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে। ‘রাইজিং এইচআইভি ইন বাংলাদেশ: আ ওয়েক-আপ কল’ শীর্ষক এই নিবন্ধটিতে সংক্রমণের বর্তমান গতিপ্রকৃতি এবং তা মোকাবিলার বিজ্ঞানভিত্তিক কৌশলের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
নিবন্ধটিতে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। নিবন্ধে দেখা গেছে, ২০২০ সালে দেশে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৫৮, যা ২০২৪ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৪৩৮-এ দাঁড়িয়েছে। প্যাথলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে এইচআইভিকে কেবল একটি সংক্রামক রোগ নয়, বরং এটি একটি প্রগতিশীল এবং ধ্বংসাত্মক ইমিউনোপ্যাথলজিক্যাল প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষকগণ জানিয়েছেন, এই ভাইরাসটি মানবদেহের সিডিফোর প্লাস টি-লিম্ফোসাইট (সিডি৪+ টি-লিম্ফোসাইট) কোষকে সরাসরি আক্রমণ করে, যা রোগীর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়।
এদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে এইডস নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জাতিসংঘের নির্দেশনায় ‘৯৫-৯৫-৯৫’ কৌশলের মাধ্যমে কাজ করছে। এই বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার মূল উদ্দেশ্য হলো, এইচআইভি আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশকে রোগ শনাক্তকরণ বা পরীক্ষার আওতায় আনা, শনাক্ত হওয়া ৯৫ শতাংশ মানুষকে জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) প্রদান করা এবং চিকিৎসার আওতায় থাকা ৯৫ শতাংশ আক্রান্তের শরীরে ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা।
গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাইলা আওয়াল এই নিবন্ধে বলা হয়েছে, এইচআইভি সংক্রমণের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তি যক্ষ্মা, ফাঙ্গাল সংক্রমণ এবং বিভিন্ন প্রাণঘাতী ম্যালিগন্যান্সির ঝুঁকিতে থাকেন। এছাড়া এটি দীর্ঘস্থায়ীভাবে হৃদরোগ, কিডনি এবং স্নায়ুতন্ত্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। লেখক সতর্ক করে বলেন , ‘ভাইরাসটি প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায় না থেকে এখনই আমাদের ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে হবে।’
এইচআইভি সংক্রমণ সারাদেশে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি বরং কিছু নির্দিষ্ট উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এর বিস্তার তীব্রতর হচ্ছে। সিরাজগঞ্জ জেলাকে বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক ‘রেড জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে শনাক্ত হওয়া রোগীদের প্রায় ৭৩ শতাংশই ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী।
যশোরের এআরটি সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৪০ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২৫ জনই ১৭-২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী। অন্যদিকে, রাজশাহীতে গত ১০ মাসে ২৮ জন এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে, যাদের একটি বড় অংশ ২০-৩৫ বছর বয়সী পুরুষ এবং তারা সমকামী সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত।
সংক্রমণের প্রধান কারণসমূহ:
বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণ বর্তমানে একটি ‘কনসেন্ট্রেটেড এপিডেমিক’ বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ মহামারি হিসেবে রূপ নিয়েছে। এর বিস্তারের পেছনে নিবন্ধটিতে নিম্নোক্ত কারণগুলোকে প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে:
অনিরাপদ উপায়ে মাদক গ্রহণ: নিবন্ধে সিরাজগঞ্জ জেলাকে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৭৩ শতাংশই ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবহৃত সুঁচ বা সিরিঞ্জ শেয়ার করার প্রবণতা এইচআইভি সংক্রমণের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ ও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিস্তার: গবেষণায় রাজশাহী ও যশোরের মতো জেলাগুলোতে সংক্রমণের উচ্চ হার লক্ষ্য করা গেছে। এর পেছনে পুরুষ সমকামী (এমএসএম) ও যৌনকর্মীদের মতো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অরক্ষিত যৌন মিলনের প্রবণতাকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তরুণ প্রজন্মের অসচেতনতা: যশোরের এআরটি সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, নতুন আক্রান্তদের একটি বড় অংশই ১৭-২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী। অল্প বয়সে যৌন জীবনে প্রবেশ এবং এইচআইভি বা যৌনবাহিত রোগ (এসটিআই) সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব তরুণ প্রজন্মকে এই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
দেরিতে রোগ নির্ণয়: গবেষণা অনুযায়ী, অধিকাংশ রোগী যখন চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন, তখন তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (সিডি৪+ টি-লিম্ফোসাইট) অত্যন্ত কমে যায়। রোগটি দেরিতে শনাক্ত হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়, যা তাদের স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটায় এবং একইসাথে ভাইরাসটি অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠীর ফলো-আপের অভাব: অভিবাসী কর্মী, মাদক গ্রহণকারী এবং বিভিন্ন কাজের সন্ধানে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াতকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিয়মিত ফলো-আপ করার মতো কার্যকর ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। তারা নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা বা ওষুধের আওতায় না থাকায় রোগটি নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
ল্যাবরেটরি সুবিধার অপর্যাপ্ততা: দেশের সব বিভাগে সিডি৪+ কাউন্ট এবং ভাইরাল লোড পরীক্ষার আধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা নেই। সময়মতো রোগ নির্ণয় না হওয়ার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় অজান্তেই অন্যদের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য: এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে সমাজে ব্যাপক কুসংস্কার, বৈষম্য এবং বঞ্চনার ভয় রয়েছে। অনেক রোগী সমাজচ্যুত হওয়ার ভয়ে প্রকাশ্যে পরীক্ষা করাতে বা নিয়মিত চিকিৎসাসেবা নিতে আগ্রহী হন না। এই সামাজিক ভীতি রোগটিকে আড়ালে রাখছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সংক্রমণের হার কমাতে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও সমন্বিত চিকিৎসা সেবার গুরুত্ব:
নিবন্ধটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে যে, এইচআইভি ব্যবস্থাপনা কেবল শরীরবৃত্তীয় রোগের চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। গবেষকরা জানিয়েছেন, এইচআইভি আক্রান্ত রোগীরা বর্তমানে দীর্ঘজীবী হচ্ছেন, ফলে তাদের অসংক্রামক রোগ (নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস) হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই ক্রনিক ডিজিজ ক্লিনিকগুলোকে এইচআইভি সেবার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। এছাড়া, গবেষণায় বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে যে—এইচআইভি আক্রান্ত রোগীদের সামগ্রিক সুস্থতায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং নেশাসক্তি নিরাময় বা সাবস্টেন্স-ইউজ ডিসঅর্ডার (সাবস্টেন্স-ইউজ ডিসঅর্ডারস) সংক্রান্ত সহায়তা একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এইচআইভি চিকিৎসাকে যক্ষ্মা, যৌনবাহিত রোগ (এসটিআই) এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে একীভূত করে একটি পূর্ণাঙ্গ সেবা কাঠামো তৈরি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সমাধানের পথ:
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এইচআইভি সংক্রমণের বর্তমান ঊর্ধ্বগতি রোধে সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক কৌশল গ্রহণ জরুরি। দেশের সব বিভাগে সিডি৪+ ও ভাইরাল লোড পরীক্ষার আধুনিক ল্যাবরেটরি সক্ষমতা নিশ্চিত করে দ্রুত রোগ নির্ণয় ও এআরটি (এআরটি) শুরু করতে হবে। মাদক গ্রহণকারীদের জন্য হার্ম-রিডাকশন কর্মসূচি ও নিরাপদ সুঁচ ব্যবহারের নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এইচআইভি চিকিৎসাকে যক্ষ্মা, যৌনবাহিত রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে একীভূত করতে হবে। এছাড়া, সামাজিক কুসংস্কার দূর করে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিয়মিত স্ক্রিনিং ও ফলো-আপের মাধ্যমেই এইডস নির্মূলের জাতীয় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাইলা আওয়াল বলেন, এইচআইভি-কে কেবল একটি সংক্রামক রোগ হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং এটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংসকারী একটি প্রগতিশীল ও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। ভাইরাসটি প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায় না থেকে এখনই আমাদের সময়োচিত পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সমাজ থেকে এইচআইভি সংক্রান্ত সকল কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করতে হবে। কার্যকর অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) কেবল আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনই বাঁচাবে না, বরং ভাইরাসটির ভবিষ্যৎ সংক্রমণ ঝুঁকিও অনেক কমিয়ে আনবে।