ঢাকাশনিবার , ২৫ জুলাই ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

ছাগলের গুঁতাগুঁতিতে কি মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়? চমকপ্রদ তথ্য দিলেন বিজ্ঞানীরা

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৫ বিকাল

Link Copied!

প্রকৃতির রাজ্যে শিংযুক্ত প্রাণীদের একে অপরের সাথে লড়াই করা বা মাথা দিয়ে সজোরে ধাক্কা দেওয়ার দৃশ্য অত্যন্ত পরিচিত। বিশেষ করে ছাগল ও ভেড়াদের ক্ষেত্রে এই ‘হেডবাটিং’ বা গুঁতাগুঁতির স্বভাব তাদের জীবনের একটি প্রধান অংশ। দলপতি হওয়া, নিজের শক্তির জানান দেওয়া কিংবা প্রজনন অধিকার নিশ্চিত করার জন্য পুরুষ ছাগলরা নিয়মিত এই লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মনে একটি ধারণাই বদ্ধমূল ছিল যে, এই প্রাণীগুলোর মাথার খুলি, শিং এবং ঘাড়ের পেশি এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যা যেকোনো জোরালো আঘাতের ধাক্কা সহজেই শুষে নিতে পারে। ফলে তাদের মস্তিষ্কের কোনো ক্ষতি হয় না বলেই ধরে নেওয়া হতো।

কিন্তু বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক যুগান্তকারী গবেষণা এই চিরাচরিত ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছাগলের এই তীব্র গুঁতাগুঁতি কেবল তাদের বাহ্যিক শক্তির প্রদর্শনই নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মস্তিষ্কের স্থায়ী ও মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা।

গবেষণার নেপথ্য কাহিনী:

বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন শিংযুক্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের গঠন এবং তাদের নিয়মিত আচরণের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গভীর গবেষণা চালিয়ে আসছিলেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন দুটি শক্তিশালী ছাগল ঘণ্টায় বেশ কয়েক মাইল বেগে একে অপর দিকে ছুটে এসে শিংয়ে শিংয়ে সজোরে ধাক্কা মারে, তখন তাদের পুরো শরীরের ভর এবং গতিবেগ সরাসরি মস্তিষ্কের ওপর আঘাত হানে। মাথার খুলি যতই শক্ত ও পুরু হোক না কেন, এই প্রচণ্ড অভিঘাতের কারণে মস্তিষ্কের কোমল টিস্যু খুলির শক্ত দেওয়ালের সাথে সজোরে ঘষা খায় এবং ধাক্কা খায়।

মানুষের ক্ষেত্রে বক্সিং, রাগবি কিংবা আমেরিকান ফুটবলের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় বারবার মাথায় আঘাত পাওয়ার ফলে যেমন ‘ক্রনিক ট্রমাটিক এনসেফালোপ্যাথি’ (সিটিই) বা মস্তিষ্কের কোষের অপূরণীয় ক্ষতি হতে দেখা যায়, ছাগল ও ভেড়াদের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ধরনের স্নায়বিক ক্ষতির আলামত খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, বারবার এই ধরনের উচ্চ মাত্রার আঘাত পাওয়ার ফলে তাদের মস্তিষ্কে ক্ষতিকারক প্রোটিনের অস্বাভাবিক জমাট বাঁধা, কোষের কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়া এবং স্নায়ুক্ষয়ী বা নিউরোডিজেনারেশনের লক্ষণ অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিবর্তনের এক অদ্ভুত প্রহেলিকা:

এই গবেষণাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিজ্ঞানীদের মনে একটি স্বাভাবিক ও যৌক্তিক প্রশ্ন জেগেছিল—যদি এই গুঁতাগুঁতির কারণে মস্তিষ্কের এত বড় এবং মারাত্মক ক্ষতিই হয়, তবে বিবর্তনের দীর্ঘ ও নিষ্ঠুর ধারায় এই প্রাণীগুলো এই বিপজ্জনক স্বভাবটি বর্জন করল না কেন? কেন তারা স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ জীবন বেছে নেওয়ার পথে হাঁটেনি?

এর জবাবে খ্যাতনামা জীববিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রকৃতি ও বিবর্তনের মূল লক্ষ্য কোনো প্রাণীর দীর্ঘকালীন সুস্বাস্থ্য বা আরামদায়ক জীবন নিশ্চিত করা নয়, বরং তার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্ম বা বংশধর রেখে যাওয়া। ছাগল ও ভেড়াদের এই লড়াইগুলো সাধারণত তাদের তারুণ্যের বয়সে সবচেয়ে বেশি ঘটে থাকে। এই বয়সেই তাদের প্রজননসঙ্গী নির্বাচন এবং দলের নেতৃত্ব অর্জনের লড়াইয়ে জয়ী হতে হয়। মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদি বা বয়স্ককালে যে মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়, তার নেতিবাচক প্রভাব সাধারণত প্রবীণ বয়সে বা জীবনকালের শেষভাগে প্রকাশ পায়। ততদিনে প্রাণীটি তার প্রজনন কাজ এবং বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করে ফেলে। অর্থাৎ, জীবদ্দশায় নিজের বংশধর রেখে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই মস্তিষ্কের ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। আর এই কারণেই বিবর্তনের নিয়মে এই আচরণটি তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের মাঝেই আজও টিকে রয়েছে।

প্রাণীজগতের আচরণ যখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ:

বিজ্ঞানীদের এই গবেষণাটি কেবল প্রাণিবিদ্যা ও আচরণগত বিজ্ঞানকেই সমৃদ্ধ করছে না, বরং মানবকল্যাণেও এটি এক বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। মানুষ যখন নানা দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ খেলাধুলার সময় মাথায় মারাত্মক আঘাত পায়, তখন তার মস্তিষ্কের ভেতরের কোষগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং দীর্ঘমেয়াদে তা কীভাবে বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়—তা গভীরভাবে বোঝার জন্য ছাগলের এই মস্তিষ্কের আঘাতের মডেলটি চিকিৎসা গবেষকদের নতুন পথ দেখাতে পারে। মানুষের মস্তিষ্কের ট্রমা বা আঘাতজনিত চিকিৎসায় এই গবেষণা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকৃতির নানা রহস্যের আড়ালে এভাবেই লুকিয়ে থাকে বিস্ময়কর সব সত্য। ছাগলের শক্ত মাথার আড়ালে থাকা এই সূক্ষ্ম ও মারাত্মক ক্ষতির সত্যতা প্রমাণ করল যে, প্রকৃতির প্রতিটি সহজাত আচরণের পেছনে যেমন কার্যকারণ রয়েছে, তেমনি রয়েছে এর সুদূরপ্রসারী, জটিল ও কখনো কখনো নির্মম পরিণতি। এই গবেষণা ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান জগতের জন্য এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করল।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

বঙ্গোপসাগরে নতুন লঘুচাপ, ৪ সমুদ্রবন্দরে জরুরি সতর্কতা

বর্ষায় যেসব সবজি কেনার আগে দুবার ভাববেন

ছাগলের গুঁতাগুঁতিতে কি মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়? চমকপ্রদ তথ্য দিলেন বিজ্ঞানীরা

আধুনিক চিকিৎসা ও পুষ্টিবিজ্ঞানে ‘খাদ্যই ওষুধ’ ধারণার নতুন দিগন্ত

ফ্রান্স-স্পেনে ভয়াবহ দাবানল, ঘরছাড়া ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ

বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, টানা পাঁচদিন বৃষ্টি হতে পারে দেশজুড়ে

বিল পরিশোধের পরই দেবে গেল ২৫ লাখ টাকার সেতুর সংযোগ সড়ক

মানুষের মতো রোবট করল সফল অস্ত্রোপচার

চুয়াডাঙ্গায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস উল্টে আহত ২০

জলবায়ু ঝুঁকিতে বাস্তুচ্যুতদের জন্য নতুন প্রকল্প, বাংলাদেশ-আইওএম চুক্তি

ঝালকাঠিতে যৌথ অভিযানে আড়াই লাখ টাকার অবৈধ জাল জব্দ

ঠোঁটকাটা-তালুকাটা শিশুদের পুনর্বাসনে জাতীয় কর্মসূচির ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর