
আজ ৩১ মে, বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে প্রতি বছর আজকের দিনকে বিশেষভাবে পালন করা হয়। এবারে ২০২৬ সালে দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘Unmask the Appeal – Countering Nicotine and Tobacco Addiction’, যার বাংলা ভাবার্থ : ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি’।
সহজ কথায়, তামাক কোম্পানিগুলো আসক্তিকে পুঁজি করে যে মৃত্যুবাণিজ্য চালাচ্ছে, তার মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। তরুণ-কিশোর-কিশোরীদের তামাক কোম্পানির প্রলোভনমূলক প্রচার-প্রচারণা সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে। কারণ মানুষ যত কম বয়সে বিড়ি-সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যে আসক্ত হবে, ততই লাভবান হবে তামাক কোম্পানিগুলো। গড়ে ১৫ বছর বয়সে কেউ যদি সিগারেট সেবন শুরু করে, তাহলে সে প্রায় ৫০–৫৫ বছর ধরে সিগারেট সেবন করতে পারে। অর্থাৎ কোম্পানির জন্য প্রায় ৫০ বছরের একজন নিশ্চিত ক্রেতা তৈরি হয়ে যায়। যদি আরও কম বয়সে কাউকে আসক্ত করা যায়, তাহলে লাভ আরও বেশি হয়। এই কারণেই ছলে-বলে-কৌশলে সিগারেট এবং সাম্প্রতিক সময়ে ই-সিগারেট ও ভ্যাপের প্রচার চালানো হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই কিশোরদের ধূমপানে আসক্ত করা।
বাংলাদেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর নজর বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানির
বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ দেশের প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে, যা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। বাকি ৩৪ শতাংশ শিশু ও বয়স্ক, যারা অন্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এই আধিক্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করে।
এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, জাপান টোব্যাকো, ফিলিপ মরিসসহ বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানিগুলো একের পর এক অভিনব প্রলোভনের ফাঁদ তৈরি করছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ কোটি সিগারেট বিক্রি হয়। পাশাপাশি রয়েছে বিড়ি, জর্দা ও গুল। নতুন করে যুক্ত হয়েছে ই-সিগারেট, ভ্যাপ এবং নিকোটিন পাউচ।
ই-সিগারেট ও ভ্যাপ মোটেও কম ক্ষতিকর নয়
ই-সিগারেট ও ভ্যাপ সম্পর্কে “কম ক্ষতিকর” এমন প্রচারও চালানো হচ্ছে। অথচ এসব পণ্যের মাধ্যমে নতুন করে নিকোটিন আসক্তি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলেও সত্য, সংসদে দাঁড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির যুক্তি দেখিয়ে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ই-সিগারেট, ভ্যাপ, নিকোটিন পাউচ এবং হিটেড টোব্যাকো পণ্যে কর-সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ও এই অবস্থান দ্বারা প্রভাবিত বলে আসন্ন বাজেটে এসব পণ্যে সিগারেটের মতো কর আরোপ করা হয়নি। জনস্বাস্থ্য কর্মী ও সাংবাদিক হিসাবে অন্তত সিগারেটের মতো ৮৩ শতাংশ শুল্ক বসানো জরুরি এসব ইমার্জিং টোব্যাকো পণ্যে।
তামাক নিয়ন্ত্রণের বৈশ্বিক চুক্তিতে প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ হিসাবে তাক লাগিয়েছিলো বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক বৈশ্বিক চুক্তি FCTC-তে স্বাক্ষর করে। ৬৬ দেশের মধ্যে প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছিল। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঐ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে রেটিফাই করা হয় এবং ২০০৫ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন প্রণয়ন করে উন্নত বিশ্বের অনেক দেশকেই তাক লাগিয়েছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে দুই দফায় তামাক নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে আইনটি সংশোধন করা হয়েছে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়েছিলো বাংলাদেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজস্বের যুক্তি দেখিয়ে নতুন ধরনের তামাকজাত পণ্যকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
শুল্ক প্রত্যাহারে এক বছরে ৫০ হাজার একর জমিতে বেড়েছে তামাক চাষ
তামাকই একমাত্র পণ্য, যার পুরো জীবনচক্রই ক্ষতিকর। এটি পরিবেশ ধ্বংসকারীও। তামাক গাছ সাধারণত পশুপাখিও খায় না। অন্যদিকে তামাক কোম্পানির প্রভাবে তামাকপাতা রপ্তানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে দেশে তামাক চাষ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে দেশে তামাক চাষ হয়েছিল প্রায় ৯৩ হাজার একর জমিতে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার একরে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৫০ হাজার একর জমিতে তামাক চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ তামাকপাতা রপ্তানিতে শুল্ক প্রত্যাহার। আগে ২৫ শতাংশ শুল্ক ছিল, যা পরে ধাপে ধাপে শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে তামাক চাষ আরও লাভজনক হয়ে উঠেছে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই অতিরিক্ত ৫০ হাজার একর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হলে আনুমানিক ১ লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন সম্ভব হতো, যার বাজারমূল্য সরকারি সংগ্রহমূল্য অনুযায়ী প্রায় ৩৬০ থেকে ৩৯৬ কোটি টাকা। এটি প্রায় ৬ থেকে ৮ লাখ মানুষের এক বছরের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে পারত।
কিন্তু তামাক চাষের কারণে সেই জমিতে খাদ্যের পরিবর্তে উৎপাদিত হচ্ছে “সবুজ বিষ”। তামাকের কারণে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়, যা মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। তামাক শুকাতে বিপুল পরিমাণ কাঠ পোড়াতে হয়, ফলে পরিবেশগত ক্ষতি আরও বাড়ে।
শুল্ক সুবিধার কারণে বাংলাদেশে তামাকপাতা ভারত, পাকিস্তান ও চীনের তুলনায় অনেক সস্তা। ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখান থেকে কম দামে তামাক কিনে সিগারেট উৎপাদন করছে এবং বিপুল মুনাফা করছে। একইসঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো তামাক রপ্তানি করেও বড় অঙ্কের আয় করছে। সব মিলিয়ে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি হচ্ছে।
আসছে বাজেটে তামাকপাতা রপ্তানিতে অন্তত ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ জরুরি
আগেই বলেছি তামাক কোম্পানি কূটকৌশলে মাত্র কয়েক বছর আগে বাতিল হয় তামাক পাতা রপ্তানিতে থাকা ২৫ শতাংশ শুল্ক। তাই আসন্ন বাজেটে তামাকপাতা রপ্তানিতে অন্তত ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা জরুরি। পরবর্তী অর্থবছরের বাজেটে তা ২৫ শতাংশে উন্নীত করা উচিত। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে এবং তামাক চাষের বিস্তার কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে। জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষি জমি সুরক্ষাসহ পরিবেশের রক্ষায় আগের মতো রফতানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক পুনর্বহাল সময়ের দাবি বাংলাদেশে। একইসঙ্গে তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি এবং দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসে এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : সুশান্ত সিনহা- সাংবাদিক ও জনস্বাস্থ্য গবেষক
sinhasmp@yahoo.com