স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পরও বাংলাদেশ এখনও ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় বা আউট অফ পকেট এক্সপেণ্ডিচার (OOPE) চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে, যা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে বেশি প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসেবে OOP ব্যয় এখনো সর্বাধিক- যা ২০২১ সালে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৩% এরও বেশি, যা ২০২০ সালের ৬৮.৫% থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩.৭% (প্রায় ৬.১৩ মিলিয়ন মানুষ) দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। পাশাপাশি, ৬১% পরিবার হাসপাতালের সেবা গ্রহণের সময় গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়ার কথা জানিয়েছে।
পরিবারের নিজস্ব খরচে চিকিৎসা নেওয়ার এই উচ্চ মাত্রার নির্ভরতা প্রতিবছর অসংখ্য পরিবার বিশেষত শ্রমজীবী ও অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্য, আর্থিক অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশে এখনো স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য কোনো শক্তিশালী বা সুনির্দিষ্ট আইন নেই। হাসপাতালে মানুষ অতিরিক্ত ব্যয় করেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে না।
এ প্রেক্ষাপটে আজ বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে “সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস”। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্যে অসহনীয় স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে ব্যক্তি ও পরিবারের উপর সৃষ্ট গভীর মানবিক ও আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে মূলত স্বাস্থ্যসেবার জন্য মানুষ যে চরম আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়, পরিবারগুলো দারিদ্র্যের দিকে নিমজ্জিত হয়, তার উপর আলোকপাত করা হয়েছে এবং সকলের জন্য সহজলভ্য, মানসম্পন্ন এবং সাশ্রয়ী মূল্যের চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য সরকারের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহনের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আজ সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (UHC) দিবসে, আমরা পুনর্ব্যক্ত করছি যে মানসম্পন্ন, সাশ্রয়ী মূল্যের এবং অপরিহার্য স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের একটি মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। “সকলের জন্য স্বাস্থ্য” এই আহ্বান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শুধুমাত্র চিকিৎসা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা যেন কোনো নাগরিককে আর্থিক কষ্ট বা দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে না ফেলে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি জনগণের পকেট থেকে ব্যয় হচ্ছে। মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসে ব্যক্তিগত অর্থায়ন থেকে, যার ফলে অনেক পরিবার বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলি আর্থিক সংকটে পড়ে। প্রতি বছর উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধের দাম, রোগ নির্ণয়ের খরচ এবং হাসপাতালে ভর্তির ফি’র চাপ অসংখ্য মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দেয়।
সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে অবশ্যই স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে এবং সকল নাগরিকের জন্য কার্যকর আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবায় ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, পরিবারগুলোকে বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয় থেকে রক্ষা করা এবং স্বাস্থ্য খাতের অর্থায়ন জনগনের মধ্যে আরও সুষমভাবে বণ্টন করতে একটি সুপরিকল্পিত, সরকার-নেতৃত্বাধীন জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা নীতি গ্রহন করা অত্যন্ত জরুরি। এ ধরনের একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে যে, রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে না এবং প্রত্যেকে সমানভাবে স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা লাভ করতে পারবে।
আজকের এই দিবসে আমরা সরকারকে একটি শক্তিশালী জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করার, স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সকল স্তরে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা কেবল একটি মৌলিক ও সামাজিক বাধ্যবাধকতাই নয় বরং একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল এবং স্থিতিস্থাপক জাতি গঠনে একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ। যদি আমরা প্রতিটি নাগরিককে আর্থিক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে এবং সমান ও ন্যায্য চিকিৎসা সুবিধা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই তাহলেই ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্য’ নিশ্চিত করা সম্ভব।
এ বিবৃতি সমর্থনকারী ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো হচ্ছে, এডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, সেক্রেটারী, সেন্টার ফর ল এন্ড পলিসি এফেয়ার্স, আমিনুল ইসলাম বকুল, চেয়ারম্যান, আর্থ ডেভলাপমেন্ট ফাউন্ডেশন, একেএম মাকসুদ, নির্বাহী পরিচালক, গ্রাম বাংলা উন্নয়ন কমিটি, ব্যারিষ্টার নিশাত মাহমুদ, সেক্রেটারী, পাবলিক হেলথ ল ইয়ার্স নেটওয়ার্ক, এডভোকেট আওলাদ হোসেইন, চেয়ারম্যান, গ্লোবাল লিগ্যাল স্ট্যাডিজ এন্ড ডেভলাপমেন্ট সেন্টার, ইকবাল মাসুদ, চেয়ারম্যান, এইড সোসাইটি, গাউস পিয়ারী মুক্তি, পরিচালক, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট, ইবনুল সাইদ রানা, চেয়ারম্যান নিরাপদ ডেভলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, সীমা দাস সীমু, স্বাস্থ্য আন্দোলন।


