
জলবায়ু পরিবর্তনের গতি এতটাই বেড়ে গেছে যে কৃষকেরা তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাপ খাইয়ে নিতে পারছেন না। ইউরোপজুড়ে রেকর্ড তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানলের কারণে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকদের ভাষায়, জলবায়ু সংকট এখন তাদের জন্য একটি নিরন্তর সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
নরফোকের কৃষক টিম ইয়ং বলেন, ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি ও তাঁর পরিবার খামারে বৃষ্টিপাতের হিসাব রাখছেন। সেই তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরগুলোর তুলনায় গত ছয় বছরে মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ বৃষ্টি হয়েছে। জলের এই ঘাটতি এখন তাঁর কৃষি ব্যবসার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
এই গ্রীষ্মে জলবায়ুজনিত রেকর্ড-ভাঙা তাপপ্রবাহ ইউরোপের বেশিরভাগ অংশকে পুড়িয়ে দিয়েছে। খরা ও “প্রলয়ঙ্করী” দাবানল একসঙ্গে কৃষিকাজকে কার্যত অসম্ভব করে তুলেছে। ফ্রান্স এমন দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে, যাকে দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, পরিবেশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ইংল্যান্ডের অর্ধেক অঞ্চলকে আনুষ্ঠানিকভাবে খরা কবলিত ঘোষণা করা হয়েছে। শীতকালীন বন্যার পর এবার জুলাই মাসটি রেকর্ড পরিমাণ শুষ্কতম হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফ্রান্সের ডরডোন অঞ্চলের জৈব চাষি উয়েন ডো বলেন, “আঙুরলতাগুলো মরে যাচ্ছে। ঘাস হলুদ হয়ে গেছে, আর এখন আমরা ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি।” প্রায় কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, “অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকাই কঠিন ছিল, আর এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এটি এমন এক সংগ্রামে পরিণত হয়েছে, যা আমরা সামলে উঠতে পারব কি না, তা নিশ্চিত নই।”
ডো ২০১৮ সালে খামারের দায়িত্ব নেওয়ার পর জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় জৈব চাষ শুরু করেন। তবে তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের গতি এত দ্রুত যে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খামারকে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, “পরিবর্তনটা খুব দ্রুত হচ্ছে। এর প্রভাব অনেক বড়।”
নরফোকের হকওল্ডে টিম ইয়ংয়ের খামারেও খরার কারণে এ বছর শস্যভাণ্ডারে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম শস্য জমা হয়েছে। গত বছর নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় পরিবেশ সংস্থা কাছের নদী থেকে পানি তোলার তাঁর লাইসেন্স স্থগিত করে দেয়, যা তাঁর খামারের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে তিনি নিয়মিত ফোনে আপডেট দেখছেন।
টিম ইয়ং বলেন, “জুলাই মাসে আমাদের মাত্র ০ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আমরা এই বার্তার ওপর এতটাই নির্ভরশীল।”
প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি বেশি থাকার সময় পানি সংরক্ষণের জন্য তিনি খামারে একটি জলাধার নির্মাণ করতে চান। কিন্তু নির্মাণ ব্যয় ও অনুমতির জটিলতা বড় বাধা হয়ে রয়েছে। সম্প্রতি তাঁকে অন্য এক কৃষকের কাছ থেকে বেশি দামে পানি কিনতে হয়েছে। তাই তাঁর মতে, জলাধার নির্মাণ এখন শুধু ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য নয়, ভবিষ্যতে পানি বিক্রির মাধ্যমে আয়ের উৎসও হতে পারে।
তবে খামারের জলাধারই একমাত্র সমাধান নয় বলে মনে করেন ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়নের উপ-সভাপতি পল টমকিন্স। তিনি বলেন, অনেক উদ্যানপালক আশঙ্কা করছেন, শীতকালে জলাধারে জমিয়ে রাখা পানি খুব শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে। যুক্তরাজ্যের অর্ধেক এলাকা এখন খরা কবলিত। নিয়ন্ত্রক সংস্থা সতর্ক করেছে, খরা আক্রান্ত এলাকাগুলোর খামারের নিজস্ব জলাধারগুলোতে আগস্টের মধ্যেই পানি ফুরিয়ে যেতে পারে।
জৈব কৃষি প্রতিষ্ঠান রিভারফোর্ডের সাপ্লাই চেইন ও টেকনিক্যাল ডিরেক্টর লিউক কিং বলেন, নিজেদের জলাধার না থাকলে তাঁদের পক্ষে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। তবে একটি ছাড়া তাঁদের সব জলাধারই এখন খালি হয়ে গেছে। তাই সঞ্চিত পানি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
তিনি জানান, “আমরা পলিটানেলে আর্দ্রতা সেন্সর এবং মাটির আর্দ্রতা মাপার প্রোব ব্যবহার করছি। এর মাধ্যমে মাটি কতটা শুকনো তা বুঝে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দিচ্ছি। এতে পানি সাশ্রয় হচ্ছে।”
খাদ্য প্রতিষ্ঠান পিপ অ্যান্ড নাটের জন্যও পানির সংকট বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা পিপা মারে বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু এলাকায় কৃষকেরা পানি সংকটের কারণে বাদাম চাষ বন্ধ করে দিয়েছেন, কারণ তা আর লাভজনক নয়। এসব “পরিত্যক্ত ফলের বাগান” প্রতিবছরই বাড়ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যালমন্ড বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে রাজ্যটিতে বাদাম চাষের মোট জমির পরিমাণ কমেছে।