
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, আমলাতান্ত্রিক অনিয়ম প্রকাশ, অপরাধ ও দুর্নীতি উন্মোচন এবং চরমপন্থী মতাদর্শের বিরোধিতা করার খেসারত দিতে গিয়েই গত চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে অন্তত ৪৩ সাংবাদিক হামলা, মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটরের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠেছে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংবাদকর্মীরা পেশাগত দায়বদ্ধতা থেকে যেসব স্পর্শকাতর বিষয়ে সত্য প্রকাশ করতে গিয়েছেন, ঠিক সেসব ক্ষেত্র থেকেই তাদের ওপর নেমে এসেছে পরিকল্পিত প্রতিশোধ।
তারা বলছে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাষ্ট্রীয় আইনি ব্যবস্থার অপব্যবহার, আমলাতান্ত্রিক প্রতিশোধ এবং অপরাধী চক্রের যৌথ আক্রমণে দেশজুড়ে সাংবাদিকদের জন্য কাজ করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।
# ভীতি প্রদর্শন ও মামলার জালে ১৯ জন
# শারীরিক হামলা শিকার ১১ সাংবাদিক
# সাংবাদিকের বাসায় হামলা ও অভিযান
# অরাজনৈতিক হামলার শিকার ২৫ জন
# সংবাদ সম্মেলনে নারী সাংবাদিকে অবমাননা
# ৫টি সংবাদ মাধ্যমে সরাসরি হামলা
আইনি নিপীড়ন ও ভীতি প্রদর্শন:
তথ্যপ্রবাহ রুদ্ধ করতে সেপ্টেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও আইনি ব্যবস্থার অস্ত্রায়ন। এসব ঘটনার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৫.৪৮ শতাংশ (১১টি ঘটনা) ছিল সরাসরি হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনের, যার শিকার হন ১৩ জন সাংবাদিক। অন্যদিকে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের ৬টি ঘটনায় (১৯.৩৫ শতাংশ) ৮ জন সংবাদকর্মী মারাত্মক আইনি জটিলতায় পড়েছেন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক সরাসরি গ্রেপ্তার ও বেআইনি আটকের দুটিটি ঘটনায় (৬.৪৫ শতাংশ) দুই জন সাংবাদিক আক্রান্ত হন।
রক্তাক্ত ১১ সাংবাদিক, বাসস্থানে গুলি ও তাণ্ডব:
পরিসংখ্যান অনুযায়ী শারীরিক আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে পাঁচটি (১৬.১৩ শতাংশ), তবে এর ধ্বংসাত্মক মাত্রা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এককভাবে এই পাঁটটি হামলায় সর্বোচ্চ সংখ্যক অর্থাৎ ১১ জন সাংবাদিক (২৫.৫৮ শতাংশ) সরাসরি রক্তাক্ত ও গুরুতর জখমের শিকার হন। এদিকে পেশাগত জায়গার গণ্ডি পেরিয়ে সহিংসতা পৌঁছে গেছে সাংবাদিকদের বসতবাড়িতেও। সেপ্টেম্বর মাসে এক জন সাংবাদিকের বাসভবন লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়, এক জনের বাড়িতে গভীর রাতে সাজানো প্রশাসনিক অভিযান ও হয়রানি চালানো হয় এবং অন্য এক জনের বাসস্থানে তাণ্ডব ও ভাঙচুর চালানো হয়।
আমলাতন্ত্র, মাফিয়া ও মব হামলায় আক্রান্ত ২৫ জন:
আক্রমণকারীদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, অরাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রগুলোতে সহিংসতার তীব্রতা ছিল বেশি। মোট ৩১টি ঘটনার মধ্যে ১৬টিতে (৫১.৬১ শতাংশ) কোনো রাজনৈতিক দলের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না, কিন্তু এসব ঘটনায় আক্রান্ত সাংবাদিকের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ—২৫ জন (৫৮.১৪ শতাংশ)। এর পেছনে কাজ করেছে জবাবদিহিহীন স্থানীয় আমলাতন্ত্র, পুলিশের একক স্বেচ্ছাচারিতা, সংগঠিত মাদক মাফিয়া ও অনিয়ন্ত্রিত মব। বিপরীতে, ১৫টি রাজনৈতিক সহিংসতায় (৪৮.৩৯ শতাংশ) দলীয় ক্যাডারদের হামলায় আক্রান্ত হন ১৮ জন সাংবাদিক (৪১.৮৬ শতাংশ)।
প্রশাসনিক প্রতিশোধ ও রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র:
দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনায় ক্ষমতার অপব্যবহার উন্মোচিত হয়েছে। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক সাংবাদিককে প্রকাশ্যে ‘গুম করে দেওয়ার’ হুমকি এবং গভীর রাতে বাড়িতে সাজানো মাদক অভিযান চালানো হয়। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে সড়ক নির্মাণের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন করায় স্থানীয় এমপির ভাই, ছেলে ও দলীয় ক্যাডাররা মিলে এক সাংবাদিককে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম করে। বিমানবন্দর এলাকায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের ভিডিও করায় ছাত্রদল নেতা কর্তৃক সাংবাদিক লাঞ্ছিত হন এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক চক্রের হামলায় আহত হন তিন সংবাদকর্মী।
নারী সাংবাদিকদের অবমাননা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের আত্মাহুতি:
সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত ৪৩ জনের মধ্যে ৪২ জন পুরুষ (৯৭.৬৭ শতাংশ) এবং এক জন নারী (২.৩৩ শতাংশ)। সংখ্যায় কম হলেও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে নারীদের জন্য কাজের পরিবেশ কতটা অবমাননাকর, তা স্পষ্ট হয় পল্টনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংবাদ সম্মেলনে। সেখানে ‘পর্দা না করার’ অজুহাতে দৈনিক টাইমস টুডের নারী প্রতিনিধিকে সামনের আসন থেকে উঠে পেছনে যেতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে, গণমাধ্যম হাউসের ভেতরে বকেয়া বেতন না পাওয়া ও চরম অর্থনৈতিক অনটনের শিকার হয়ে বরিশালে দৈনিক সমকালের ব্যুরো প্রধানের নিজ কার্যালয়ে আত্মহত্যার ঘটনা প্রাতিষ্ঠানিক শোষণকে উন্মোচিত করে।
টার্গেট শীর্ষ গণমাধ্যম, সাইবার হামলা ও আন্তর্জাতিক চাপ:
সেপ্টেম্বর মাসে অন্তত পাঁচটি শীর্ষ গণমাধ্যম পৃথক দুটি করে আক্রমণের শিকার হয়েছে—দৈনিক কালবেলা, ঢাকা স্ট্রিম, দৈনিক সমকাল, স্টার নিউজ এবং দৈনিক আমার সংবাদ। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বইমেলায় ‘নিষিদ্ধ সাহিত্য’ বিক্রির সংবাদ প্রকাশ করায় অনুসন্ধানী পোর্টাল ‘ঢাকা স্ট্রিম’-কে ১২ ঘণ্টার মধ্যে সাইবার হামলা চালিয়ে ওয়েবসাইট উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়া যমুনা টেলিভিশনের সম্প্রচার যানে ভাঙচুর চালানো হয় এবং মালয়েশিয়া বিএনপি সভাপতির নামের পূর্বে ‘ইঞ্জিনিয়ার’ ও ‘সভাপতি’ ব্যবহার না করায় আরটিভির বৈদেশিক প্রতিনিধির ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় আতঙ্ক ও সহিংসতা:
দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে চারটি পৃথক সহিংসতায় ৮ জন ক্যাম্পাস সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ডিআইইউ) মাদকের বিস্তার নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করায় তিন শিক্ষার্থী-সাংবাদিককে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেয় ক্যাম্পাস মাদক সিন্ডিকেট। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ডিকেট নির্বাচনের খবর প্রকাশের জেরে এক শিক্ষিকা কর্তৃক সাংবাদিককে রাজনৈতিক ট্যাগিং ও খবর সরানোর চাপ দেওয়া হয়। এছাড়া ছাতকের গোবিন্দগঞ্জ কলেজে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘাতের সময় তথ্য-প্রমাণ ধ্বংস করতে শিবিরের হামলায় তিন জন এবং তিতুমীর কলেজে এক জন শিক্ষার্থী-সাংবাদিক আহত হন।
ভৌগোলিক ঝুঁকির চিত্র্য:
দেশের ১৫টি জেলায় সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন নথিভুক্ত করা হয়েছে। একক শহর হিসেবে রাজধানী ঢাকায় সর্বোচ্চ ১৫টি ঘটনায় (৪৮.৩৯ শতাংশ) ২২ জন সাংবাদিক (৫১.১৬ শতাংশ) আক্রান্ত হয়েছেন, যা মূলত রাজপথের সংঘাত, হকার মব ও সশস্ত্র অপরাধী চক্র থেকে উদ্ভূত। তবে ঢাকার বাইরে ১৪টি জেলায় ১৬টি ঘটনায় ২১ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হলেও সেখানকার ঝুঁকি ছিল আরো ভয়াবহ। মফস্বলে সাংবাদিকরা স্থানীয় এমপি, ইউপি চেয়ারম্যান, থানার ওসি এবং ইউএনও-দের সরাসরি আইনি, প্রশাসনিক ও শারীরিক প্রতিশোধের মুখোমুখি হচ্ছেন।
এসব বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এক বিবৃতিতে জানান, ‘সংবাদ সংগ্রহ, প্রশাসনিক দুর্নীতি উন্মোচন এবং ভিডিও ধারণের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, পেশাগত কাজে বাধা, গভীর রাতে আবাসে সাজানো অভিযান এবং গুমের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের প্রতি এ জাতীয় হুমকি ও আইনি নিপীড়ন স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার শামিল। আমরা আহত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিধান এবং ঘটনার সাথে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক আইনি পদক্ষেপের জোর দাবি জানাচ্ছি।’
মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে এক মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষক নূর খান লিটন বলেছেন, ‘ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকদের কাজের নিরাপত্তায় কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। রাজনৈতিক ক্যাডার থেকে শুরু করে স্থানীয় আমলাতন্ত্র বা মাফিয়া চক্র—সবাই ভাবছে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়ে পার পাওয়া সম্ভব। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মূলত হামলাকারীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। অবিলম্বে প্রতিটি হামলার নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’