
বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় আশঙ্কাজনক হারে ক্ষতিকর বিষাক্ত কীটনাশক ও কৃত্রিম প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে চলেছে। মানবস্বাস্থ্য, মাটি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ানো এই রাসায়নিক ও বর্জ্য দূষণ রোধে বিশ্বব্যাপী লড়াই শুরু করেছে জাতিসংঘের পরিবেশ সংক্রান্ত সংস্থাগুলো।
গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির (জিইই) অর্থায়নে পরিচালিত ‘ফাইন্যান্সিং অ্যাগ্রোকেমিক্যাল রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ (ফার্ম) উদ্যোগটি এবার এশিয়া-প্যাসিফিক, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার আরও নতুন আটটি দেশসহ মোট ১৫টি দেশে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেছে।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আয়োজিত ‘ফার্ম দ্য ট্রানজিশন ফোরাম’ শীর্ষক বৈশ্বিক সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন সম্প্রসারণের রূপরেখা ও কার্যক্রম ঘোষণা করা হয়। সম্মেলনে ৪০টিরও বেশি দেশের অন্তত ১৫০ জন প্রতিনিধি, জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং পরিবেশ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন।
২০২৪ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) নেতৃত্বে ‘ফার্ম’ প্রোগ্রামের সূচনা হয়। প্রথম ধাপে এটি পৃথিবীর সাতটি দেশে—ইকুয়েডর, ভারত, কেনিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, উরুগুয়ে এবং ভিয়েতনামে বাস্তবায়িত হয়। এই সাতটি দেশে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জিইএফ প্রায় ৪৪৪ কোটি টাকা অনুদান প্রদান করে, যা পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি খাত থেকে আরও প্রায় ৪ হাজার ৮০ কোটি টাকা সহ-অর্থায়ন টানতে সক্ষম হয়।
ব্যাংকক ফোরামে এই কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে ‘ফার্ম প্লাস’ -এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা ঘোষণা করা হয়। ইউএনইপির নেতৃত্বে চালুর অপেক্ষায় থাকা এই দ্বিতীয় ধাপে আরও আটটি দেশ যুক্ত হচ্ছে। দেশগুলো হলো—বেনিন, কোস্টা রিকা, মিশর, দ্য গাম্বিয়া, ঘানা, মেক্সিকো, নেপাল এবং নাইজেরিয়া।
দুই ধাপ মিলিয়ে ‘ফার্ম’ ও ‘ফার্ম প্লাস’ বর্তমানে ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্মিলিত অর্থায়নে পৃথিবীর ১৫টি দেশে নিরাপদ, টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ শুরু করছে।
কৃষি উৎপাদনে অতিরিক্ত কীটনাশক ও প্ল্যাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং টেকসই চাষাবাদ নিশ্চিত করতে পরিবেশবিদদের এই মহাজোট সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যেমন-
বিষাক্ত বর্জ্য হ্রাস: পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ৫০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ এবং ২০ হাজার মেট্রিক টন কৃষিপ্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া রোধ করা।
জমি ও মৃত্তিকা পুনরুদ্ধার: অতিরিক্ত রাসায়নিকের কবলে পড়ে বন্ধ্যা হতে বসা প্রায় ৩০ লাখ (৩ মিলিয়ন) হেক্টর কৃষিজমি উর্বর করে তোলা এবং মাটি ও পানির মান ফিরিয়ে আনা।
জনগণের জীবনমান উন্নয়ন: বৈশ্বিক এই রূপান্তরের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ৩৮ লাখ (৩.৮ মিলিয়ন) সাধারণ মানুষ ও কৃষকের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।
কৃষি ঋণের নতুন দিশা: বিশ্বজুড়ে অন্তত ১৫০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এমন ঋণের ব্যবস্থা করতে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে কৃষকরা বিষাক্ত রাসায়নিক বাদ দিয়ে পরিবেশবান্ধব জৈব চাষাবাদে অর্থায়ন পেতে পারেন।
সম্মেলনে জানানো হয়, প্রথম ধাপের সাতটি দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন ইতিমধ্যেই আসতে শুরু করেছে। লাওস, উরুগুয়ে এবং কেনিয়া ক্ষতিকর কীটনাশকের বদলে প্রাকৃতিকভাবে বালাই নিয়ন্ত্রণের আইনি নীতি প্রণয়ন করেছে। ইকুয়েডরে স্থানীয় কৃষকদের পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবনে ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের প্রণোদনা তহবিল দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ভারতে কৃষক পর্যায়ে পারস্পরিক শিখন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রায় ২০ লাখের বেশি কৃষককে টেকসই কৃষি চর্চায় যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
সম্মেলনে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষিব্যবস্থায় ফিরতে হবে। ‘ফার্ম প্লাস’ কর্মসূচির আওতায় নতুন আটটি দেশে সরকারি নীতি সংস্কার, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কৃষিপ্লাস্টিক পুনঃব্যবহার এবং রাসায়নিকমুক্ত জৈব বিকল্পের বাণিজ্যিক বাজার তৈরির কাজ ত্বরান্বিত করা হবে।