
একটি দেশ কতটা এগিয়ে—তা বোঝার জন্য সব সময় তার অর্থনৈতিক সূচক দেখার দরকার পড়ে না। কখনও কখনও একটি দেশের রাস্তাই বলে দেয় তার সম্ভাবনার গল্প। ভোরবেলার ঠাণ্ডা বাতাসে যখন সড়কে প্রথম ট্রাকের চাকা ঘোরে, তখন তা শুধু চলাচল নয়—একটি দেশের কর্ম, ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার জন্য বয়ে আনে গতিশীলতা। এই গতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সড়ক নেটওয়ার্ক। আর এই নেটওয়ার্ক যত বিস্তৃত, দেশ তত গতিশীল। আজ আমরা যে গল্পটি বলব, সেটি বিশ্বের সেই শীর্ষ ১০ দেশের, যারা সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। তারা কীভাবে এই বিশাল পরিকাঠামো তৈরি করল, এর অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক জীবনে কী প্রভাব পড়ছে, তাও জানা যাবে।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ সড়ক নেটওয়ার্কের অধিকারী দেশ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মোট সড়ক নেটওয়ার্ক দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৮ লাখ কিলোমিটার, যা একে এই তালিকার শীর্ষে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারস্টেট হাইওয়ে সিস্টেম একটি বিস্ময়কর প্রকৌশল কীর্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৫৬ সালে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের হাত ধরে যে প্রকল্প শুরু হয়েছিল, আজ তা যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যকে একে অপরের সাথে যুক্ত করেছে একটি সুবিশাল জালের মাধ্যমে। এই সড়কসমূহ শুধু মানুষ ও পণ্য পরিবহনের মাধ্যম নয়, বরং মার্কিন সামরিক বাহিনীর রসদ সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপাদানও।
এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার এই বৃহৎ দেশটির সড়ক নেটওয়ার্ক বর্তমানে ৬৭ লাখ কিলোমিটারের কাছাকাছি। ভারতের সড়কগুলোর গুরুত্ব অনেকগুণে বেড়েছে বিগত এক দশকে। জাতীয় মহাসড়ক, রাজ্য মহাসড়ক, জেলা এবং গ্রামীণ সড়ক মিলে যে বিশাল অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, তা কৃষি, শিল্প এবং পর্যটনসহ প্রায় সব সেক্টরের জন্য একটি অনন্য সহায়ক শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। “ভারতমালা” ও “প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ সড়ক যোজনা”-র মতো প্রকল্পের ফলে দেশের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোও এখন রাস্তায় সংযুক্ত।
চীনের কথা এলে অবকাঠামো উন্নয়নের প্রসঙ্গ অবশ্যই আসবে। দেশটির সড়ক নেটওয়ার্ক এখন প্রায় ৫২ লাখ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা তাকে তৃতীয় স্থানে নিয়ে এসেছে। চীন একদিকে হাইস্পিড রেলনির্ভর হলেও, অপরদিকে তাদের সড়ক অবকাঠামোও অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। “ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড” উদ্যোগের মাধ্যমে চীন শুধু অভ্যন্তরীণ রাস্তাই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরির মধ্য দিয়েও বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে।
চতুর্থ স্থানে থাকা ব্রাজিলের মোট সড়ক দৈর্ঘ্য ২০ লাখ কিলোমিটারের কাছাকাছি। এই সড়কগুলো দেশটির বিশাল কৃষি অর্থনীতির জন্য রক্তধারার মতো। বিশেষ করে অ্যামাজন এলাকার দিকে রাস্তাঘাট পৌঁছানো যতই কঠিন হোক না কেন, ব্রাজিল সরকার সে দিকে নজর দিয়েছে। যদিও অনেক সড়ক এখনো পাকা করা হয়নি, তবে সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবকাঠামো বিনিয়োগ বাড়ানোর ফলে কৃষিপণ্য, যেমন সয়াবিন বা গবাদি পশু পণ্য রপ্তানিতে সুবিধা হয়েছে।
রাশিয়ার সড়ক নেটওয়ার্ক দীর্ঘ কিন্তু জটিল। এই দেশটির মোট সড়ক দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ লাখ ৩৮ হাজার কিলোমিটার। তবে বৈরী আবহাওয়া ও তুন্দ্রা-টায়গা অঞ্চলের কারণে অনেক অঞ্চল সারা বছর সংযুক্ত থাকে না। তা সত্ত্বেও রাশিয়া বিভিন্ন “ফেডারেল হাইওয়ে” উন্নয়নের মাধ্যমে রাজধানী মস্কো থেকে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত সংযোগ বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। রাশিয়ার জন্য সড়ক শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে।
জাপান একটি দ্বীপ রাষ্ট্র, যেখানে স্থান সংকুলান একটা বড় সমস্যা। কিন্তু তারপরও দেশটি ১২ লাখ কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। টোকিও, ওসাকা, নাগোয়া—এই বিশাল শহরগুলোকে আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে যুক্ত করা হয়েছে। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় নির্মাণ হওয়া সড়কগুলোতে ব্যবহার হয়েছে বিশেষ প্রযুক্তি। এখানকার অবকাঠামো শুধু মজবুত নয়, বরং পরিবেশবান্ধবও।
ফ্রান্সের সড়ক অবকাঠামো ১০ লাখ ৫৩ হাজার কিলোমিটার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই দেশটি সড়ক গঠন ও ব্যবস্থাপনায় একধরনের রোল মডেল। ফ্রান্সে “Autoroutes” নামে পরিচিত টোল হাইওয়েগুলোর পাশাপাশি অসংখ্য প্রাদেশিক ও স্থানীয় সড়ক রয়েছে, যা শহর ও গ্রামকে অনন্যভাবে সংযুক্ত করেছে। ফরাসি গ্রামাঞ্চলে যেকোনো মৌসুমে গাড়ি চালিয়ে যাওয়া যে কতটা সহজ, তা তাদের সুপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনারই প্রমাণ।
কানাডার বিস্তৃত ভূখণ্ডে সড়ক নেটওয়ার্ক হচ্ছে জীবনরেখা। দেশের মোট সড়ক দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ লাখ ৪২ হাজার কিলোমিটার। এই বিশাল সড়ক অবকাঠামো বরফাচ্ছন্ন অঞ্চল, পাহাড় ও হ্রদ অতিক্রম করে উত্তর থেকে দক্ষিণ এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত। তবে কানাডার সমস্যা হলো, অধিকাংশ রাস্তা শুধু গ্রীষ্মকালীন ঋতুতেই কার্যকর থাকে। তারপরও হাইওয়ে ১ বা “ট্রান্স-কানাডা হাইওয়ে” হচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম সড়কগুলোর একটি।
অস্ট্রেলিয়ার কথা উঠলে মনে আসে বিস্তৃত মরুভূমি, জনশূন্য অঞ্চল এবং অসাধারণ প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। এমন পরিবেশে ৮ লাখ ৭৩ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি রাস্তা তৈরি করাটা সহজ কথা নয়। তবে দেশটির সড়ক নেটওয়ার্ক মূলত চারটি প্রধান শহর—সিডনি, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন ও পার্থের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্যই গড়ে উঠেছে। এছাড়া আউটব্যাক অঞ্চলের দিকে কিছু “unsealed road” থাকলেও, সেগুলো ধীরে ধীরে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে।
এই তালিকার দশম স্থান দখল করেছে ইন্দোনেশিয়া। দ্বীপ-রাষ্ট্র হওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার ভূগঠন রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। তবে দেশটির ৮ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্ক তাদের অভ্যন্তরীণ এবং বাণিজ্যিক গতিশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জাভা, সুমাত্রা, সুলাওয়েসি, বালির মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলোর মধ্যে ফেরির পাশাপাশি রাস্তাও উন্নত করা হচ্ছে।
এই ১০টি দেশের সড়ক অবকাঠামো শুধু দৈর্ঘ্যে বিশাল নয়, বরং প্রতিটি দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি ও সমাজের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। রাস্তা মানেই শুধুমাত্র কংক্রিট আর বিটুমিন নয়। রাস্তা মানে যোগাযোগ, বিকাশ, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনা। একটি ছোট গ্রাম থেকে বড় শহরের মধ্যে সংযোগ গড়ে তোলার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জাতির উন্নয়নের পথ। তাই আজকের দিনে, যখন প্রযুক্তি, পরিবেশ ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ সামনে দাঁড়িয়ে, তখন এই বিশাল সড়ক নেটওয়ার্কগুলো শুধু গন্তব্য নয়—একটি চলমান যাত্রার গল্প বলছে।