ঢাকারবিবার , ৮ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য

তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক বাড়ছে কেনো?

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২৭ এপ্রিল ২০২৫, ১:১৪ বিকাল

Link Copied!

বয়স্কদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের হার কমলেও, তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের সংখ্যা সারা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে — যা অনেক চিকিৎসকের মতে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। (তরুণ বলতে সাধারণত ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের বোঝানো হয়।) বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এখন আগের তুলনায় তরুণদের মধ্যে নানা ধরনের হৃদরোগের প্রবণতা বেড়েছে। এর মূল কারণ খারাপ জীবনযাপন — যেমন অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরচর্চার অভাব — দায়ী। কিছু গবেষণা বলছে, কোভিড সংক্রমণও পরিস্থিতি আরও খারাপ করছে। (শুধু হার্ট অ্যাটাক নয়, তরুণদের মধ্যে কোলন ক্যানসারের হারও বাড়ছে।)

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে নিউ ইয়র্ক সিটি ট্রায়াথলনে দৌড়ানোর সময় ৩৮ বছর বয়সী এক সুস্থ ব্যক্তি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে পড়ে যান। যিনি আগে কোনো ঝুঁকি ফ্যাক্টরেই ভুগছিলেন না। আর ২০২৩ সালে, এনবিএ তারকা লেব্রন জেমসের বড় ছেলে ১৮ বছর বয়সী ব্রনি জেমস বাস্কেটবল প্র্যাকটিসের সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে যান। (পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার জন্মগত হৃদরোগের সমস্যা ঠিক করা হয় এবং তিনি খেলায় ফিরে আসেন।) এইসব ঘটনা তরুণদের হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

“তরুণরা মনে করে হৃদরোগ শুধু বৃদ্ধদের সমস্যা, কিন্তু এটা ঠিক নয়,” বলছেন ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেন্স হাসপাতালের সিনিয়র প্রতিরোধমূলক কার্ডিওলজিস্ট এবং হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মেডিসিন অধ্যাপক রন ব্ল্যাঙ্কস্টেইন। “ভালো খবর হলো, হৃদরোগ অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব, যদি সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।”

তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের হার বাড়ছে

হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন ঘটে যখন হৃদপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে বুক ব্যথা বা অস্বস্তি, ব্যথা চোয়াল, গলা, পিঠ বা বাহুতে ছড়িয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট এবং দুর্বল বা মাথা ঘোরানো অনুভূতি।

ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ স্ট্যাটিস্টিকস-এর মতে, ২০১৯ সালে ১৮ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ০.৩% হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা ঘটেছিল, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ০.৫% হয়েছে — অর্থাৎ চার বছরে ৬৬% বৃদ্ধি। অন্যদিকে অন্যান্য বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের হার কমেছে।

আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দুইটি মার্কিন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দুই হাজারের বেশি তরুণ হার্ট অ্যাটাক রোগীর মধ্যে প্রতি পাঁচজনে একজনের বয়স ৪০-এর নিচে ছিল। এবং এই হার প্রতিবছর ২% করে বাড়ছে।

এই গবেষণা আরও দেখিয়েছে, ৪০ বছরের কম বয়সীরা হার্ট অ্যাটাকের পর আবার হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা অন্য কোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকিতে বৃদ্ধদের মতোই থাকে।

২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তরুণদের মধ্যে হৃদরোগের বৃদ্ধিই যুক্তরাষ্ট্রের গড় আয়ুষ্কালের পতনের ৪% জন্য দায়ী ছিল বলে ২০২৩ সালে জার্নাল অব আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয় জানিয়েছে।

এছাড়া তরুণদের মধ্যে হার্ট ফেইলারের (যখন হৃদপিণ্ড শরীরের প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়) হারও বাড়ছে। ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৪৫ বছরের নিচের মানুষের হার্ট ফেইলারে মৃত্যুর হার ১৯৯৯-২০১২ সালের মধ্যে হওয়া উন্নতি সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

এই সমস্যা শুধু আমেরিকানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তান ও ভারতেও তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের হার বাড়ছে। “হৃদরোগ আন্তর্জাতিক সীমা মানে না,” বলেন ব্ল্যাঙ্কস্টেইন, “তেমনি ঝুঁকি ফ্যাক্টরও মানে না।”

যদিও হার্ট অ্যাটাক সাধারণত পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে তরুণীদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের হার দ্রুত বাড়ছে এবং তাদের মৃত্যুঝুঁকিও বেশি।

২০১৮ সালে ‘সার্কুলেশন’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৫-৯৯ সালের মধ্যে ৩৫-৫৪ বছর বয়সীদের হার্ট অ্যাটাকের সংখ্যা ২৭% থেকে বেড়ে ২০১০-১৪ সালে ৩২% হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি হয়েছে তরুণীদের মধ্যে।

গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণী রোগীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ব্ল্যাক (আফ্রো-আমেরিকান) এবং উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা ও স্ট্রোকের ইতিহাস ছিল বেশি। তাছাড়া চিকিৎসকরা নারীদের লক্ষণগুলোকে কম গুরুত্ব দেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কম দেন বলে দেখা গেছে।

প্রধান ঝুঁকিগুলো কী কী?

বেশিরভাগ গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং স্থূলতার হার বেড়েছে — যেগুলো রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত করে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক সময় এগুলো বংশগত হলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে এগুলো হয়, যা অনেকের জীবনযাত্রার শুরু থেকেই গড়ে ওঠে।

কোভিড সংক্রমণও তাৎক্ষণিকভাবে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিডের কারণে রক্ত ঘন হয়ে যায়, যা ধমনীতে জমাট বাঁধিয়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। ধূমপান, কোকেন, মারিজুয়ানা, ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনও তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। তাছাড়া, বর্ণবৈষম্য ও সামাজিক বৈষম্যের কারণেও তরুণ রঙিন মানুষেরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

তরুণরা ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন নয়

তবে বেশিরভাগ তরুণ নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে উদ্বিগ্ন নয়। ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির ২০২৩ সালের জরিপে দেখা গেছে, ৪৫ বছরের নিচে ৪৭% মানুষ মনে করে না যে তারা হৃদরোগের ঝুঁকিতে আছে। এবং এক তৃতীয়াংশ মানুষ জানে না হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কী। চিকিৎসকরা তরুণ রোগীদের ঝুঁকি কম মনে করায় সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া হয় না বলেও বলা হয়েছে।

২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত হৃদরোগের ঝুঁকি নির্ধারণকারী প্রধান ক্যালকুলেটরটি (American Heart Association) ৪০-৭৯ বছর বয়সীদের জন্যই ছিল। ২০২৩ সালের নতুন PREVENT ক্যালকুলেটরে ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে সবাই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়া বর্তমান নির্দেশিকা অনুযায়ী, বেশিরভাগ তরুণ হার্ট অ্যাটাক রোগী হার্ট অ্যাটাকের আগে কোলেস্টেরল চিকিৎসার জন্য যোগ্য হতেন না, বিশেষ করে তরুণীরা।

ঝুঁকি কমানোর উপায়

প্রাথমিক প্রতিরোধ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকি ফ্যাক্টর যত দ্রুত শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, হৃদরোগ ও মারাত্মক ফলাফল হওয়ার সম্ভাবনা তত কমে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন “লাইফ’স এসেনশিয়াল ৮” মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে। এই ৮টি বিষয় হলো : স্বাস্থ্যকর খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ওজন, কোলেস্টেরল, রক্তচিনি ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ।

২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২১-২৭ বছর বয়সী তরুণরা যারা এই নিয়মগুলো ভালোভাবে মেনে চলেছে, তাদের গলা ও ঘাড়ের প্রধান রক্তনালীগুলো (carotid arteries) ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি সুস্থ। “তরুণ বয়স হল হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য সেরা সময়,” বলেন জন উইলকিন্স, নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

অনুবাদ : ইব্রাহীম খলিল

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে ঢাকায় শুরু হলো ৩০তম ইউএস ট্রেড শো ২০২৬

কপ৩১-এর আগে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের ঐক্যের ডাক

এশিয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রকৃতির মূল্য সংযোজনের উদ্যোগ জাতিসংঘের

ত্রাণ কমেছে, বেড়েছে ভয় : রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারী ও শিশুদের বোবা কান্না

গাজায় ৭ কোটি টন ধ্বংসাবশেষ: পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা

বিশ্বে জনমিতিতে বড় পরিবর্তন: জন্ম-মৃত্যুর ব্যবধানে শীর্ষে যে দেশগুলো

অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল যেন নীরব ঘাতক! অজান্তেই খাবারে মিশছে বিষাক্ত সিসা

জ্বালানি সংকটের ধাক্কায় দেশে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের রেকর্ড বিক্রি

জলবায়ু পরিবর্তনে ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকিতে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র

আগামী কয়েক দিন যেমন থাকবে দেশের আবহাওয়া

অটিজমের সংজ্ঞা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন বিতর্ক

জলবায়ু ঝুঁকি বাড়ছে, অর্থায়ন বাড়ছে না: জাতিসংঘ