
নবজাতকের পরিচর্যা নিয়ে পরিবার কিংবা সমাজভেদে ভিন্ন ভিন্ন কনসেপ্ট বা ধারণা বিদ্যমান। সেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কিছু আলোকপাত করা হলো।
১) গোসল নিয়ে ভাবনা
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় জন্মের পর পর গোসল বা স্নান করিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এটা ভুল। প্রকৃত পক্ষে প্রথম ৪/৫ দিন গোসল না করাই ভালো। কেননা মায়ের পেট থেকে জন্মের সময় নবজাতকের গায়ে দইয়ের মত আইসক্রিমের মত যে সাদা ক্রিম থাকে তা প্রথম কয়েক দিন বেবিকে জীবাণু মুক্ত রাখে এবং শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখে। জন্মের পর পর গোসল করিয়ে দিলে সেই সাদা ক্রিম চলে যায়। চামড়ার জীবাণু রোধী ক্ষমতা এবং টেম্পারেচার স্ট্যাবিলিটি কিছুটা কম্প্রোমাইজ হয়ে যায়।
গোসল কখন শুর করবেন? প্রথম ৪/৫ দিন পর থেকে গা মোছানো উচিত। নাভী কাঁচা থাকা পর্যন্ত এই গা মোছানো প্রতিদিন চলবে। যখন দেখবেন নাভী ঝরে গোড়া শুকিয়ে গেছে তারপর থেকে প্রতিদিন নিয়মিত স্নান করাবেন। সূর্য উঠেনি, মেঘলা দিন, ঠান্ডা বাতাস থাকলেও কোন অবস্থায় স্নান বন্ধ করা যাবে না। প্রয়োজনে কুসুম গরম পানি দিয়ে হলেও স্নান চালিয়ে যেতে হবে প্রতিদিন একই সময়ে। একদিন সকালে একদিন বিকেলে এরকম করা উচিত নয়।
২) মাথা ন্যাড়া নিষেধ
বিশেষ কোন কন্ডিশন ছাড়া কোনভাবেই চুল সেইভ বা ন্যাড়া করবেন না। তাতে ক্ষতি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। বরং বেশি লম্বা হলে একটু ছাঁটাই করে দিন। কিছু চুল মাথায় রাখা উচিত। বেশি লম্বা না হয় আবার বেশি খাটোও না এমন রাখবেন। ভুল ধারণা হলো মায়ের পেটের চুল নাপাক বা অপবিত্র। এটি একদম ভুল ধারণা। বরং মায়ের পেটের চুল পাক পবিত্র। প্রয়োজনীয় বলেই জন্মের সাথে গজিয়ে উঠেছে। জোর করে ছেঁটে দিলে চামড়া কেটে ইনফেকশন হয়ে যাবে। কাজেই মায়ের পেটের চুল জন্মের পর পর ন্যাড়া করা নিষেধ। ময়লা হলে শ্যাম্পু করাবেন।
৩) মাথায় তেল বা গোসলের আগে/পরে গায়ে তেল; কোনটা ভালো?
মাথার তালু বরাবর তেল দিয়ে ভিজিয়ে রাখা ভালো নয়। গ্রাম বাংলায় ধারণা হলো সরিষা তেল দিলে ঠান্ডা লাগে না। এটা একটা ভুল ধারণা। বাস্তবে যেকোন তেল দিয়ে ধুবধুবি ভিজিয়ে রাখলে ঠান্ডা লাগার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। গোসলের আগে গায়ে তেল দেয়া এটাও প্রচলিত আছে। এটাও ভুল। আগে তেল মাখালে গোসল করালেও লোম কুপ পরিস্কার হবে না। বরং শীতকালে গোসলের পর হাতে, পায়ে, গায়ে তেল মাখালে ভালো। কোনভাবেই গোসলের আগে নয়।
৪) নাভীর যত্ন
খুবই উদ্বেগ সৃষ্টি হয় এটির অবস্থা দেখে। নাভী ঝড়ার পর সামান্য রক্ত পড়তে পারে। এটি দুয়েকদিন পর আপনা বন্ধ হয়ে যাবে। কোন তেল পাউডার বা হেক্সিসল বা ভায়োডিন দেবেন না। ভায়োডিন প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বিশেষ ক্ষেত্রে দেবেন। নিজেরা নিজেরা দিতে যাবেন না। কাঁচা অবস্থায় ভেজাবেন না। নাভী পরিস্কার এবং শুকনা রাখুন।
৫) চোখের যত্ন
জন্মের পর লম্বা নক থাকলে ছেটে দিন কিংবা হাত মোজা পড়িয়ে দিন যেন চোখে আঘাত না লাগে। চোখে পিচুটি হতে পারে এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, ঠিক হয়ে যাবে।
ফলো আপ : এটি গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের প্রথম সপ্তাহে একবার। তারপর ১৫ দিন পর। তারপর ৩ মাস পর এবং কম ওজন বা প্রিম্যাচিউর ডেলিভারি হলে প্রথম ২৮ দিনের মধ্যেই চোখ পরীক্ষা বা ROP test করিয়ে নিন। এটা খুবই জরুরী পরীক্ষা। দেরী হলে শিশু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়ে যেতে পারে।
লেখক : ডা সুশান্ত বড়ুয়া, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ।