ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

“অপরিচিতের হাসিতে যে দেশ আপন হয়ে ওঠে”

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৩ জুলাই ২০২৫, ১:১১ বিকাল

Link Copied!

একজন ভ্রমণপ্রিয় মানুষের জীবনে সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো ঘটে তখনই, যখন কোনো অচেনা দেশের মাটিতে নামামাত্র তিনি অনুভব করেন একধরনের উষ্ণ অভ্যর্থনা। চারপাশে অচেনা ভাষা, অজানা রীতি, অজানা মানুষ—তবু সেখানেই এক চায়ের দোকানদার হাসিমুখে বলে ওঠে, “Welcome!” এমন এক অভিজ্ঞতাই এক পর্যটককে বলে দেয়—এই দেশটি বন্ধুত্বপূর্ণ।

বিশ্বে এমন কিছু দেশ রয়েছে, যেখানে বিদেশি মানেই আতিথেয়তা, যাত্রাপথ মানেই সহানুভূতির ছায়া। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা U.S. News & World Report একটি জরিপ চালিয়ে এমন ৩৫টি দেশকে শনাক্ত করেছে, যারা ‘friendliness’ বা বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের দিক দিয়ে শীর্ষস্থানে রয়েছে। এই প্রতিবেদনে এমনই এক সফরের কাহিনি তুলে ধরা হলো, যা আমাদের ঘুরিয়ে আনবে বিশ্বের সবচেয়ে আপনতম দেশগুলোতে।

যাত্রা শুরু হয় উত্তর আমেরিকার কানাডা থেকে। বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন দেশগুলোর তালিকায় বরাবরই শীর্ষে থাকে কানাডা। এখানে প্রতিটি প্রদেশেই পাওয়া যায় নানা সংস্কৃতির মানুষ, যারা প্রতিনিয়ত অভিবাসী এবং পর্যটকদের বুকে টেনে নেয়। টরন্টো কিংবা ভ্যাঙ্কুভারের রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোনো ঠিকানা খুঁজলে, পাশের পথচারী আপনাকে সেখানে পৌঁছে দিতেও দ্বিধা করবেন না। বন্ধুত্ব যেন এখানকার নাগরিক চেতনার অংশ।

এরপর আমরা এসে পৌঁছাই ইউরোপের প্রাণকেন্দ্র স্পেনে। ফুটবল, উৎসব আর গানবাজনার দেশ হলেও, স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি এর মানুষ। স্প্যানিশরা প্রাণোচ্ছল, প্রাণবন্ত এবং অতিথিপরায়ণ। বার্সেলোনা বা মাদ্রিদের কোনো ছোট কাফেতে ঢুকে এক কাপ কফি চাইলে, ক্যাফে মালিক নিজ হাতে সেই কফির সাথে তুলে দেবেন একটি হাসি, যা ভাষার সীমা ছাড়িয়ে যাবে।

নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ গোলার্ধের এক স্বপ্নময় দ্বীপদেশ, যেখানকার পাহাড়, হ্রদ, সৈকত শুধু নয়—মানুষও হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এখানকার আদিবাসী মাওরি জনগোষ্ঠীসহ দেশের বেশিরভাগ মানুষ বিদেশিদের আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে। পর্যটকদের সহযোগিতা করা যেন এখানকার সামাজিক রীতিরই অংশ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে “community welcome houses” চালু আছে, যেখানে নতুন আগতদের স্বেচ্ছাসেবীরা বিনামূল্যে দিকনির্দেশনা দেয়।

চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে নেদারল্যান্ডস। ইউরোপের এই আধুনিক ও খোলামেলা সমাজব্যবস্থার দেশটি কেবল তার টিউলিপ ক্ষেত আর সাইকেল সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত নয়—এর জনগণের সহনশীলতা, ভদ্রতা ও সাহায্যপ্রবণ মনোভাব একে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে জায়গা করে দিয়েছে। আমস্টারডামের রাস্তায় কোনো পর্যটক বিপদে পড়লে, এগিয়ে আসবেন স্থানীয়রা। এমনকি দোকানদার বা বাসচালক পর্যন্ত আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য মানচিত্র হাতে দেখিয়ে দেবেন সঠিক পথ।

পঞ্চম স্থানে থাকা পর্তুগাল ইউরোপের গোপন রত্ন। এখানকার জনগণ জীবনের গতি ধীর করে বাঁচে—তাদের হাসি, চোখের দৃষ্টি, কণ্ঠস্বর সবই শান্ত। পোর্তো বা লিসবন শহরে স্থানীয়রা পথচারীকে শুধুই পথ দেখায় না, বরং অনেক সময় নিজেদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায়। এখানে আতিথেয়তা কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, বরং হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়।

অস্ট্রেলিয়া ও ইতালিও তালিকায় যথাক্রমে ৬ষ্ঠ ও ৭ম স্থানে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন বা মেলবোর্ন শহরে কেউ হারিয়ে গেলে শুধু দিকনির্দেশনা নয়, কেউ কেউ নিজের ফোন বের করে গুগল ম্যাপে পথ খুঁজে দেয়। আর ইতালির ফ্লোরেন্স বা রোমে মানুষজনের উষ্ণ হাসি আর সাহচর্য মুগ্ধ করে পর্যটকদের। খাবারের টেবিলে অচেনা লোকের সাথেও ইতালিয়ানরা ভাগ করে নেয় তাদের পাস্তা কিংবা গল্প।

নরওয়ে, থাইল্যান্ড, ফিনল্যান্ড—এই তিনটি দেশ যথাক্রমে ৮, ৯ ও ১০ নম্বরে। নরওয়ের মানুষ শান্ত, কিন্তু মানবিক। তাদের সহানুভূতির অভিব্যক্তি ঠাণ্ডা আবহাওয়ার মতোই কোমল। থাইল্যান্ডের “Land of Smiles” খেতাবটিই বলে দেয় এখানকার বন্ধুত্বপূর্ণ সংস্কৃতির কথা। আর ফিনল্যান্ডে, যদিও মানুষ অনেকটা অন্তর্মুখী, তবু প্রয়োজনে তারা পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করে না।

গ্রিস, সুইডেন, আয়ারল্যান্ড ও ডেনমার্কের মতো উত্তর ও দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোও তালিকায় স্থান পেয়েছে। গ্রীসে অতিথি মানেই ঈশ্বরতুল্য। সুইডিশ ও ড্যানিশরা একটু সংযত হলেও বিপদে তারা সহায়তা করতে প্রস্তুত। আয়ারল্যান্ডে প্রবেশ করলেই আপনি শুনবেন, “How’re ya, mate?”—যেন পুরোনো বন্ধুর মতো কথা বলে।

লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব করছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। ফুটবলপ্রেমী এই জাতিগুলো দারুণভাবে উচ্ছ্বাসী এবং প্রাণবন্ত। ব্রাজিলে কোনো উৎসবে অংশ নিতে চাইলে শুধু জানালেই হয়—সেখানে আপনাকে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানাতে দ্বিধা থাকবে না। আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে কেউ একা থাকলে, দ্রুত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে স্থানীয়দের সঙ্গে।

এশিয়া থেকেও বেশ কয়েকটি দেশ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে—ফিলিপাইন, জাপান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড। এই দেশগুলোতে পারিবারিক মূল্যবোধ ও অতিথিপরায়ণতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিপাইনে ‘hospitality’ যেন জাতীয় সংস্কৃতি। জাপানে শিষ্টাচার এবং সহানুভূতি একটি মানদণ্ড। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে মানুষ অল্পতেই হাসে এবং আন্তরিকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

তুরস্ক ও সিঙ্গাপুরও তালিকায়। তুরস্কে আতিথেয়তা এমনই যে কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে, দোকানদার চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। সিঙ্গাপুর, যদিও একটি আধুনিক ও ব্যস্ত শহর, তবে নাগরিকরা যথেষ্ট ভদ্র এবং পর্যটকদের প্রতি সদয়। এখানে সামাজিক সহনশীলতা ও বহুত্ববাদ চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও বেলজিয়ামের মতো পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের ঐতিহাসিক গাম্ভীর্যের পাশাপাশি পর্যটকদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের জন্য তালিকায় স্থান পেয়েছে। প্যারিসে অনেক সময় ভাষা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও, সহৃদয় ফরাসিরা সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। যুক্তরাজ্যে “need a hand?” কথাটি শোনা যায় বারবার—এটি শুধুই প্রশ্ন নয়, বরং মানবিকতার প্রকাশ।

কোস্টারিকা ও চিলি, দুই লাতিন আমেরিকান দেশ, পর্যটকদের প্রতি যে আন্তরিক, তা প্রমাণিত। “Pura Vida”—কোস্টারিকার এই প্রবাদ বাক্য শুধু একটি অভিবাদন নয়, বরং একটি জীবনবোধ, যার অর্থ ‘পরিপূর্ণ জীবন’, শান্তিপূর্ণ ও সদয় মনোভাব। চিলিতে পাহাড় আর মরুভূমির মধ্য দিয়ে যাত্রার সময় স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া সাহায্য হৃদয়ে দাগ কেটে যায়।

পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, অস্ট্রিয়া ও আইসল্যান্ড—এই চারটি ইউরোপীয় দেশও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করেছে তাদের পর্যটকদের জন্য। পোল্যান্ডে ঐতিহাসিক ক্ষত থাকলেও বর্তমান প্রজন্ম অত্যন্ত আন্তরিক। ক্রোয়েশিয়ার দ্বীপগুলিতে মানুষজন এতটাই বন্ধুসুলভ যে অনেক সময় তারা নিজ হাতে রান্না করা খাবার আপনাকে অফার করবে।

সবশেষে, লুক্সেমবার্গ ও সুইজারল্যান্ডের কথা না বললেই নয়। দুটো দেশই ধনী ও আধুনিক, কিন্তু সে কারণে জনগণ আত্মকেন্দ্রিক নয়। বরং এখানে বসবাসরত মানুষরা অত্যন্ত পরিশীলিত এবং নতুন আগতদের প্রতি বন্ধুসুলভ।

এই ৩৫টি দেশকে যে মানদণ্ডে পরিমাপ করা হয়েছে, তা হলো—hospitality (আতিথেয়তা), welcomeness (অভ্যর্থনা মনোভাব), safety (নিরাপত্তা), helpfulness (সহযোগিতা), tolerance (সহনশীলতা) এবং openness (খোলামেলা ভাব)। এই ছয়টি গুণ কোনো দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক চরিত্রকে প্রকাশ করে। এবং এই সূচকে যারা এগিয়ে, তারা কেবল উন্নতই নয়, বরং মানবিক দিক থেকেও অনন্য।

বিশ্ব যখন সংঘাত, বৈষম্য ও জাতিগত বিভেদের মধ্য দিয়ে হাঁটছে, তখন এসব বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ মানুষের জন্য। প্রতিটি হাসি, প্রতিটি সহায়তার হাত, প্রতিটি আন্তরিক দৃষ্টিই পারে পৃথিবীকে একটু বেশি বাসযোগ্য করে তুলতে।

তাই পরবর্তী ভ্রমণে যখন আপনি পাসপোর্ট হাতে বের হবেন, তখন শুধু সৌন্দর্য নয়, মানুষকেও বিবেচনায় নিন। হয়তো কোনো এক দেশ, যেটি আজ আপনার কাছে অপরিচিত, আগামীকাল হয়ে উঠবে সবচেয়ে আপন।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস