ঢাকাসোমবার , ২ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

বয়সজনিত দৃষ্টিশক্তি ফেরানোর চিকিৎসায় আসল নতুন সাফল্য

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
২৯ জুলাই ২০২৬, ১০:৫০ সকাল

Link Copied!

বয়সের কারণে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা মানুষের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বার্ধক্যজনিত চোখের মারাত্মক রোগ বা রেটিনার কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে দৃষ্টিশক্তি হারানো রোগীদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে সক্ষম একটি বিশেষ ‘আই ইমপ্লান্ট’ বা কৃত্রিম চোখের যন্ত্র ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই বৈপ্লবিক অগ্রগতির কথা জানানো হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ দৃষ্টিহীন মানুষের জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি বদলে দিতে সক্ষম।

মানবদেহের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতো চোখের ভেতরেও নানা ধরনের অবক্ষয় শুরু হয়। চোখের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হলো রেটিনা, যা ক্যামেরার ফিল্মের মতো কাজ করে। আমরা যা দেখি, তার আলোকরশ্মি রেটিনায় পড়ে এবং সেখান থেকে স্নায়ুর মাধ্যমে সেই বার্তা মস্তিষ্কে পৌঁছায়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রেটিনার ভেতরের কোষগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এর ফলে মানুষের দৃষ্টিশক্তি কমতে থাকে এবং একসময় তা সম্পূর্ণ অন্ধত্বে রূপ নিতে পারে।

বয়সজনিত দৃষ্টি হারানোর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো ‘ম্যাকুলার ডিজেনারেশন’ (এজ-রিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (এএমডি)। এই রোগে আক্রান্তরা সোজা রেখা বাঁকা দেখেন, পড়ার সময় অক্ষরের লেখা ঝাপসা মনে হয় এবং ধীরে ধীরে চোখের সামনে একটি অন্ধ দাগ তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত বেশি। এতদিন পর্যন্ত বয়সজনিত এই বিশেষ ধরনের অন্ধত্ব পুরোপুরি নিরাময়ের কোনো স্থায়ী চিকিৎসা ছিল না। রোগীরা যাতে অন্ধত্ব থেকে রক্ষা পেতে পারেন, সেজন্য কেবল ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট বা সীমিত কিছু থেরাপির ওপর নির্ভর করতে হতো। ফলে নতুন এই আই ইমপ্লান্টের অনুমোদন চিকিৎসকদের হাতে এক শক্তিশালী হাতিয়ার তুলে দিয়েছে।

নতুন অনুমোদিত এই আই ইমপ্লান্টটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রযুক্তির সাহায্যে চোখের ভেতরে স্থাপন করা হয়। এটি কোনো সাধারণ লেন্স নয়, বরং একটি উচ্চ প্রযুক্তির মাইক্রো-ইলেকট্রনিক ডিভাইস। যখন একজন রোগী এই ইমপ্লান্টটি গ্রহণ করেন, তখন এটি চোখের ভেতরে আলোর সংবেদনশীল কোষগুলোর বিকল্প হিসেবে কাজ শুরু করে। ইমপ্লান্টটি বাইরের পরিবেশ থেকে আসা আলোকরশ্মিকে গ্রহণ করে এবং তাকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে। এরপর এই বৈদ্যুতিক সংকেত চোখের অপটিক নার্ভের মাধ্যমে সরাসরি মস্তিষ্কে প্রেরিত হয়। মস্তিষ্ক তখন এই সংকেতগুলোকে বিশ্লেষণ করে এবং রোগী চারপাশের আলো, বস্তুর আকৃতি ও চলাচল স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারেন।

এই আই ইমপ্লান্টটি বাজারজাত করার আগে দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে গেছে। গবেষক দল বিভিন্ন বয়সের এমন সব রোগীদের ওপর এটি পরীক্ষা করে দেখেছেন, যারা ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ নিরাময় অযোগ্য অন্ধত্বের শিকার হয়েছিলেন। ট্রায়ালের ফলাফলে দেখা গেছে, ইমপ্লান্টটি গ্রহণ করার পর রোগীরা শুধু ঘরের ভেতর হাঁটাচলা করার ক্ষমতাই ফিরে পাননি, বরং তারা বড় হরফে লেখা পড়তে সক্ষম হয়েছেন এবং চারপাশের বিভিন্ন বস্তুর উপস্থিতি নিখুঁতভাবে বুঝতে পেরেছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এই যন্ত্রটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে না দিলেও, যারা পুরোপুরি অন্ধকার জগতে বাস করছিলেন, তাদের জন্য এটি এক বিরাট আশীর্বাদ। আলো এবং অন্ধকারের তফাত বুঝতে পারা, ঘরের আসবাবপত্র চিনে চলাফেরা করা এবং কাছের মানুষদের অবয়ব অনুধাবন করার মতো মৌলিক বিষয়গুলো এই ইমপ্লান্টের মাধ্যমে সম্ভব হচ্ছে। এটি রোগীদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং তাদের পরনির্ভরশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।

আধুনিক যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে রোবটিক সার্জারি, কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন এবং জিন থেরাপির মতো অবিশ্বাস্য সব আবিষ্কার সামনে আসছে। এর মধ্যে অন্ধত্ব নিরাময়ের ক্ষেত্রে বায়োনিক আই বা ইলেকট্রনিক ইমপ্লান্টের গবেষণা গত কয়েক দশক ধরে চলছে। বর্তমানের এই অনুমোদন প্রমাণ করে যে প্রযুক্তিটি এখন কেবল পরীক্ষাগারের গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বাস্তব জীবনে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

যেকোনো নতুন প্রযুক্তির মতো এই আই ইমপ্লান্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রথমত, এই ধরনের সার্জারি অত্যন্ত জটিল এবং এর জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত সার্জন ও অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ডিভাইসটির খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা একটি বড় বিষয়। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে, সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ঘটলে এর খরচ অনেকটাই কমে আসবে।

মানুষের জীবনে দৃষ্টিশক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। অন্ধত্ব কেবল শারীরিক অক্ষমতা নয়, এটি মানুষকে মানসিকভাবেও দুর্বল করে দেয়। নতুন এই আই ইমপ্লান্ট অনুমোদন পাওয়ার ফলে বার্ধক্যজনিত অন্ধত্বের শিকার মানুষেরা সেই অন্ধকার ভেদ করে ফের আলোর পৃথিবীতে ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই উৎকর্ষ প্রমাণ করে যে মানুষের অসাধ্য বলে কিছু নেই। আশা করা যায়, আগামী দিনে এই প্রযুক্তি আরও সহজলভ্য হবে এবং বিশ্বজুড়ে দৃষ্টিহীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবেন লাখ লাখ মানুষ।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা