
মঙ্গল গ্রহের প্রাচীন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলেছে সাহারা মরুভূমিতে পাওয়া একটি উল্কাপিণ্ডে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, ‘তেগাজা ০০১’ (Teghaza 001) নামের এই উল্কাপিণ্ডটির বয়স অন্তত ৪১০ কোটি বছর। এতে প্রাচীন মঙ্গল গ্রহে তরল পানির উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। যা ইঙ্গিত দেয়, একসময় গ্রহটিতে প্রাণের বিকাশের উপযোগী পরিবেশ থাকতে পারে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে আফ্রিকার দেশ মালির সাহারা মরুভূমিতে উল্কাপিণ্ডটি আবিষ্কৃত হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি মঙ্গল গ্রহের ভূত্বকে তৈরি হয়েছিল। পৃথিবীতে পাওয়া মঙ্গল গ্রহের প্রায় ৪৩৫টি উল্কাপিণ্ডের মধ্যে এটি সবচেয়ে প্রাচীন নমুনা হতে পারে।
গবেষকদের মতে, তেগাজা ০০১ মঙ্গল গ্রহের এমন এক সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে, যখন গ্রহটি বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ ও আর্দ্র ছিল। ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গ্রহবিজ্ঞানী ইয়াং লিউ বলেন, উল্কাপিণ্ডটি এমন এক সময়ের প্রমাণ দিচ্ছে, যখন মঙ্গল গ্রহের পরিবেশ সম্ভবত তার পরবর্তী সময়ের তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ ও আর্দ্র ছিল।
উল্কাপিণ্ডটির গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটি ‘গ্যাব্রো’ নামের এক ধরনের দানাদার আগ্নেয় শিলা। মঙ্গল গ্রহের ভূগর্ভে ম্যাগমা ধীরে ধীরে শীতল হয়ে স্ফটিক তৈরি করার সময় শিলাটি পানির সংস্পর্শে এসেছিল। এতে থাকা বিভিন্ন খনিজ ও আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে প্রাচীন মঙ্গল গ্রহে পানির উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠ থেকে পানি ভূত্বকের গভীরে প্রবেশ করছিল। পরে সেই পানি ভূগর্ভ থেকে উঠে আসা গলিত শিলার সঙ্গে মিশে যায়। উল্কাপিণ্ডে থাকা অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের বিভিন্ন আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ফসফেটে থাকা হাইড্রোজেনের আইসোটোপ এবং খনিজ ও নমুনার অক্সিজেনের আইসোটোপ প্রাচীন মঙ্গল গ্রহে পানির উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণার সহলেখক ও নাসার এমস রিসার্চ সেন্টারের গ্রহবিজ্ঞানী লি সাপার বলেন, এসব ফলাফল আদি মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ও পরিবেশ থাকার ধারণাকে সমর্থন করে। তবে সেখানে সত্যিই প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, এ গবেষণা তার সরাসরি উত্তর দেয় না।
বিজ্ঞানীদের মতে, কয়েক বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠে নদী, হ্রদ এবং উত্তর গোলার্ধে একটি মহাসাগর ছিল বলে বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে গ্রহটির অস্তিত্বের প্রথম এক বিলিয়ন বছর বা তার কিছু বেশি সময়ের মধ্যে বাসযোগ্য পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। একপর্যায়ে মঙ্গল গ্রহ বর্তমানের মতো শীতল, শুষ্ক ও প্রতিকূল পরিবেশে পরিণত হয়।
তেগাজা ০০১ উল্কাপিণ্ডটি আটটি খণ্ডে পাওয়া গিয়েছিল। এর সবচেয়ে বড় অংশটি প্রায় মানুষের মুষ্টির সমান। মালির বির চালি গ্রাম থেকে প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দূরের মরুভূমিতে এটি আবিষ্কৃত হয়। এর প্রধান খনিজ উপাদান ফেল্ডস্পার ও পাইরোক্সিন। পাশাপাশি এতে ইউরেনিয়ামযুক্ত জিরকন স্ফটিক রয়েছে। ইউরেনিয়াম সময়ের সঙ্গে তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে সিসায় পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা উল্কাপিণ্ডটির বয়স নির্ধারণ করেছেন।
গবেষণার প্রধান লেখক ইয়াং লিউ বলেন, মঙ্গল গ্রহ থেকে আসা উল্কাপিণ্ডগুলোই বিজ্ঞানীদের হাতে থাকা ওই গ্রহের সরাসরি নমুনা। এসব নমুনা গবেষণাগারে পরীক্ষা করে প্রাচীন মঙ্গল গ্রহের গঠন, বিবর্তন এবং সেখানে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ ছিল কি না, তা বোঝার সুযোগ পাওয়া যায়। পাশাপাশি স্যাটেলাইট, ল্যান্ডার ও রোভারের মাধ্যমে মঙ্গল গ্রহ নিয়ে পরিচালিত গবেষণার তথ্য যাচাই ও সমৃদ্ধ করতেও এসব নমুনা সহায়তা করে।
গবেষকদের মতে, মঙ্গল গ্রহের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে এমন উল্কাপিণ্ডের সংখ্যা মাত্র তিনটি। এর মধ্যে ১৯৮৪ সালে অ্যান্টার্কটিকায় পাওয়া একটি উল্কাপিণ্ডের বয়স প্রথমে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সেটির বয়সও তেগাজা ০০১-এর কাছাকাছি। নতুন গবেষণা অনুযায়ী, এই দুই উল্কাপিণ্ডের মধ্যে তেগাজা ০০১ সম্ভবত বেশি প্রাচীন।
রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, তেগাজা ০০১ মঙ্গল গ্রহের দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চভূমি থেকে এসেছে। সম্ভবত এটি গ্রহটির অন্যতম বৃহৎ অভিঘাত গহ্বর হেলাস বেসিনের কাছাকাছি কোনো এলাকায় তৈরি হয়েছিল।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠে কোনো বড় বস্তুর আঘাতে উল্কাপিণ্ডটি মহাকাশে ছিটকে পড়ে। দীর্ঘ সময় মহাকাশে ভেসে থাকার পর এটি পৃথিবীর কাছাকাছি আসে এবং বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে সাহারা মরুভূমিতে পড়ে। তবে ঠিক কখন এটি পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছিল, তা এখনো জানা যায়নি।
উল্কাপিণ্ডটি নিয়ে গবেষণাটি বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স