
ভর্তুকির পণ্য বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রম ডিজিটাল করা হচ্ছে। ডিজিটাল কার্ড, মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন ডিলার ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত পণ্য বিক্রয় ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারির মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন থেকে পণ্য বিতরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় টিসিবির সম্মেলনকক্ষে সংস্থাটির কার্যক্রমের ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে টিসিবির সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সরকারি ভর্তুকির সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, দেশের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এখনও পুরোপুরি নিরবচ্ছিন্ন ও কার্যকর হয়ে ওঠেনি। উৎপাদক পর্যায় থেকে পণ্য শহর বা রাজধানীর খুচরা বাজারে পৌঁছানোর পর অনেক ক্ষেত্রে দামের বড় ব্যবধান তৈরি হয়। আবার সাময়িক সরবরাহ ঘাটতিও বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এ পরিস্থিতিতে স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিতে টিসিবির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরে টিসিবির বিভিন্ন উদ্যোগ ও ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি সাশ্রয় হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভর্তুকির অপচয় আরও উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
কার্ড হারালেও মিলবে পণ্য
টিসিবির নতুন ‘উপকারী’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে উপকারভোগীরা প্রচলিত কার্ডের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও সেবা নিতে পারবেন। ডিজিটালি স্বাক্ষরিত ও এনক্রিপ্টেড কিউআর কোডের মাধ্যমে উপকারভোগীর পরিচয় ও পণ্য পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করা হবে।
এর ফলে কার্ড হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলেও প্রকৃত উপকারভোগীরা নির্ধারিত পণ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন না। ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে পণ্য বিতরণেও স্বচ্ছতা বাড়বে বলে আশা করছে টিসিবি।
ডিলার নিয়োগেও ডিজিটাল ব্যবস্থা
ডিলার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে চালু করা হচ্ছে অনলাইন ডিলার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। এর মাধ্যমে ডিলারদের আবেদন গ্রহণ, তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হবে।
প্রয়োজনের তুলনায় আবেদনকারী বেশি হলে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচনের সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন আরও সহজ ও স্বচ্ছ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এআই দিয়ে হবে নজরদারি
টিসিবির পণ্য বিক্রি ও বিতরণ কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে সমন্বিত পণ্য বিক্রয় ব্যবস্থা বা অল-ইন-ওয়ান পিওএস। এর মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, বায়োমেট্রিক যাচাই, অনলাইন পেমেন্ট এবং তাৎক্ষণিক বিক্রয় রশিদ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তাৎক্ষণিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে কোন এলাকায় কত পণ্য বিক্রি ও বিতরণ হচ্ছে এবং কোথাও অনিয়ম হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এতে অনিয়ম শনাক্ত করার পাশাপাশি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
উপকারভোগীদের দ্রুত তথ্য ও সহায়তা দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক যোগাযোগকেন্দ্র চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বাদ পড়েছে ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারী
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে প্রায় ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি যাচাইকৃত ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হয়েছে।
সরকারি ভর্তুকি যেন প্রকৃত ও যোগ্য উপকারভোগীদের কাছেই পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে এই তথ্যভাণ্ডার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে টিসিবি।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে প্রায় ৭৯ লাখ উপকারভোগী টিসিবির সেবার আওতায় রয়েছেন। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা এক কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
অনুষ্ঠানে টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ স্বাগত বক্তব্য দেন। এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
পরে বাণিজ্যমন্ত্রী অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে টিসিবির ডিজিটাল কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।