
গ্রীষ্মের চতুর্থ তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হওয়ায় ইতালি উত্তরাঞ্চলের ত্রিয়েস্তে থেকে দক্ষিণের পালেরমো পর্যন্ত দেশের ২৭টি প্রধান শহরকে সর্বোচ্চ তাপ সতর্কতা বা রেড অ্যালার্ট-এর আওতায় আনছে। কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রেড অ্যালার্ট বা লাল সতর্কতার অর্থ হলো, দীর্ঘস্থায়ী চরম তাপমাত্রার কারণে সমগ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার ২৫টি শহর রেড অ্যালার্টের আওতায় ছিল। বৃহস্পতিবার আরও দুটি শহর যুক্ত হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তাপ নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় থাকা ২৭টি শহরই সর্বোচ্চ সতর্কতার আওতায় আসছে।
রেড অ্যালার্টের আওতায় থাকা শহরগুলো হলো- তুরিন, বোলজানো, মিলান, জেনোয়া, ভেনিস, ভেরোনা, ত্রিয়েস্তে, বোলোনিয়া, ফ্লোরেন্স, পেরুজা, রোম, নেপলস, আনকোনা, পেসকারা, বারি, কাম্পোবাসো, রেজ্জিও ক্যালাব্রিয়া, পালেরমো, কাগলিয়ারি, কাতানিয়া, মেসিনা, ব্রেসিয়া, ভিটেরবো, লাতিনা, রিয়েতি, ফ্রসিনোনে এবং সিভিতাভেকিয়া।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইতালির কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ জনগণকে সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সরাসরি সূর্যের আলো এড়িয়ে চলতে, সম্ভব হলে বাড়ির ভেতরে থাকতে এবং দিনে অন্তত ১ দশমিক ৫ লিটার পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি কোমল পানীয়, কফি, অ্যালকোহল ও ভারী খাবার এড়িয়ে চলা, হালকা পোশাক পরা এবং গাড়িতে শিশু বা পোষা প্রাণীকে একা রেখে না যাওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু সংকটের কারণে এই চরম তাপপ্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে এবং অন্তত এক সপ্তাহের মধ্যে এটি কমার কোনো পূর্বাভাস নেই। তারা বলছেন, ইউরোপ বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত উষ্ণ হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই তাপপ্রবাহে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন লোম্বার্ডি অঞ্চলের একটি শিল্প এলাকায় কর্মরত ১৯ বছর বয়সী এক টমেটো শ্রমিক এবং ৪০ বছর বয়সী এক কাঠমিস্ত্রি। এছাড়া ধারণা করা হচ্ছে, বোলোগনার এক নিরাপত্তাকর্মী নিজের গাড়িতে থাকাকালে তাপজনিত গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
শুষ্ক বসন্তের পর চলতি বছরের তাপপ্রবাহ ইতালির দীর্ঘতম নদী পো উপত্যকার খরাকে আরও তীব্র করেছে। পিডমন্ট ও লোম্বার্ডি অঞ্চলের ১০০টিরও বেশি শহর জল সরবরাহের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। কিছু শহরে পানীয় জলের চাহিদা পূরণে ট্যাঙ্কার ট্রাক ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই খরা ইতালির কৃষিখাতে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। কৃষকদের মতে, চরম তাপ ফসলের ফলনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কোথাও আঙুর দ্রুত পেকে যাচ্ছে, আবার তাপজনিত চাপে দুগ্ধবতী গাভী কম খাবার খাওয়ায় দুধ উৎপাদন ১০ শতাংশ কমে গেছে।
ত্রেন্তো বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় পদার্থবিজ্ঞানী লরেঞ্জো জিওভানিনি ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসাকে বলেছেন, চলতি গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহগুলো তীব্রতা ও স্থায়িত্বের দিক থেকে আগের বছরগুলোর তুলনায় ইতোমধ্যেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। তার ভাষায়, প্রতিটি তাপপ্রবাহ কখন ঘটবে তা আগে থেকে নির্ভুলভাবে অনুমান করা কঠিন হলেও জলবায়ু সংকট এগুলোকে “আরও দীর্ঘ ও তীব্র” করে তুলছে।
এদিকে, রোমের মতো প্রধান পর্যটন শহরগুলোতে তাপপ্রবাহের প্রভাব কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিনেমা হল ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সন্ধ্যায় পর্যটকদের সুবিধার জন্য কলোসিয়াম ও প্যান্থিয়নের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনার খোলার সময়ও বাড়ানো হয়েছে।