
পদ্মা আর যমুনা নদীর মিলনস্থলে জেগে ওঠা নতুন একটি চর, যার নাম গোয়ালন্দ চর। প্রশাসনিকভাবে এটি রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার অন্তর্গত হলেও এর অবস্থান এতটাই সীমানার কাছে যে এর আশপাশেই রয়েছে মানিকগঞ্জ ও পাবনার বিস্তৃত চরাঞ্চল।
এখানে যারা বসতি গড়েছেন, তাদের বেশির ভাগই বাস্তুচ্যুত। একসময় মানিকগঞ্জের আলোকদিয়া, বোষ্টমির চর কিংবা পাবনার চরাঞ্চলে তাঁদের ঘর ছিল। কিন্তু বারবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে শেষমেশ আশ্রয় নিয়েছেন পদ্মার বুকে নতুন করে জেগে ওঠা এই চরে। নতুন ঠিকানা হলেও, কষ্ট পুরোনো।
কোনো সরকারি অবকাঠামো নেই
চরটিতে নেই বিদ্যুৎ, নেই স্কুল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। যাতায়াতের জন্য নেই কোনো পাকা রাস্তা। শুকনো মৌসুমে চারদিক হয়ে ওঠে উত্তপ্ত চুল্লি আর বর্ষায় চারপাশ ডুবে থাকে পানিতে। এ যেন প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার এক পরীক্ষাগার।

যেসব শিশু এখানে বেড়ে উঠছে, তাদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য যেতে হয় পাশের কুশেহাটা চরে কিংবা নদী পার হয়ে মানিকগঞ্জের আরিচাঘাট এলাকায়। অভিভাবকদের অনেকেই বলেন, “পেট চালানোই যেখানে কষ্ট, ছেলেমেয়েকে পড়াব কী করে?”
জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ
এই চরের মানুষের প্রধান জীবিকা গবাদিপশু পালন ও মাছ ধরা। শীতকালে এখানে টমেটোর চাষ হয় প্রচুর, তবে এই তীব্র গরম আর খরায় কৃষিকাজ প্রায় বন্ধ। যারা জমি চাষ করেন, তারা কাছাকাছি কুশেহাটা বা রাখালগাছি চরে গিয়ে কাজ করেন।

জুনের শুরুতে যখন এই প্রতিবেদকের সফর, তখন গোটা এলাকা দাবদাহে জ্বলছিল। চর পেরিয়ে রাখালগাছি ঘাটে পৌঁছেই দেখা গেল, মাঠের মধ্যে কাজ শেষ করে কৃষকেরা পানিতে নেমে থালা-বাসন ধুচ্ছেন। এই পানিই তাঁদের পানীয় জলও।
চরে পৌঁছানোর আগে অন্তর মোড় নামের একটি ঘাট থেকে টলারে উঠতে হয়। এখান থেকেই চর ও মূল ভূখণ্ডের মানুষ নিত্যদিন পারাপার করেন। ঘাটটি নিরিবিলি হওয়ায় বিকেলে অনেকেই পদ্মা পাড়ে সময় কাটাতে আসেন।
ঈদের আগমুহূর্তে ব্যস্ত চরবাসী
এই সফর হয়েছিল কোরবানির ঈদের কয়েকদিন আগে। ঘাটে দেখা গেল অনেকেই গরু-ছাগল নিয়ে এসেছেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অনেকেই এখানে দামপত্র দেখে হাটে নেবেন কি না, তা ঠিক করবেন। কেউ কেউ আবার এখানেই খুচরা বিক্রি করছেন। স্থানীয় ব্যাপারিরাও ঘাটে এসে পশু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন রাজবাড়ী বা মানিকগঞ্জের হাটে।

প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর ঘাট থেকে টলার ছাড়ে। আমরা ১১টার টলারে উঠেছিলাম। টলার ভর্তি হতে থাকল মানুষে ও পশুতে। একটি টলারে মানুষ, আরেকটিতে কেবল ছাগল। পথে দেখা মিলল মাছ ধরার নৌকার। এই সময়ে পদ্মার মাছের পেটে ডিম থাকে, তাই প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপরও জেলেরা পেটের দায়ে বের হন। কেউ বলেন, “বিকল্প কিছু দিলে না হয় মাছ ধরা ছাড়তাম।”
পাখিদের আনাগোনা, সৌন্দর্যের হাতছানি
চরের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ দেখা মেলে দূরদেশ থেকে আসা অতিথি পাখিদের। এখনও তারা ফিরে যায়নি। চরজুড়ে অবাধ উড়াউড়ি, হাঁটাহাঁটি। এমন দৃশ্য দেখে মন জুড়িয়ে যায়। মনে হয়, প্রকৃতিও বুঝি চরবাসীর দুঃখ ভাগ করে নিতে আসে।

রাখালগাছি ঘাটের গল্প
আমাদের টলার থামে রাখালগাছি ঘাটে। সেখানেই চোখে পড়ে ঘোড়ার গাড়িতে করে হাঁসের ডিম শহরে পাঠানোর দৃশ্য। চরাঞ্চলের মুক্ত মাঠে পালিত হাঁসের ডিম চলে যায় বাজারে, আর এখানকার মানুষ খায় ফার্মের ডিম—এ যেন গ্রামীণ বাংলাদেশের এক নিঃসঙ্গ বৈপরীত্য।

ঘাট থেকে রওনা দেই গোয়ালন্দ চরের দিকে। বালুর মধ্যে দুই চাকার গাড়ির চিহ্ন দেখে বোঝা যায়, এপথে কেবল মোটরসাইকেল বা ছোট গাড়িই চলে। যাত্রা শেষে দেখা হয় স্থানীয় দুই বাসিন্দা চান্দু মোল্লা ও শামীম রিজভির সঙ্গে, যারা নিজেরা নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং এখন এই নতুন চরে বাস করছেন।
ভবিষ্যৎ কী অপেক্ষা করছে?
গোয়ালন্দ চর এখনো গড়েপিটে তৈরি হচ্ছে। জীবন অনেকটা অস্থায়ী হলেও মানুষজন এখানে স্থায়ী হবার চেষ্টা করছেন। চরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টিনের ঘরগুলো বলছে—মানুষ থেমে নেই।
তবে চরের মানুষ চান, অন্তত একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় হোক, একটি টিউবওয়েল থাকুক, বিদ্যুৎ আসুক। তারা চান, জীবনটা শুধু টিকে থাকার না হয়ে একটু এগিয়ে যাওয়ারও হোক।