ঢাকাসোমবার , ২ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

যেসব ভুল স্বাস্থ্য ধারণা উপকারের বদলে ক্ষতি করছে

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৮ সকাল

Link Copied!

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং শরীরচর্চা নিয়ে এমন অনেক ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যেগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। পরিবার বা বন্ধুদের মুখ থেকে শোনা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড দেখে আমরা অনেক সময় এগুলো অন্ধের মতো বিশ্বাস করি। কিন্তু স্বাস্থ্য বিষয়ক পোর্টাল ‘হেল্পলাইন’-এর প্রতিবেদনে প্রকাশিত চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আধুনিক গবেষণার তথ্য বলছে, এর অনেকগুলোর সঙ্গেই বাস্তবতার কোনো মিল নেই। বরং ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে এসব নিয়ম মেনে চলতে গিয়ে অনেকেই উপকারের পরিবর্তে নিজেদের শারীরিক ক্ষতি ডেকে আনছেন। এই বিশেষ প্রতিবেদনে সমাজ ও সংস্কৃতিতে শেকড় গেড়ে বসা এমন কিছু প্রচলিত স্বাস্থ্যগত মিথ এবং তার পেছনের আসল সত্যতা তুলে ধরা হচ্ছে।

দৈনিক ৮ গ্লাস পানি পানের ধারণা :
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে শুরু করে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত জবরদস্তি করে পানি পানের অভ্যাস অনেকেরই আছে। বহুকাল ধরে চলে আসা এই ধারণার মূল কথা হলো সুস্থ থাকতে হলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট করে অন্তত ৮ গ্লাস বা দুই লিটার পানি খেতেই হবে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের শরীরের পানির চাহিদা সবার জন্য এক বা নির্দিষ্ট নয়। এটি নির্ভর করে ব্যক্তির শারীরিক গঠন, আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস এবং দৈহিক পরিশ্রমের ওপর। আমাদের প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকা শাকসবজি, ফলমূল এবং ঝোলজাতীয় খাবার থেকেও শরীর প্রচুর পরিমাণে পানি পেয়ে থাকে। তাই ঘড়ি ধরে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি গিলতে হবে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক বাধ্যবাধকতা নেই। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, যখনই গলা শুকিয়ে যাবে বা তৃষ্ণা পাবে, কেবল তখনই পরিমিত পানি পান করা উচিত।

কার্বোহাইড্রেট (শর্করা) কি শরীরের একমাত্র শত্রু? :
ওজন কমানোর কথা উঠলেই সবার আগে খাদ্যতালিকা থেকে ভাত, রুটি বা শর্করা জাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। অনেকের ধারণা, কার্বোহাইড্রেট মানেই শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়া এবং দ্রুত ওজন বৃদ্ধি পাওয়া। তবে পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। মানবদেহের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং মস্তিষ্কের জ্বালানি হিসেবে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। সমস্যা আসলে শর্করা নিজে নয়, বরং প্রক্রিয়াজাত বা রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট (যেমন- সাদা ময়দা, রিফাইন্ড চিনি এবং ফাস্টফুড), যা শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর বিপরীতে ঢেঁকি ছাঁটা চালের ভাত, লাল আটা, ওটস, ফলমূল এবং বিভিন্ন শাকসবজির মতো জটিল বা কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট শরীরের দীর্ঘস্থায়ী শক্তি জোগান দেয় এবং ফাইবার বা আঁশের চাহিদা পূরণ করে।

বেশি ঘাম ঝরলেই কি শরীরের চর্বি কমে? :
জিমে গিয়ে ঘাম ঝরানোর সময় অনেকেরই ধারণা থাকে শরীর থেকে যত বেশি ঘাম বের হবে, মেদ বা চর্বি বুঝি তত দ্রুত গলবে। কিন্তু ফিটনেস বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘাম ঝরা আর শরীরের চর্বি কমা সম্পূর্ণ দুটি আলাদা বিষয়। ঘাম হলো মূলত আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম (তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম)। অতিরিক্ত গরমে বা ভারী ব্যায়ামের সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বেড়ে গেলে শরীর ঘামের মাধ্যমে তা স্বাভাবিক করে। ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে মূলত অতিরিক্ত পানি ও লবণ বের হয়ে যায়, যা মেদ গলার কোনো নিশ্চিত মাপকাঠি নয়। ওজন বা মেদ কমাতে হলে ক্যালোরি ডেফিসিটের (সুষম খাদ্যাভ্যাস) পাশাপাশি নিয়মিত দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

প্রাকৃতিক বা ভেষজ মানেই কি শতভাগ নিরাপদ? :
বাজারে ভেষজ বা প্রাকৃতিক উপাদান সম্বলিত নানা ধরনের সাপ্লিমেন্ট বা ঘরোয়া টোটকার প্রচলন রয়েছে। মানুষের সাধারণ একটি মানসিকতা হলো, যেহেতু উপাদানটি প্রাকৃতিক, তাই এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ঝুঁকি থাকতে পারে না। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, এই ধারণাও সম্পূর্ণ ভুল। প্রকৃতিতে এমন বহু বিষাক্ত উপাদান রয়েছে যা মারাত্মক প্রাণঘাতী হতে পারে। ভেষজ বা হারবাল প্রোডাক্টগুলো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করলে তা অনেক সময় অন্যান্য জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটিয়ে কিডনি বা লিভারের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। কোনো ধরনের ভিটামিন বা ভেষজ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ডিটেক্স ডায়েট কি শরীর থেকে টক্সিন দূর করতে পারে? :
সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই প্রায়ই ডিটেক্স জুস বা দামি কিছু পানীয়র বিজ্ঞাপন দেখা যায়, যেখানে দাবি করা হয় এগুলো খাওয়ার মাধ্যমে শরীর থেকে সমস্ত ক্ষতিকর টক্সিন বা বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার হয়ে যায়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এই ধারণাকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে। আমাদের শরীর নিজেই একটি অত্যন্ত নিখুঁত ও প্রাকৃতিক ডিপ্রোসেসিং বা ডিটক্সিফিকেশন সিস্টেমের ওপর কাজ করে, যার মূল চালিকাশক্তি হলো আমাদের লিভার ও কিডনি। সুস্থ জীবনযাপন এবং পর্যাপ্ত পানি পানের মাধ্যমেই এই অঙ্গগুলো প্রাকৃতিকভাবে শরীর থেকে সমস্ত ক্ষতিকর উপাদান ছেঁকে বের করে দেয়। এর জন্য কোনো বিশেষ জুস বা ব্যয়বহুল ডিটক্স ডায়েটের প্রয়োজন হয় না।

ঠান্ডা আবহাওয়া কি সর্দি-কাশির মূল কারণ? :
শীতকালে বা ঠান্ডা বাতাসে ভিজলে বা কড়া শীত পড়লেই মানুষ সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়—এই দৃশ্য খুবই পরিচিত। কিন্তু আবহাওয়ার এই ঠান্ডার সঙ্গে সর্দি লাগার কোনো প্রত্যক্ষ বৈজ্ঞানিক সংযোগ নেই। সর্দি, কাশি কিংবা ফ্লু পুরোপুরিভাবে এক ধরনের ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। তবে শীতকালে মানুষ সাধারণত ঘরের ভেতরে গাদাগাদি করে একসঙ্গে বেশি সময় কাটায়, যার ফলে একজনের শরীর থেকে খুব সহজেই বাতাসে ভর করে ভাইরাস অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ, তাপমাত্রা নিজে রোগ সৃষ্টি করে না, বরং ভাইরাসজনিত সংক্রমণের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, যেকোনো স্বাস্থ্য পরামর্শ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই তা অন্ধের মতো বিশ্বাস না করে বরং বৈজ্ঞানিক তথ্য ও চিকিৎসকদের মতামত যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। সচেতনতা এবং সঠিক জ্ঞানই পারে আমাদের একটি দীর্ঘমেয়াদী সুস্থ ও সুন্দর জীবন উপহার দিতে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা