ঢাকাসোমবার , ২ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

কিলার রোবট নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘে একজোট ৭৬ দেশ, পরাশক্তিদের বাধা

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৮ বিকাল

Link Copied!

মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শত্রু চিহ্নিত করা ও প্রাণঘাতী হামলা চালানো ‘কিলার রোবট’ বা স্বায়ত্তশাসিত মারণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী বাধ্যবাধকতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়নের দাবি জোরালো হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের কনভেনশন অন কনভেনশনাল ওয়েপনস (সিসিডব্লিউ)-এর টানা তিন বছরের বৈঠক শেষে রেকর্ড সংখ্যক দেশ এই বিপজ্জনক প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করার পক্ষে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) অভিযোগ করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সামরিক স্বার্থ এবং তীব্র আপত্তির কারণে সম্মেলনের চূড়ান্ত খসড়া থেকে একাধিক স্পর্শকাতর বিষয় বাদ দিয়ে তা অনেকটাই দুর্বল করে ফেলা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউ-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৬টি দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত কিলার রোবট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ অথবা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন আইনি চুক্তি প্রণয়নের পক্ষে সরাসরি সমর্থন জানিয়েছে। এই জোরালো সমর্থনের প্রথম সারিতে রয়েছে- আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ডের মতো ইউরোপীয় দেশ এবং লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকোর মতো রাষ্ট্রগুলো।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও নেপাল এবং আফ্রিকা অঞ্চলের দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া ও মিসর এই চুক্তির পক্ষে একজোট হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ইতিমধ্যেই এআই প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয় ড্রোন ও অ্যালগরিদমভিত্তিক মারণাস্ত্রের ব্যবহারের তথ্য উঠে আসায় পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্ক এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জায়গায় মানুষের নিয়ন্ত্রণ বাদ দিয়ে কেবল যন্ত্রের হিসাব-নিকাশের ওপর প্রাণঘাতী হামলার অনুমতি দেওয়া নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

সংকটের গভীরতা ও যুদ্ধক্ষেত্রে মারণাস্ত্রের ব্যবহার :

কিলার রোবট বা স্বায়ত্তশাসিত অস্ত্রব্যবস্থা বলতে মূলত এমন প্রযুক্তিকে বোঝায়, যেখানে ড্রোন, সাঁজোয়া যান বা সেন্সরচালিত স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদমকে যুদ্ধক্ষেত্রে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই প্রযুক্তি মানুষের প্রত্যক্ষ সহায়তা ছাড়াই লক্ষ্যবস্তু স্ক্যান করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হামলা চালাতে সক্ষম।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে এই এআই অ্যালগরিদম কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সামরিক ক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন দেশ তা দ্রুত নিজস্ব অস্ত্রাগারে যুক্ত করছে। মানুষের প্রতিক্রিয়া জানানোর স্বাভাবিক সময়ের আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা থাকায় যুদ্ধক্ষেত্রে মানবীয় বিবেচনা বা মানবিক অনুভূতির কোনো স্থান এতে অবশিষ্ট থাকে না।

পরাশক্তিদের কৌশলগত বাধা :

জেনেভায় জাতিসংঘের নিরাশত্রীকরণ সংক্রান্ত বিষয়ের আলোচনা টানা তিন বছর ধরে চলার পর খসড়া প্রতিবেদন তৈরি হয়। তবে ওয়াশিংটন ও মস্কোর পাশাপাশি চীন, ভারত ও তুরস্কের মতো শক্তিশালী সামরিক দেশগুলো এই প্রযুক্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা কিংবা কঠোরভাবে সীমিত করার প্রস্তাবের মূল বিরোধী হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তাদের দাবি, আধুনিক সামরিক খাতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ব্যবহার প্রতিপক্ষের হামলা প্রতিরোধে এবং নিজেদের সৈন্যদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সামরিক পরাশক্তিগুলোর এই দ্বিমতের কারণে জেনেভায় প্রস্তুতকৃত খসড়া চুক্তি থেকে মূল বেশ কিছু বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তির নকশা প্রণয়ন, সামরিক ব্যবহারে অ্যালগরিদমের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই এবং যন্ত্রের ওপর মানবিক ও নৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাধ্যতামূলক ধারাগুলো চূড়ান্ত খসড়া থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এইচআরডব্লিউ-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, খসড়ার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও পরিভাষা দুর্বল করে দেওয়ায় চূড়ান্ত নথিটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

আইনি জবাবদিহিতা ও মানবিক ঝুঁকি :

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, জীবন ও মৃত্যুর মতো স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত কোনো যান্ত্রিক অ্যালগরিদমের হাতে ছেড়ে দেওয়া মানব সভ্যতার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। অ্যালগরিদম কখনো যুদ্ধের ময়দানে বেসামরিক নাগরিক ও সশস্ত্র যোদ্ধাদের পার্থক্য করার সূক্ষ্ম মানবিক অনুভূতি প্রয়োগ করতে পারে না।

সবচেয়ে বড় সংকট দাঁড়িয়েছে আইনি জবাবদিহিতার জায়গায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল হিসাব-নিকাশের কারণে যদি কোনো নির্দোষ সাধারণ নাগরিকের প্রাণহানি ঘটে, তবে তার দায়ভার কে নেবে—অস্ত্র তৈরি করা প্রতিষ্ঠান, সফটওয়্যার ডেভেলপার নাকি সামরিক বাহিনী? কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো না থাকায় এই দায়বদ্ধতার জায়গাটি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, যা বিশ্বকে এক অনিয়ন্ত্রিত মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দেবে।

ভবিষ্যৎ পথরেখা :

জেনেভা সম্মেলনের এই প্রাথমিক অগ্রগতিকে ভিত্তি করে বিশ্বজুড়ে কিলার রোবটের বিস্তার থামাতে আন্তর্জাতিক মহল আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য সিসিডব্লিউ রিভিউ কনফারেন্সের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, সামরিক পরাশক্তিগুলোর ভেটো বা বাধাকে উপেক্ষা করে বৈশ্বিক সম্মেলনে একটি স্বাধীন চুক্তি প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। অস্ত্রশিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বিপজ্জনক দৌড় সম্পূর্ণ বন্ধ করতে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিলার রোবট বিরোধী একটি কঠোর ও সর্বজনীন আইনি চুক্তি স্বাক্ষর এখন সময়ের দাবি।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা