ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

অস্থির অর্থনীতি ও মানুষের আশঙ্কা

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৬ জুলাই ২০২৫, ১২:২৪ বিকাল

Link Copied!

সন্ধ্যার আবছা আলোয় যখন একজন মধ্যবয়সী কর্মজীবী মানুষ তার মাসের খরচের হিসাব মিলিয়ে বসে থাকেন, তখন তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—“আগামী দিনে কি আমি আর্থিকভাবে নিরাপদ থাকব?” এই প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের নয়, শুধু একটি দেশের নয়, বরং আজকের বৈশ্বিক সমাজের এক গভীর উদ্বেগের প্রতিচ্ছবি। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি, চাকরির ভবিষ্যৎ, অবসরজীবনের সঞ্চয়—এই সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ আজ উদ্বিগ্ন তাদের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে স্ট্যাটিস্টা কনজ্যুমার ইনসাইটস-এর এক জরিপে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এই সমীক্ষা অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি মানুষ—প্রায় ৪১ শতাংশ—নিজেদের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই পরিসংখ্যান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দেশটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব এবং বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণের মধ্যে আয় বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয়, এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষকে মানসিকভাবে চাপে রাখছে।

তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কানাডা, যেখানে ৪০ শতাংশ মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। এটি একটু আশ্চর্যজনক ঠেকতে পারে, কারণ কানাডা একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত। তবে বাস্তবতা হলো, বাড়ির উচ্চ মূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবা বা অবসর ভাতা নিয়ে সংশয় এই উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলেছে। তরুণ প্রজন্ম বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন—তারা জানে না কখন নিজের একটি বাসা কেনার সামর্থ্য তৈরি হবে।

তৃতীয় স্থানে রয়েছে জাপান, যার ৩৯ শতাংশ জনগণ আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। জাপানের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বয়স্ক জনসংখ্যা ও নিম্ন জন্মহার। দিন দিন কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে অবসরভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর। যাদের আয় স্থায়ী নয় বা যারা অস্থায়ী কর্মে নিযুক্ত, তাদের ক্ষেত্রে এই উদ্বেগ আরও তীব্র।

এরপর আছে মেক্সিকো (৩৮%) এবং ব্রাজিল (৩৭%)—দুটি লাতিন আমেরিকান দেশ, যারা দীর্ঘদিন ধরে মুদ্রাস্ফীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঙ্গে লড়াই করে আসছে। মেক্সিকোর অর্থনীতি আংশিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর, ফলে মার্কিন অর্থনীতির প্রতিটি ওঠানামা মেক্সিকোর গৃহস্থে প্রভাব ফেলে। ব্রাজিলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আয়হীনতার কারণে সাধারণ মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

তালিকার ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে ৩৭ শতাংশ মানুষ তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। এই সংখ্যা শুধু নিম্নবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মধ্যবিত্তদের মধ্যেও এই উদ্বেগ প্রবল। ঋণের বোঝা, স্বাস্থ্যবিমা, শিশুদের উচ্চশিক্ষার খরচ এবং অবসরকালীন সঞ্চয়ের অপ্রতুলতা—সব মিলিয়ে অনেকেই মনে করেন, “আমার অবসর হয়তো নিরাপদ নয়।”

এরপর রয়েছে জার্মানি (৩৫%) এবং যুক্তরাজ্য (৩৪%)। দুটি দেশই উন্নত অর্থনীতির দেশ, কিন্তু তবুও এখানে উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয়েছে। ইউরোপজুড়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এবং ভবিষ্যতের পেনশন ব্যবস্থা নিয়ে সংশয় মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি করছে। বিশেষত কোভিড-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ধীর গতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী জ্বালানির অস্থিরতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ফ্রান্সের অবস্থান তুলনামূলক ভালো। এখানে মাত্র ২৮ শতাংশ মানুষ আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছে। যদিও এই হার একেবারে কম বলা চলে না, তবে অন্যান্য পশ্চিমা দেশের তুলনায় ফ্রান্সে সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো ও কল্যাণভিত্তিক নীতিমালা কিছুটা স্থিতিশীলতা দিয়েছে। সরকারি সেবার ওপর নির্ভরতা এবং দীর্ঘদিনের ‘social state’ মডেল হয়তো এই উদ্বেগ কম রাখতে ভূমিকা রেখেছে।

ভারতের পরিস্থিতি তুলনামূলক ভিন্ন। এখানে ২৭ শতাংশ মানুষ অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, যা তুলনামূলকভাবে নিম্নহার। একদিকে, বিশাল জনসংখ্যা ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর কারণে ভারতের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশা জাগায়। অন্যদিকে, এই উদ্বেগ কম থাকার কারণ হতে পারে জনগণের অনানুষ্ঠানিক আয়ের ওপর নির্ভরতা এবং পরিবারভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থার দৃঢ়তা। তবে এটি বলা যায় না যে ভারতীয়রা আর্থিকভাবে নিরাপদ—বরং অনেকে এখনও ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন নয়।

সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি এসেছে চীন থেকে। এখানে মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ তাদের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই সংখ্যা যে খুব বাস্তবিক চিত্র তুলে ধরে, তা বলা কঠিন। কারণ চীনের সরকারি নীতিনির্ধারণে জনমত পরিসংখ্যানের পূর্ণ স্বচ্ছতা সবসময় বজায় থাকে না। তবুও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চীনের একটি বড় অংশের মানুষ সরকারি পেনশন, আবাসন, ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর আস্থাশীল। আবার অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, চীনা সংস্কৃতিতে ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ অনেক সময় “দুর্বলতা” হিসেবে দেখা হয়—এই মনোভাব জরিপের উত্তরকে প্রভাবিত করতে পারে।

এই বৈশ্বিক পরিসংখ্যান আমাদের বলে দেয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আর ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তা সবসময় একসূত্রে গাঁথা নয়। উন্নত দেশেও মানুষ উদ্বিগ্ন, উন্নয়নশীল দেশেও অনিশ্চয়তা কাজ করে। তবে উদ্বেগের প্রকৃতি ও মাত্রা পরিবর্তিত হয় সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত্তিতে।

সবশেষে বলা যায়—আমাদের প্রতিদিনকার জীবনযাপন, পরিবার পরিকল্পনা, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত, এমনকি স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতা—সব কিছুর সঙ্গে আর্থিক নিরাপত্তার একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই উদ্বেগ কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের অন্তর্নিহিত আতঙ্ক ও ভবিষ্যৎকে ঘিরে আশা-নিরাশার মিলিত প্রকাশ।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস