ঢাকারবিবার , ১২ জুলাই ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য
  3. লাইফস্টাইল

লাল চুলের শিশুর জিনে মিলল ভারতীয়দের গোপন রহস্য

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১২ জুলাই ২০২৬, ৮:২১ বিকাল

Link Copied!

ভারতবর্ষের বিশাল জনসংখ্যার মানুষের শারীরিক গঠনের বৈচিত্র্য দীর্ঘকাল ধরেই নৃতত্ত্ববিদ ও বিজ্ঞানীদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। গায়ের রঙের গাঢ়ত্ব কিংবা চুলের ধরনে যে বিশাল পার্থক্য আমরা চারপাশে দেখি, তার পেছনে ঠিক কোন জিনগুলো কাজ করছে, তা নিয়ে চলছিল দীর্ঘদিনের গবেষণা। সম্প্রতি হায়দ্রাবাদের সিএসআইআর-সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি (সিসিএমবি)-এর বিজ্ঞানীরা এমন এক জেনেটিক রহস্য উন্মোচন করেছেন, যা ভারতীয়দের জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে।

গবেষণার নেপথ্যে:
গবেষণার সূত্রপাত হয় দক্ষিণ ভারতের একটি গ্রামের পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে কেন্দ্র করে। ভারতে কালো বা বাদামী চুলের আধিক্যই স্বাভাবিক, সেখানে লাল চুলের অধিকারী কোনো শিশু সচরাচর দেখা যায় না। শিশুটির এই অস্বাভাবিক শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের প্রবল কৌতুহলের জন্ম দেয়। তারা শিশুটির ‘মেলানোকর্টিন ১ রিসেপ্টর’ (এমসি১আর) জিন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখেন, সেটির মধ্যে এক অতি দুর্লভ ‘মিউটেশন’ বা জিনের রূপান্তর ঘটেছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, শিশুটি তার বাবা ও মা উভয়ের কাছ থেকেই মিউটেটেড জিনের একটি করে কপি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। অথচ তার বাবা-মায়ের চুল কালো, কারণ তারা কেবল একটি কপি বহন করছেন, যা বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে যথেষ্ট নয়। সিসিএমবির বিখ্যাত জেনেটিসিস্ট কুমারাসামি থাঙ্গারাজ জানিয়েছেন, ইউরোপীয়দের লাল চুলের জন্য দায়ী এমসি১আর জিনের যে সংস্করণ, এই ভারতীয় শিশুটির জিনের মিউটেশনটি তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের শারীরিক বৈচিত্র্য কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের ধারায় সীমাবদ্ধ নয়।

বিশাল পরিসরে জেনেটিক স্ক্রিনিং:
এই একক আবিষ্কারের সূত্র ধরে থাঙ্গারাজের নেতৃত্বাধীন বিজ্ঞানী দল ভারতের ৯১টি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ১১ হাজার ২১ জন মানুষের ওপর এক বিশাল জেনেটিক পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং পরিচালনা করেন। এই গবেষণার লক্ষ্য ছিল ভারতীয়দের মধ্যে এমসি১আর জিনের ভিন্নতা খুঁজে বের করা। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর তারা ২১টি নতুন এবং অত্যন্ত বিরল জেনেটিক ভেরিয়েন্ট বা বৈচিত্র্য খুঁজে পান, যার মধ্যে ৯টি এমন ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে যা কেবল ভারতীয়দের শরীরেই বিদ্যমান।

ত্বকের ক্যান্সার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি:
গবেষণার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশটি ছিল স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, ভারতীয়দের মধ্যে পাওয়া ৯টি অনন্য ভেরিয়েন্টের মধ্যে ‘পি-অ্যালানিন-ফিফটি-সেভেন-থ্রিওনিন’ (p.Ala57Thr) এবং ‘পি-আইসোলিউসিন-ফোরটি-থ্রিওনিন’ (p.Ile40Thr) নামক মিউটেশনগুলো ম্যালিগন্যান্ট ত্বকের ক্যান্সার বা মেলানোমার ঝুঁকির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। এছাড়াও এই জিনগত পরিবর্তনের ফলে রোদে ত্বক যে স্বাভাবিক সুরক্ষা পায় (ফটোপ্রোটেকশন), তা হ্রাস পায় এবং কিছু বিশেষ ধরনের অ্যানেস্থেশিয়ার প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতাও পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই আবিষ্কারটি ক্যান্সার শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

লাদাখের বোধ জনগোষ্ঠী ও ফর্সা রঙের রহস্য:
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে ছিল ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লাদাখের ‘বোধ’ জনগোষ্ঠী। বিজ্ঞানীরা ‘আরএস-থ্রি-টু-ওয়ান-টু-থ্রি-সিক্স-থ্রি’ (rs3212363) নামক একটি জিন ভেরিয়েন্ট নিয়ে কাজ করেন, যা দক্ষিণ এশীয়দের গায়ের রঙ ফর্সা হওয়ার পেছনে দায়ী বলে এতদিন সন্দেহ করা হতো। লাদাখের ২৭৭ জন বাসিন্দার ওপর পরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেন যে, যাদের শরীরে এই নির্দিষ্ট জিনের রূপ (টি ভার্সন) রয়েছে, তাদের শরীরে মেলানিনের পরিমাণ অন্যদের তুলনায় গড়ে ৮.৫ ইউনিট কম। অর্থাৎ, এই জিনটিই তাদের ত্বককে প্রাকৃতিকভাবে ফর্সা করে তুলছে। দেশজুড়ে এই জিনটির উপস্থিতির হার যাচাই করে দেখা গেছে, এটি লাদাখে ৮৯ শতাংশ হলেও দক্ষিণ ভারতের কিছু আদিবাসী গোষ্ঠীতে মাত্র ৩৮ শতাংশ। এই পার্থক্য থেকেই বোঝা যায়, ভারতের অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ইতিহাস কতটা বৈচিত্র্যময়।

ইউরোপীয় মডেল বনাম ভারতীয় বাস্তবতা:
এতদিন সারা বিশ্বে জেনেটিক গবেষণাগুলো মূলত ইউরোপীয় জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু সিসিএমবির এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, ইউরোপীয়দের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা জেনেটিক তথ্য সব সময় এশীয় বা ভারতীয়দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। এমসি১আর জিনের ক্ষেত্রে ভারতীয়দের যে নতুন মিউটেশনগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছে। এটি আমাদের বোঝায় যে, পরিবেশ ও জীবনযাত্রার সাথে মানিয়ে নিতে বিবর্তনের পথ একেক অঞ্চলের মানুষের জন্য একেক রকম।

ভবিষ্যৎ গুরুত্ব:
পুনের সিম্বায়োসিস ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ত্বক ও রঞ্জক জিনতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ মঞ্জরী জোনাল্লাগাড্ডা এই গবেষণাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তার মতে, ক্যান্সার ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত এই জেনেটিক ভেরিয়েন্টগুলো কেবল নতুন তথ্য নয়, বরং এটি দুর্লভ রোগের উৎস সন্ধানে নতুন পথ দেখাবে। এটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে সেই ধারণার প্রতি যা বলে যে, পরিবেশগত চাপের (যেমন—অতিবেগুনি রশ্মি) বিপরীতে মানুষের অভিযোজন প্রক্রিয়া সর্বজনীন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই গবেষণা কেবল লাল চুলের শিশুর রহস্য নয়, বরং ভারতের সমৃদ্ধ ও জটিল নৃ-তাত্ত্বিক ইতিহাসকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। অভিবাসন, বিচ্ছিন্নতা এবং ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ফলে ভারত যে জেনেটিক বৈচিত্র্যের এক বিশাল আধার হয়ে উঠেছে, এই গবেষণা তারই সপক্ষে জোরালো যুক্তি। ভবিষ্যতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘পার্সোনালাইজড মেডিসিন’ বা ব্যক্তিগত জিনের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসার জন্য এই তথ্যভাণ্ডার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

২৪ ঘণ্টায় ঢাকা ও আশপাশে ৯৭ মিমি বৃষ্টি

চীনে সুপার টাইফুন বাভির তাণ্ডব, সরিয়ে নেওয়া হলো ২০ লাখ মানুষ

সন্ধ্যার মধ্যে ঢাকাসহ ১৭ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস

Exclusive Gifts Await with vivo Y500 pre-order

ভিভো ওয়াই৫০০-এর প্রি-অর্ডারে এক্সক্লুসিভ উপহার

সারা দেশে আরও পাঁচ দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস

টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ রাজধানী, নগরবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান

OPPO Teams Up with BD’s Own Messi, Jamal Bhuyan, to Support Bangladesh Football

বাংলাদেশের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে নিজস্ব ‘মেসি’ জামাল ভূঁইয়ার সাথে হাত মেলালো অপো

অতিরিক্ত কাঁঠালের বিচি খেলে হতে পারে যেসব সমস্যা

টানা বর্ষণে জলমগ্ন যাত্রাবাড়ী, দুর্ভোগে পথচারী-ব্যবসায়ীরা

টানা বৃষ্টি ও জোয়ারে ঝালকাঠিতে পানির নিচে আমনের বীজতলা, দুশ্চিন্তায় কৃষক