বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে সূর্য থেকে ধেয়ে আসা একটি শক্তিশালী সৌরঝড়। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি গত ২০ বছরের মধ্যে অন্যতম বড় ও শক্তিশালী সৌর বিকিরণ ঝড়। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টার (SWPC) এ ঝড়কে পাঁচ মাত্রার মধ্যে চার নম্বর বা ‘এস৪’ (S4) স্তরের গুরুতর সৌরঝড় হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই সৌরঝড়ের প্রভাবে পৃথিবীর স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা, জিপিএস নেটওয়ার্ক এবং বিদ্যুৎ গ্রিড মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সহজভাবে বলতে গেলে, পৃথিবীতে যেমন বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে ঝড় সৃষ্টি হয়, তেমনি সূর্য থেকেও তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ ও চার্জযুক্ত কণার প্রবল স্রোত মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে সৌরঝড় বলা হয়। সূর্যের ভেতরে সংঘটিত বিশাল বিস্ফোরণ থেকেই এই শক্তিশালী শক্তি প্রবাহের জন্ম হয়। যখন এই কণাগুলো পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সীমানায় পৌঁছায়, তখনই এর প্রভাব অনুভূত হয়।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সূর্যের উপরিভাগে চুম্বকীয় শক্তির চরম অস্থিরতার ফলে ‘করোনাল মাস ইজেকশন’ (CME) নামে পরিচিত বিশাল প্লাজমা বিস্ফোরণ ঘটে। পাশাপাশি সূর্যের দাগ বা সানস্পট থেকে আকস্মিক বিকিরণ, যাকে সোলার ফ্লেয়ার বলা হয়, এই ঝড়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে। সূর্যের এই অস্থিরতা যখন পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে, তখনই বিকিরণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আঘাত হানে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সৌরঝড়ের প্রভাব কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা প্রযুক্তিগত বিপর্যয়। ঝড়ের কারণে স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও জিপিএস সিগন্যালে সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে। অতীতেও এমন নজির রয়েছে। ২০০৩ সালে সংঘটিত একটি শক্তিশালী সৌরঝড়ে সুইডেনে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া উচ্চ উচ্চতায় বিমান চলাচল ও মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত মহাকাশচারীরা বাড়তি বিকিরণ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
তবে এই ঝড়ের একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সূর্য থেকে আসা চার্জযুক্ত কণাগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের সঙ্গে বিক্রিয়া করে আকাশে সৃষ্টি করতে পারে রঙিন আলোর ঝলক বা ‘অরোরা’। সাধারণত মেরু অঞ্চলে দেখা গেলেও এবারের ঝড়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা ও উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত এই চোখধাঁধানো মেরুজ্যোতি দেখা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সৌরঝড়ের ফলে পৃথিবীর ভূ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
ইতোমধ্যে নাসা, বিমান চলাচল সংস্থা এবং বিদ্যুৎ গ্রিড পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা থেকে মঙ্গলবার ভোরের মধ্যে এই সৌরঝড়ের সর্বোচ্চ প্রভাব অনুভূত হতে পারে।


