
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক স্পর্শ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি। বিজ্ঞানীরা এমন একটি এআই মডেল তৈরি করেছেন যা প্রচলিত ম্যামোগ্রাফি বা অভিজ্ঞ রেডিওলজিস্টদের চেয়েও নিখুঁতভাবে এবং প্রায় এক বছর আগেই স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি পূর্বাভাস দিতে পারে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের একদল আন্তর্জাতিক গবেষকের যৌথ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এই অবিশ্বাস্য সাফল্য মিলেছে। বিশ্বখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট ডিজিটাল হেলথ’-এর গত মে মাসের সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী নারীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ স্তন ক্যান্সার। এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হলে ক্যান্সার চিকিৎসায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং লাখ লাখ নারীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

যেভাবে কাজ করে এই এআই মডেল:
প্রচলিত ম্যামোগ্রাফি স্ক্রিনিং পদ্ধতিতে রেডিওলজিস্টরা এক্স-রে ইমেজের ভেতর কোনো দৃশ্যমান টিউমার, পিণ্ড বা অস্বাভাবিক কোষের উপস্থিতি খোঁজেন। কিন্তু অনেক সময় ক্যান্সারের প্রাথমিক স্তরের কোষগুলো এতই ক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ম থাকে যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। ফলে দৃশ্যমান টিউমার তৈরি হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকদের অপেক্ষা করতে হয়, যা অনেক সময় রোগীর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ল্যানসেটে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন এই এআই মডেলটি মূলত ‘ডিপ লার্নিং’ অ্যালগরিদমের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। এটি কোনো নারীর অতীতের ম্যামোগ্রাম স্ক্যান এবং বর্তমানের সামান্যতম টিস্যু পরিবর্তনের ডেটা বা সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে। মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া অতি সূক্ষ্ম টিস্যুর ঘনত্ব বা টেক্সচারের পরিবর্তন এই এআই নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে পারে। এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনের প্যাটার্ন দেখে অ্যালগরিদমটি গাণিতিক হিসাব কষে বলে দিতে পারে যে, আগামী ১ থেকে ২ বছরের মধ্যে ওই স্থানে ক্যান্সার ছড়ানোর ঝুঁকি ঠিক কতটা। অর্থাৎ, শরীরে টিউমার বা পিণ্ড তৈরি হওয়ার অনেক আগেই এটি চিকিৎসকদের সতর্ক সংকেত পাঠিয়ে দেয়।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল:
যুক্তরাজ্যের ‘ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে’, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ এবং গুগল হেলথ -এর গবেষকদের যৌথ পরিচালনায় এই মডেলটির কয়েক বছর ধরে ব্যাপকভাবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয়। ট্রায়াল শেষে গত মে মাসে প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, এই এআই মডেলটি ‘ফলস পজিটিভ’ (ক্যান্সার না থাকলেও ভুলবশত ক্যান্সার ধরা পড়া) এবং ‘ফলস নেগেটিভ’ (ক্যান্সার থাকলেও তা শনাক্ত করতে না পারা) এর হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে এনেছে। যেখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের শত শত স্ক্যান পরীক্ষা করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে এই এআই মাত্র কয়েক সেকেন্ডে নিখুঁত স্ক্রিনিং সম্পন্ন করতে পারে। ফলে চিকিৎসকেরা কেবল উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব:
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই আবিষ্কার নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশের মানুষের কাছে তথ্যটি এখনো সেভাবে আসেনি। অথচ দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও ক্যান্সার পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তিটি একটি বড় ‘গেম-চেঞ্জার’ হতে পারে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
দেরিতে রোগ শনাক্তকরণের সংস্কৃতি: বাংলাদেশে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত অধিকাংশ নারীই সামাজিক ট্যাবু, অসচেতনতা বা সঠিক স্ক্রিনিংয়ের অভাবে একদম শেষ পর্যায়ে চিকিৎসকের কাছে যান। ওই অবস্থায় ক্যান্সার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাময়ের সম্ভাবনা ১০ থেকে ২০ শতাংশে নেমে আসে। এই এআই প্রযুক্তি যদি ১ বছর আগে ঝুঁকির পূর্বাভাস দিতে পারে, তবে একদম প্রাথমিক ধাপে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব, যা রোগীর বেঁচে থাকার হার ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেবে।
দক্ষ রেডিওলজিস্টের তীব্র সংকট: দেশের জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ম্যামোগ্রাফি মেশিন থাকলেও অভিজ্ঞ ও বিশেষায়িত রেডিওলজিস্টের তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে বহু নারী সঠিক সময়ে সঠিক রিপোর্ট পান না। এই এআই সফটওয়্যারটি ক্লাউড বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঢাকার বাইরে দূরবর্তী অঞ্চলেও টেলিমেডিসিন মডেলে কাজ করতে পারবে। একজন সাধারণ টেকনিশিয়ান স্ক্যান ফাইল আপলোড করলেই এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিখুঁত ঝুঁকির রিপোর্ট তৈরি করে দিতে পারবে।
চিকিৎসার খরচ ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ হ্রাস: শেষ পর্যায়ে ক্যান্সারের কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও জটিল অস্ত্রোপচারের খরচ সাধারণ তো বটেই, মধ্যবিত্ত পরিবারেরও সাধ্যের বাইরে চলে যায়। ১ বছর আগে রোগ নির্ণয় বা ঝুঁকি জানা গেলে স্বল্প খরচে, হরমোন থেরাপি বা ছোট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেই রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব। এতে দেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর যেমন চাপ কমবে, তেমনি হাজার হাজার পরিবার দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচবে।
বাণিজ্যিক ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা:
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তিটি এখনো সব দেশের সাধারণ হাসপাতালের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। বর্তমানে এটি উন্নত বিশ্বের কিছু নির্দিষ্ট ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে পরীক্ষামূলকভাবে লাইভ স্ক্রিনিংয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই প্রযুক্তিকে দ্রুত বৈশ্বিক রূপ দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে, সেখানে এই ধরনের মেডিকেল এআই প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে এই প্রযুক্তির আমদানি ও ব্যবহার শুরু হলে তা চিকিৎসা খাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।