
দেশের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি কিংবা বান্দরবানের পার্বত্য জনপদ যেন প্রকৃতির এক অনন্য রূপালী ক্যানভাস। মেঘের হাতছানি, সবুজ বনাঞ্চলের স্নিগ্ধতা আর পাহাড়ি ঝরনার কলতান এক জাদুকরী পরিবেশ তৈরি করে—যেখানে চোখ জুড়ায় আর মন হারিয়ে যায় প্রকৃতির বিশুদ্ধতায়। কিন্তু পাহাড়ের এই বাহ্যিক সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘশ্বাস আর নির্মম বাস্তবতার গল্প।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স’ (আইডব্লিউজিআইএ)- এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, পাহাড়ের স্নিগ্ধ ও শান্ত পরিবেশের আড়ালে গত এক বছরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন হয়ে উঠেছে চরম দুর্বিষহ। ভূমি বেদখল, উচ্ছেদ এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়ে পাহাড় ও সমতলের এই প্রান্তিক মানুষগুলো আজ নিজেদের ভিটেমাটিতেই পরবাসী। একদিকে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, অন্যদিকে আদিবাসীদের বুকফাটা কান্না ও টিকে থাকার নিরন্তর লড়াই হৃদয়বিদারক বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
‘দ্য ইন্ডিজিনিয়াস ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ নামে প্রতিবেদনটি গত ২১ এপ্রিল আইডব্লিউজিআইএ-এ প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি পরদিন (২২ এপ্রিল) জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাঙালি জনসংখ্যার পাশাপাশি এ দেশে অন্তত ৩৪টি ভাষায় কথা বলা ৫৪টিরও বেশি আদিবাসী সম্প্রদায় যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছে। সর্বশেষ ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৮, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। তবে বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, মানবাধিকার ফোরাম এবং বিশিষ্ট গবেষকদের দাবি অনুযায়ী, দেশের প্রকৃত আদিবাসী জনসংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ দেশের বিভিন্ন সমতল জেলাগুলোতে এবং বাকি অংশ পাহাড়ি জনপদ তথা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে আসছে।
দীর্ঘকাল ধরেই নানামুখী সংকট ও অধিকারবঞ্চিত হওয়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে আসছে এই সম্প্রদায়গুলো। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাঙালি ছাড়া অন্যান্য জাতিগত পরিচয়ের কিছু মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকারের কথা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সবচেয়ে মৌলিক ভূমি অধিকারের বিষয়গুলো এখনো চরমভাবে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। বিশেষ করে ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা এবং সমতলের আদিবাসীদের ভূমিহীন ও প্রান্তিক করে তোলার প্রবণতা গত এক বছর ধরে চরম আকার ধারণ করেছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আইডব্লিউজিআইএ-এর প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ‘দ্য ইন্ডিজিনিয়াস ওয়ার্ল্ড ২০২৬’-এ ২০২৫ সালজুড়ে দেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার, নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার এক উদ্বেগজনক ও বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত বছর দেশের সমতল ও পাহাড়ি উভয় অঞ্চলের আদিবাসীদের শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ অস্থিতিশীল ছিল। পাহাড়ি অঞ্চলে বিভিন্ন বাহিনী, সেটেলার এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সংঘাত ও উত্তেজনার কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্তত ২৬৮টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ছয় শতাধিক আদিবাসী বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে হত্যা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, সাম্প্রদায়িক হামলা এবং নারী ও তরুণীদের ওপর সহিংসতার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষ করে বান্দরবানের বম সম্প্রদায়ের মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।
পাহাড়ের পাশাপাশি সমতলের আদিবাসীরাও বসতভিটা ও জীবিকা থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদন উঠে এসেছে। গত বছরের শেষের দিকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাবুডাইং গ্রামে পাঁচটি কোল আদিবাসী পরিবারের বাড়িঘর এক্সকাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে কনকনে শীত ও প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতে তারা খোলা আকাশের নিচে বাঁশঝাড়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
উচ্ছেদ হওয়া ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানিয়েছে, আইনি লড়াইয়ের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় এবং পর্যাপ্ত নোটিশ ছাড়াই তাদের বসতভিটা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন।
শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও আদিবাসী অধিকার গবেষকদের মতে, আইনি লড়াইয়ে প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তার অপ্রতুলতার কারণেই প্রান্তিক এই মানুষগুলো নিজেদের পৈতৃক ভিটা রক্ষা করতে ব্যর্থ হন। এছাড়া রাজশাহীর মল্লাপাড়ায় ৫৩ বছর ধরে বসবাসরত ১৩টি পাহাড়ি পরিবারও উচ্ছেদের চরম হুমকির মুখে পড়ে। অন্যদিকে, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল আদিবাসীদের ওপর ভূমি দখলদারদের অতর্কিত হামলায় বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। জাফলংয়ের লামা পুঞ্জির খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রায় ১ হাজার ৭০০ পানগাছ দুর্বৃত্তরা কেটে ধ্বংস করে দেয়, যা এই সম্প্রদায়ের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের পানবরজের প্রায় ১ হাজার ৭০০ পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনাটি তাদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার জন্য পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
এদিকে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুরাও পাহাড়ি ও সমতল—উভয় অঞ্চলেই চরম সহিংসতার শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বছরজুড়ে ৩২ জন আদিবাসী নারী ও শিশু যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন আদিবাসী নারী প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেকে দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এসব ঘটনার অনেকগুলোতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা কিংবা বিচার পাওয়ার দীর্ঘসূত্রিতা লক্ষ্য করা গেছে, যা আদিবাসী সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও দীর্ঘায়িত করেছে।
ইতিবাচক পদক্ষেপ:
এরই মাঝে কিছু প্রশাসনিক, আইনি ও নীতিগত পদক্ষেপও দৃশ্যমান হয়েছে। গত বছরের আগস্টে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের নতুন চেয়ারপারসন হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মুহাম্মদ আবদুল হাফিজকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে বছরের শুরুতে সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি পুনর্গঠন করা হয় এবং জুলাই মাসে রাঙামাটিতে এই কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ১০ম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলা পরিষদে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং ভূমি কমিশনের বিধিমালা চূড়ান্ত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এছাড়া বর্তমান গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার লক্ষ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ অনুমোদন করা হয়। এই নতুন অধ্যাদেশের বিধান অনুযায়ী, কমিশনের ৫ সদস্যের প্যানেল এবং ৭ সদস্যের সার্চ কমিটিতে আদিবাসী ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়ের অন্তত একজন প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা মানবাধিকার সুরক্ষায় কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে।
মানবাধিকার কর্মী ও আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ মনে করেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং মানবাধিকারের প্রকৃত সুরক্ষার জন্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং তাদের জীবন-জীবিকার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। খনি সম্প্রসারণ, বন উজাড় এবং জবরদখলের সংস্কৃতি অবিলম্বে বন্ধ না হলে এই প্রান্তিক মানুষগুলোর অস্তিত্ব প্রতিনিয়ত বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী জ্যোতিকার লিপি বলেন, পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী নারী এবং কন্যাশিশুরা প্রতিনিয়ত বহুমুখী সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে আসছে সেই চিত্র খুবই করুণ। ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রিতা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পুলিশি পদক্ষেপ বা আইনি সহায়তার ঘাটতি বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখছে। পার্বত্য শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং ভূমি কমিশনকে কার্যকর করার মাধ্যমেই কেবল এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও গবেষক সঞ্জীব দ্রং বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের কিছু স্বীকৃতি মিললেও সমতল ও পাহাড়ে আদিবাসীদের মূল সংকট অর্থাৎ ভূমি অধিকার এখনো উপেক্ষিত রয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে আইনি মারপ্যাঁচে এবং নোটিশ ছাড়াই আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তাতে প্রমাণিত হয় যে তারা নিজের দেশের মাটিতেই ভূমিহীন হয়ে পড়ছেন। আইনি লড়াই চালানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য প্রান্তিক এই মানুষগুলোর নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে আদিবাসী প্রতিনিধি রাখার বিষয়টি একটি ভালো উদ্যোগ হলেও মাঠপর্যায়ে জবরদখল ও নির্যাতন বন্ধ না হলে আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হবে।