
নিউজিল্যান্ডে বেকারত্বের হার বেড়ে ৫ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির শ্রমবাজারে এই অবনতি দেখা গেছে। একই সময়ে কর্মসংস্থানও কমেছে। প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল এই শ্রমবাজারের পরিস্থিতি দেশটির অর্থনীতি ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে নিউজিল্যান্ডের বেকারত্বের হার বেড়ে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। এর আগে দ্বিতীয় প্রান্তিকে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৫ সালের পর দেশটিতে বেকারত্বের হার আর এত বেশি দেখা যায়নি।
অর্থনীতিবিদরা তৃতীয় প্রান্তিকে বেকারত্বের হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউজিল্যান্ডের পূর্বাভাসেও একই হার উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে বাস্তবে বেকারত্বের হার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়েছে।
এদিকে শ্রমবাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক কর্মসংস্থানেও দুর্বলতা দেখা গেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে কর্মসংস্থান আগের প্রান্তিকের তুলনায় শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। অথচ অর্থনীতিবিদরা এই সময়ে কর্মসংস্থান শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করেছিলেন।
নিউজিল্যান্ডের পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটস এনজেডের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশটিতে বেকার মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজারে। একই সময়ে কর্মসংস্থানের হার কমে ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানে ১৭ হাজার মানুষের সংখ্যা কমলেও খণ্ডকালীন কর্মসংস্থানে বেড়েছে ১৫ হাজার। অর্থাৎ চাকরির বাজারে পূর্ণকালীন কাজের তুলনায় খণ্ডকালীন কাজের প্রবণতা বাড়ছে।
অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির গতিও তুলনামূলক ধীর হয়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার পারিশ্রমিক বাদে বেসরকারি খাতের শ্রমব্যয় সূচক আগের প্রান্তিকের তুলনায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। বার্ষিক হিসাবে এই বৃদ্ধির হার ২ শতাংশ। মজুরি বৃদ্ধির এই গতি দেশটির মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত সপ্তাহে নিউজিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিনির্ধারণী সুদের হার ২ দশমিক ৭৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। তবে এর আগে দুবার সুদের হার বাড়ানোর পরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল ব্যাংকটি।
শ্রমবাজারের দুর্বল পরিস্থিতি ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন কিছু অর্থনীতিবিদ। দেশটির কিউইব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের মতে, শ্রমবাজারে এই দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতির চাপও কমতে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার আরও বাড়ানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে।
এদিকে নিউজিল্যান্ডে আগামী ৭ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে বেকারত্ব বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এতে প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুকসনের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পার্টির জোট সরকারের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে চাপ বাড়ছে।
দেশটির বিরোধী দল লেবার পার্টির অর্থবিষয়ক মুখপাত্র শ্রমবাজারের অবনতির জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন। তবে অর্থমন্ত্রী নিকোলা উইলিস অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
সব মিলিয়ে বেকারত্ব বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানে নিম্নগতি এবং মজুরি বৃদ্ধির ধীর গতি নিউজিল্যান্ডের অর্থনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে প্রকাশিত এই শ্রমবাজারের পরিসংখ্যান ক্ষমতাসীন সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়াতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও নিউজিল্যান্ডের পরিসংখ্যান সংস্থা (Stats NZ)।