ঢাকাবুধবার , ২৭ মে ২০২৬
  1. সর্বশেষ

একটা সিগারেটে ৫ পয়সা লাভ হলে কোম্পানির মুনাফা বাড়ে ২৫০ কোটি টাকা

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২৭ মে ২০২৬, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ

Link Copied!

জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠন সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছে। পাশাপাশি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরাও গবেষণা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর বৃদ্ধি ও তামাক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছেন। গুরুত্ব অনুধাবন করে এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষার অংশ হিসেবেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করেছে। সব মিলিয়ে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অব্যাহত সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আইন সংশোধনসহ বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিগারেটের উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ বিলিয়ন শলাকা কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট সিগারেট উৎপাদন ছিল ৮ হাজার ৪৫৯ কোটি শলাকা বা ৮৪ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন শলাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৫৪২ কোটি বা ৬৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন শলাকায়। যেখানে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন কমেছে নিম্ন স্তরের সিগারেটে। নিম্ন স্তরের সিগারেটের উৎপাদন কম হওয়াকে তামাক কোম্পানিগুলো চোরাচালান বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখাতে চায় এবং নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ তা বিশ্বাস করে হাপিত্যেশ করছেন। রাজস্ব হারানোর কোম্পানিগুলোর চিরায়ত মায়াকান্নার মিথে অনেকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। আবার অনেকে সিগারেট কোম্পানির কারসাজি ও মুনাফার ফাঁকফোকর সম্পর্কে ধারণা না থাকায় রাজস্ব হারানোর সেই চোরাচালান-জুজু নিয়েও লেখালেখি করছেন।

২৩ শতাংশ উৎপাদন কমার পরও রাজস্ব বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ
এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে রাজস্ব ছিল ৩৭ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৪১১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ২ বিলিয়ন শলাকা উৎপাদন কম হওয়ার পরও সিগারেট খাতে রাজস্ব বেড়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ, কিন্তু এনবিআরের রাজস্ব বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। কর বৃদ্ধির মাধ্যমে সিগারেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ কমানোর এটি একটি বড় উদাহরণ। ফলে রাজস্ব হারানোর যে মিথ বা জুজু সিগারেট কোম্পানিগুলো প্রচার করে, তা যে অমূলক—এই তথ্যই কি তার জন্য যথেষ্ট নয়?

১৭ শতাংশেই সিগারেট কোম্পানির মুনাফা দেড় হাজার কোটি টাকা?
সিগারেট কোম্পানি এবং তাদের চিন্তার প্রচারকারী অর্থনীতিবিদ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেকেই বলে থাকেন, এক প্যাকেট সিগারেটের দাম ১০০ টাকা হলে এর মধ্যে সরকার কর হিসেবে ৮৩ টাকা নিয়ে যায়। বাকি ১৭ শতাংশ থাকে কোম্পানির উৎপাদন খরচ থেকে মুনাফা পর্যন্ত যাবতীয় ব্যয়ের জন্য। ফলে এই সামান্য টাকায় কী করা সম্ভব? কিন্তু তারা সিগারেট কোম্পানির শুভঙ্করের ফাঁকি সম্পর্কে জানেন না বলেই এমন কথা বলেন।

আগেই বলেছি, বর্তমানে সিগারেটের চার স্তরেই মোট করহার ৮৩ শতাংশ এবং ১৭ শতাংশ থাকে সিগারেট কোম্পানির উৎপাদন খরচ থেকে মুনাফার অংশ হিসেবে। সিগারেট কোম্পানির সুরে অনেকে উষ্মা জানিয়ে বলেন, মাত্র ১৭ শতাংশ পায় কোম্পানি, তাই আর ট্যাক্স বাড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ আরও কর বাড়ালে তামাক কোম্পানির তো কিছুই থাকবে না। বাস্তব চিত্রটা কী?

বাংলাদেশের সিগারেটের প্রায় ৭৭ শতাংশ বাজার হিস্যা বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের দখলে। ১২ দশমিক ২১ শতাংশ বাজার হিস্যা আরেক বহুজাতিক কোম্পানি জাপান টোব্যাকোর এবং ১০ দশমিক ২৮ শতাংশ দেশীয় কোম্পানি আবুল খায়েরের দখলে। দেশীয় আরও ছোট ছোট কিছু সিগারেট কোম্পানি আছে, যাদের সম্মিলিত উৎপাদন দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। এ কারণে বিএটিবির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা নিয়ে আলোচনা করলেই বোঝা যাবে, ১৭ শতাংশে কতটা ফুলে-ফেঁপে উঠছে সিগারেট কোম্পানিগুলো।

বিএটিবির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে তাদের নিট মুনাফা ছিল ১ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। ২০২১ সালে ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে বিএটির গড় নিট মুনাফা হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। হ্যাঁ, গল্প নয়—সত্যি। সিগারেটের জন্য তামাক পাতা চাষে ভর্তুকি, তামাক ক্রয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষে সিগারেট উৎপাদনের খরচ, কর্মীদের বেতন-ভাতা, ব্যাংকের সুদসহ সব ধরনের ব্যয় এবং আয়কর দেওয়ার পরও বিএটির মুনাফা বছরে গড়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি। মাত্র ১৭ শতাংশের মধ্যেই বিএটির মুনাফা এই পরিমাণ। অর্থাৎ যারা বলে থাকেন সিগারেটে আর কর বাড়ানোর সুযোগ নেই, তাদের জন্য এই তথ্য-উপাত্তই যথেষ্ট।

বিএটি মহাখালীর সিগারেট কারখানা স্থানান্তরের খরচ দেখিয়েছে ৭২১ কোটি টাকা
২০২৫ সালে বিএটি তাদের নিট মুনাফা দেখিয়েছে ৫৮৪ কোটি টাকা। কিন্তু এটি প্রকৃত চিত্র নয়। কারণ মহাখালী থেকে সিগারেট কারখানা পুরোপুরি সাভারে স্থানান্তরের খরচ হিসেবে দেখানো হয়েছে ৭৫০ কোটির বেশি টাকা। কারখানা স্থাপনে নতুন জমি ক্রয় নয়, শুধু স্থানান্তরের জন্যই এত বিশাল অঙ্কের খরচের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আর এই বিপুল অঙ্কের ব্যয় দেখানোর কারণেই মুনাফা কমিয়ে ৫৮৪ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। যদি স্থানান্তরের প্রকৃত খরচ ২০০ কোটি টাকা হতো, তাহলে অতিরিক্ত প্রায় ৫০০ কোটি টাকা যোগ হয়ে বিএটির মুনাফা দাঁড়াত হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে এরপরও কি বলা যায়, কোম্পানির অংশে মাত্র ১৭ শতাংশ থাকে, তাই আর ট্যাক্স বাড়ানোর সুযোগ নেই?

শলাকা প্রতি ৫ পয়সা লাভ হলে কোম্পানির মুনাফা বাড়ে ২৫০ কোটি টাকা
টাকা নয়, সিগারেট কোম্পানিগুলো হিসাব করে পয়সায়। কারণ সিগারেট প্রতি মাত্র ৫ পয়সা মুনাফা বাড়লেও তারা বিশাল অঙ্কের মুনাফা করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের সিগারেট বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণকারী ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটিবি) কথাই ধরা যাক। ২০২৫ সালে বিএটিবি উৎপাদন করেছিল ৪ হাজার ৯৯৪ কোটি শলাকা বা ৪৯ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন শলাকা সিগারেট। এখন যদি প্রতি শলাকায় ৫ পয়সা মুনাফা বাড়ে, তাহলে বিএটিবির মুনাফি বাড়ে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। যদি শলাকা প্রতি ১০ পয়সা লাভ হয়, তাহলে মুনাফা হবে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। আর ২০ পয়সা বাড়তি পেলে মুনাফা হবে প্রায় হাজার কোটি টাকা।

অনেকেই হয়তো ভাববেন, ৫ পয়সা বা ১০ পয়সা—এ আর এমন কী! পয়সার চল না থাকলেও সিগারেট কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধিতে এই ৫ পয়সার গুরুত্ব অনেক বেশি।

এত গেল একটি কোম্পানির হিসাব। যদি সব কোম্পানির হিসাব ধরা হয়, তাহলে দেখা যাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ হাজার ৫৪২ কোটি বা ৬৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন শলাকা সিগারেট উৎপাদন হয়েছিল। শলাকা প্রতি ৫ পয়সা লাভ হলে অতিরিক্ত মুনাফা দাঁড়ায় ৩২৭ কোটি টাকা। ১০ পয়সা হলে মুনাফা বেড়ে হবে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার বেশি। এ কারণেই বহু বছর ধরে বলে আসছি, সিগারেট কোম্পানিগুলো টাকার হিসাবে নয়, পয়সার হিসাবে শত শত কোটি টাকার মুনাফা করে। তাই যারা সিগারেটের কর বাদে মাত্র (!) ১৭ শতাংশ কোম্পানির অংশ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাদের জন্য ওপরের তথ্যগুলোই যথেষ্ট।

পুনশ্চ: বেনসন সিগারেটের দাম সাড়ে ১৮ টাকা। কিন্তু এর মধ্যে কর বাদ দিলে উৎপাদন খরচ, মুনাফা, কমিশন, ব্যাংকের সুদ, পরিবহন, কর্মীদের বেতন-ভাতা, বীমা, যন্ত্রপাতি কেনা এবং কোম্পানির আয়করসহ সব ব্যয় মিলিয়ে শলাকা প্রতি খরচ মাত্র ৩ টাকা ১৫ পয়সা। হ্যাঁ, গল্প নয়—এটাই সত্যি। নামমাত্র খরচেই সিগারেট উৎপাদন সম্ভব। এ কারণেই ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) গত কয়েক বছরে গড়ে আয়কর-পরবর্তী নিট মুনাফা করেছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি।

আসছে বাজেটে তামাক কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধির সুযোগ বাড়ছে?
সেই মুনাফা আরও উসকে দিতে পারে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সিগারেটের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা। ইতোমধ্যে এনবিআর চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সব ধরনের সিগারেটের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর এতেই সিগারেট কোম্পানিগুলোর চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। আগেই বলা হয়েছে, মাত্র ৫ পয়সা দাম বাড়লেই কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। এখন যদি ১ টাকা করে দাম বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে ১৭ শতাংশ হিসাবে সিগারেট কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়বে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি।

কিন্তু যদি সুনির্দিষ্ট কর বা স্পেসিফিক ট্যাক্স শলাকা প্রতি ১ টাকা করে বাড়ানো হতো, তাহলে পুরো ১ টাকাই সরকার রাজস্ব হিসেবে পেত। বিপরীতে তামাক কোম্পানিগুলো বাড়তি কোনো মুনাফার সুযোগ পেত না। তামাক কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধির সুযোগ রেখে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। কারণ বাড়তি মুনাফা হলে মৃত্যু-ব্যবসা আরও বাড়াবে তামাক কোম্পানিগুলো।

লেখক: সুশান্ত সিনহা, একাত্তর টেলিভিশনের প্ল্যানিং এডিটর ও জনস্বাস্থ্য গবেষক

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

লঘুচাপের প্রভাবে ৫ দিনজুড়ে বৃষ্টি-ঝড়ের আভাস

রবি এলিট প্রোগ্রামে আরও ১৬ ব্র্যান্ড, মিলবে ৫২% পর্যন্ত ছাড়

With 16 New Brands, Robi Elite Offers Up To 52% Discount

অপো এ সিরিজকে নম্বর ১ স্মুথনেস, ব্যাটারি লাইফ ও ডিউরেবিলিটির স্বীকৃতি দিলো বুয়েট

Universal Birth-Death Registration Accelerates SDGs

শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এসডিজি অর্জনে সহায়ক

ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ‘ভূমি দৃষ্টি’ অ্যাপ চালু হচ্ছে: প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

প্রকৃতি ও জীব-বৈচিত্র্য বেঁচে থাকলে আমরাও বাঁচব- জীব-বৈচিত্র্য দিবসে বক্তারা

Apex Footwear introduces ‘Buy Online, Pick-up in Store’ (BOPIS) service ahead of Eid ul-Azha

ঈদে ক্রেতাদের সুবিধায় ‘এক্সপ্রেস ডেলিভারি’ ও ‘পিকআপ’ সেবা চালু করল এপেক্স

Recommendation to ban unfit Motor vehicles for safe Eid travel

নিরাপদ ঈদযাত্রায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধের সুপারিশ