ঢাকামঙ্গলবার , ৩ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশের রেংমিটচা ভাষা

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৩ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৪ সকাল

Link Copied!

বাংলাদেশের অন্যতম ক্ষুদ্র ও স্বতন্ত্র ভাষা রেংমিটচা এখন বিলুপ্তির একেবারে দ্বারপ্রান্তে। একসময় বান্দরবানের ম্রো জনগোষ্ঠীর অন্তত ছয়জন এই ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র দুইজনে। সম্প্রতি ভাষাটির অন্যতম বক্তা মাংওয়াই ম্রোর মৃত্যুর পর ভাষাটি টিকিয়ে রাখার আশঙ্কা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কয়েকটি পাড়ায় রেংমিটচা ভাষাভাষীদের বসবাস। গত ৫ মে ৬৬ বছর বয়সে মাংওয়াই ম্রোর মৃত্যু হয়। এরপর এখন তার দুই ভাই—মাংপুং ম্রো (৭৪) ও রেংপুং ম্রো (৭০)—রেংমিটচা ভাষার একমাত্র সাবলীল বক্তা হিসেবে জীবিত আছেন। তারা আবার একই পরিবারের সদস্য হলেও আলাদা পাড়ায় বসবাস করেন।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট নয়জন মানুষ কোনো না কোনোভাবে রেংমিটচা ভাষা জানেন। এর মধ্যে দুজন সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন, তিনজন ভাঙা-ভাঙাভাবে বলতে পারেন এবং চারজন ভাষাটি কিছুটা বুঝলেও স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন না। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, একটি ভাষা যখন নতুন প্রজন্মের কাছে আর পৌঁছায় না, তখন সেটি দ্রুত বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যায়। রেংমিটচা ভাষার ক্ষেত্রেও এখন সেই পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে।

আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজে রেংমিটচা ভাষা নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন গবেষক আফসানা ফেরদৌস। তাঁর মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা এখনো ভাষাটি জানেন, তারা পরিবারে রেংমিটচা নয়, ম্রো ভাষায় কথা বলেন। কারণ পরিবারের অন্য সদস্যরা রেংমিটচা বোঝেন না। ফলে শিশুদের কাছে ভাষাটি পৌঁছাচ্ছে না এবং পারিবারিক চর্চা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময় এবং পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে গুটিবসন্ত ও কলেরার ভয়াবহ মহামারিতে রেংমিটচা জনগোষ্ঠীর বড় অংশ মারা যায়। বনসুপাড়া, কুইকিপাড়া, রানিপাড়াসহ কয়েকটি রেংমিটচা গ্রাম প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। পরে জীবিকার প্রয়োজনে এবং নিরাপত্তার কারণে তারা ম্রো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। এতে ধীরে ধীরে রেংমিটচা ভাষার ব্যবহার কমতে থাকে।

পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকে পার্বত্য অঞ্চলের অস্থির পরিস্থিতির কারণে ছোট ছোট রেংমিটচা বসতিগুলোও বিলীন হয়ে যায়। বাসিন্দারা বড় ম্রো গ্রামগুলোতে চলে গেলে ভাষাটি আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। পরিবারের দৈনন্দিন কথোপকথন থেকে রেংমিটচা ভাষা হারিয়ে যাওয়ায় নতুন প্রজন্ম আর ভাষাটি শেখার সুযোগ পায়নি।

গবেষক আফসানা ফেরদৌস বলেন, এখনই উদ্যোগ না নিলে রেংমিটচা ভাষা চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। ভাষাটি সংরক্ষণে শিশু-কিশোরদের মাতৃভাষা শেখানো, ভাষার শব্দভান্ডার ও ব্যাকরণ লিপিবদ্ধ করা, নিজস্ব লিপি উদ্ভাবন এবং পারিবারিক পর্যায়ে ভাষার ব্যবহার পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিলুপ্তপ্রায় ভাষা পুনরুজ্জীবনের সফল উদাহরণ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু কিছু শব্দের বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীবনধারা ও পরিচয়। তাই রেংমিটচা ভাষা সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা