ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য

কালাজ্বর নির্মূলের লড়াইয়ে এলো নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৪ সকাল

Link Copied!

বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া উপেক্ষিত রোগ ‘কালাজ্বর’ (ভিসারাল লিশম্যানিয়াসিস) এবং এর পরবর্তী চর্মরোগ জটিলতা ‘পিকেডিএল’ -এর চিকিৎসায় এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

সম্প্রতি প্রকাশিত নতুন এই নির্দেশিকা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রচলিত কষ্টদায়ক, বিষাক্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি ইনজেকশনভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির অবসান ঘটিয়ে এবার আরও নিরাপদ, সংক্ষিপ্ত এবং রোগী-বান্ধব পদ্ধতির অনুমোদন দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বিশেষ করে পূর্ব আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে কালাজ্বরের প্রকোপ মোকাবিলা এবং রোগটি চিরতরে নির্মূলের লড়াইয়ে এই নতুন গাইডলাইন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

কালাজ্বর নীরব কিন্তু প্রাণঘাতী হুমকি :

হিন্দি শব্দ ‘কালাজ্বর’ মূলত একটি মারাত্মক পরজীবীজনিত সংক্রমণ, যা সংক্রামিত বালুমাছির (স্যান্ডফ্লাই) কামড়ে ছড়ায়। ম্যালেরিয়ার পর কালাজ্বর হলো বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী পরজীবী সংক্রমণ।

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ জ্বর, মারাত্মক ওজন হ্রাস, রক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া), এবং যকৃৎ ও প্লীহা অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যায়। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে এই রোগ নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

অন্যদিকে, কালাজ্বর থেকে সেরে ওঠার পর অনেকের ত্বকে এক ধরণের জটিল চর্মরোগ (ফুসকুড়ি) দেখা দেয়, যাকে বলা হয় ‘পোস্ট-কালা-আজর ডার্মাল লিশম্যানিয়াসিস’ (পিকেডিএল)। যদিও এই চর্মরোগটি সরাসরি জীবনঘাতী নয়, তবে এটি অত্যন্ত কলঙ্কজনক ও সামাজিকভাবে বয়কটের শিকার হওয়ার মতো একটি ব্যাধি।

রোগমুক্তির চেয়েও কষ্টদায়ক ছিল চিকিৎসা :

আফ্রিকা ও এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দশকের পর দশক ধরে কালাজ্বরের চিকিৎসায় সোডিয়াম স্টিবোগ্লুকোনেট নামের একটি অত্যন্ত বিষাক্ত ইনজেকশন ব্যবহার করা হতো। এই পুরোনো চিকিৎসা পদ্ধতিটি রোগীদের জন্য এতটাই বেদনাদায়ক ও কষ্টকর ছিল যে, অনেক সময় মনে হতো—রোগের যন্ত্রণা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্বয়ং রোগটির চেয়েও বেশি ভয়ংকর। দীর্ঘ দিন ধরে প্রতিদিন অসহ্য ব্যথা সহ্য করে এই ইনজেকশন নিতে হতো এবং এর কারণে নানা ধরনের মারাত্মক অঙ্গহানি বা বিষাক্ততার ঝুঁকি তৈরি হতো।

পূর্ব আফ্রিকায় ক্রনিক পিকেডিএল রোগীদের ৩০ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত এই বিষাক্ত ইনজেকশন বা দীর্ঘ ২০ দিন ধরে লিপোসোমাল অ্যাম্ফোটেরিসিন বি নিতে হতো। অন্যদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিলটেফোসিনের ১২ সপ্তাহের একটি দীর্ঘ কোর্স বাধ্যতামূলক ছিল।

নতুন নির্দেশিকায় ইনজেকশন ও হাসপাতালে থাকার সময় হ্রাস :

নতুন নির্দেশিকায় পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে ভিসারাল লিশম্যানিয়াসিস এবং পিকেডিএল-এর চিকিৎসায় প্রথমবারের মতো এসএসজি-মুক্ত কম্বিনেশন থেরাপির সুপারিশ করা হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। এই নতুন প্রস্তাবিত কম্বিনেশন থেরাপিটি ৯০ শতাংশের বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

পূর্বে যেখানে ৩৪টি ইনজেকশন নিতে হতো, নতুন নিয়মে তা কমিয়ে মাত্র ১৪টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া পিকেডিএল রোগীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ ৬০ থেকে ৯০ দিন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি থাকার প্রয়োজন হলেও নতুন চিকিৎসায় তা মাত্র ১৪ দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিবর্তন :

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে, যেখানে বিশ্বের বিশাল সংখ্যক কালাজ্বরের রোগী রয়েছে, সেখানে পিকেডিএল এবং রিল্যাপস বা পুনরায় রোগ ফিরে আসার চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। পূর্বে ১২ সপ্তাহ ধরে মিলটেফোসিন খাওয়ার দীর্ঘ নিয়ম থাকলেও নতুন গাইডলাইনে ‘লিপোসোমাল অ্যাম্ফোটেরিসিন বি’ ইনফিউশন একা অথবা মুখে খাওয়ার মিলটেফোসিনের সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত ও সময়সীমাবদ্ধ কম্বিনেশন থেরাপির সুপারিশ করা হয়েছে।

এটি রোগীদের বিষাক্ততার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে এবং খুব দ্রুত সুস্থ করে তোলে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য রিল্যাপস হওয়া রোগীদের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার গাইডলাইন যুক্ত করা হয়েছে।

মিলটেফোসিনের নতুন সুরক্ষা প্রোটোকল :

মিলটেফোসিনের কার্যকারিতা বাড়াতে এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অ্যাডভাইজরি কমিটি অন দ্য সেফটি অব মেডিসিনাল প্রোডাক্টস-এর সুপারিশগুলো নতুন গাইডলাইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

রোগীর ওজনের ওপর ভিত্তি করে সঠিক পরিমাণে মিলটেফোসিন ব্যবহারের নতুন অলমেট্রিক ডোজিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি মিলটেফোসিনের ব্যবহারজনিত চোখের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো এড়ানোর জন্য কঠোর ঝুঁকি-প্রশমিতকরণ ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। ভ্রূণের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে সন্তান ধারণক্ষম বয়সের নারীদের চিকিৎসার আগে নেগেটিভ প্রেগন্যান্সি টেস্ট এবং কার্যকর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি মেনে চলার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

নির্মূলের পথে নতুন আশার আলো :

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস বিভাগের পরিচালক ড. ড্যানিয়েল এনগামিজ মাদান্দি এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, ‘দীর্ঘকাল ধরে কালাজ্বরে আক্রান্ত রোগীরা এমন সব চিকিৎসা সহ্য করে আসছেন যা রোগটির মতোই শাস্তিড়ায়ক ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই নতুন নির্দেশিকা সেই অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন মোড় নিয়েছে।’

অলাভজনক মেডিকেল গবেষণা সংস্থা ‘ডিএনডিআই’-এর লিশম্যানিয়াসিস ক্লাস্টার ডিরেক্টর ড. ফাবিয়ানা আলভেস সন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, অংশীদারদের সহযোগিতায় তৈরি এই রোগী-বান্ধব চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি পাওয়ায় রোগ নির্মূলের লক্ষ্য এখন অনেকটাই সহজ হবে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ কেবল কালাজ্বর ও পিকেডিএলের মতো মারাত্মক ও উপেক্ষিত রোগের করুণ চিত্রকেই বদলাবে না, বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মুখে ফিরিয়ে দেবে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি ও আশার আলো।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

যে রক্তাক্ত আন্দোলন থেকে ‘মহান শিক্ষা দিবসের’ জন্ম

সন্ধ্যার মধ্যে চার অঞ্চলে ঝড়ের আভাস

রাজধানীতে গোপন গোডাউনে মিলল ৩ লাখ ১৬ হাজার বিদেশি সিগারেট

১৯ সেপ্টেম্বর বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের সম্ভাবনা, বাড়তে পারে বৃষ্টি

টিসিবির জন্য ১০ হাজার টন মসুর ডাল কিনবে সরকার

স্বর্ণের দাম আরও কমবে, নাকি আবারও বাড়বে?

অক্টোবরে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলতে পারে মহানগর এক্সপ্রেস

নতুন নিকোটিন পণ্যে তরুণদের আকৃষ্ট করছে কোম্পানিগুলো, নিষিদ্ধের দাবি

হাতিয়ায় দুর্যোগ মোকাবিলায় ৩০ স্বেচ্ছাসেবকের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ

ডেঙ্গুতে আরও ৭ জনের মৃত্যু

রাজশাহীতে অনুমোদনহীন পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা

হামের উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু