ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

অনন্তের খোঁজে: মৃত্যুর পর জীবন বিশ্বাসের বৈচিত্র্য

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৪ জুলাই ২০২৫, ১১:২৩ সকাল

Link Copied!

রাতের শেষ প্রহরের নিস্তব্ধতায় এক বৃদ্ধ পথিক তার হাঁটে মৃতপ্রায় একটি গ্রামীণ পথ ধরে। আকাশে ঝিরঝিরে তারা, বাতাসে স্বল্প সূর্যোদয়ের আগে এক অনিশ্চিততা—“মৃত্যুর পর কী আছে?”—এই প্রশ্নের উত্তর সেই পথিক বারবার খুঁজে ফেরে, বারবার মন ভেঙে আসে, আবার বারবার তার বিশ্বাসের সেতুবন্ধন তৈরি হয়। পৃথিবীর কোন প্রান্তে হোক, মানুষ মৃত্যুকে শুধু সমস্যাই মনে করেনি; তার ঠিক পরেই কোনো না কোনো অদৃশ্য জগৎ, কোনো না কোনো নতুন সূচনা আছে—এমনই বিশ্বাস তৈরি হয়েছে প্রাচীন কাল থেকেই।

বিশ্বাসের এই প্রেক্ষাপট তুলনামূলকভাবে জাদুবিদ্যা নয়, বরং মানুষের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্প্রতি World Values Survey (২০১৭–২০২২)–এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জাতি, ধর্ম, ইতিহাস, আধুনিকতা, শিক্ষা ও শহুরোয়নের সঙ্গে–সঙ্গে এ বিশ্বাসের হারও বদলায়। চলুন, আমরা বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর পর জীবনের প্রতি মানুষের আস্থা–বিশ্বাসের ভিন্ন ভিন্ন রং উন্মোচন করি।

শিখরে স্বপ্ন—শীর্ষস্থানীয় দেশগুলো
তালিকার প্রথম সারিতে উঠে এসেছে বাংলাদেশ, যেখানে ৯৮.৮% মানুষ মৃত্যুর পর জীবনে অটল বিশ্বাস পোষণ করে। এ সংখ্যাটি শুধু কণ্ঠস্বরের পরিসংখ্যান নয়, বরং আমাদের দেশে ধর্মীয় চেতনার গভীরতা, সামাজিক বন্ধন এবং জীবন-মৃত্যু নিয়ে আচার-অনুষ্ঠানের ঐতিহ্যই মূর্ত প্রতিফলন। প্রতিটি জন্ম-মৃত্যু অনুষ্ঠান, কাসাহান্দা ঝাঁপিয়ে তীর্থ-তীর্থায়ন—এসব আচারে মানুষ যুগ যুগ ধরে অনুশীলন করে এসেছে যে, মরে গিয়েও আত্মা থাকে, সেই আত্মার পরবর্তী যাত্রা আছে।

ঈশ্বরনামে গাওয়া মরক্কো–য় ৯৬.২%, এবং দুর্গম সহস্রাব্দের ইতিহাসে জারজর করা লিবিয়া–তে ৯৫.২% মানুষ মৃত্যুর পর যাত্রা বিশ্বাস করে। এ দু’দেশই ইসলামী ঐতিহ্যের ঘাঁটি, যেখানে কুরআন-পবিত্র হাদিস থেকে শুরু করে সমগ্র জীবন-দর্শন নিয়েই বিশ্বাস মিশে আছে।

তুরস্ক–তে এ নাম্বার ৯১.৮%, আর প্রতিবেশি ইরানে ৯১.৩%। মধ্যপ্রাচ্যের এই বৃহৎ ভূখণ্ডেই ইসলাম ধর্মের পাশাপাশি পারস্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দেশের মানুষের মৃত্যুবৃত্তান্তের পরবর্তী অধ্যায়কে আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সম্পৃক্ত করে।

আরও নিচে, পাকিস্তান–এ ৮৯.৩%, মিশর–এ ৮৮.১% এবং ফিলিপাইন–এ ৮৩.৮%—এসব দেশের আধ্যাত্মিক ছায়া যতই দৃঢ়, তথাপি প্রতিটি সমাজের স্বতন্ত্র ইতিহাস এবং ধর্মীয় অনুশীলন বিশ্বাসের মাত্রাতিরিক্ত মাত্রা এবং স্বাতন্ত্র্য বদলে দেয়। লাতিন আমেরিকার মেক্সিকো–তেও ৭০.৮% মানুষ মৃত্যুর পরের জন্য অপেক্ষা করে, কিন্তু সেই বিশ্বাস আঞ্চলিক খ্রিস্টান-ঈশ্বর অন্বেষণের অন্তর্গত অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় কম অনমনীয়।

মাঝামাঝি রঙের দেশসমূহ
তালিকার মাঝামাঝি এসে দেখা মেলে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া–তে ৭৩.৫%, আর মালয়েশিয়ায় ৮১.৯% মানুষ আত্মার পরবর্তী পৃথিবীতে পা রাখার সম্ভাবনা দেখেন। এখানে রয়েছে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান—সব ধর্মের মিশ্রন, আর এ মিশ্রণে বিশ্বাস অভিজ্ঞতা আভা পায় ভিন্নমাত্রা।

নাইজেরিয়ার ৮৩.১%—আফ্রিকাতে খ্রিস্টান-ইসলাম দুই ধর্মই ছড়িয়ে আছে, যেখানে আদিবাসী আচার-অনুষ্ঠান, পূর্বপুরুষপূজা ও আত্মার জগত নিয়ে বর্ণিল কল্পনা ক্রমাগত ধর্মীয় উপাসনায় যুক্ত হয়।

উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে ৬৮.২%, এবং কানাডায় ৫৬.৯% মানুষ মৃত্যুর পর জীবনে স্থায়ী বিশ্বাস রাখে। এই দুই দেশ শিক্ষার উচ্চমাত্রা, শরীর-মন-ভবিষ্যতের বিজ্ঞানমনস্ক অন্বেষণের পাশাপাশি উদারতর সাংস্কৃতিক মিশ্রণের জায়গা। ফলে এখানে রবিচকিত্সক বা আবেগমুখী বিশ্বাসের পাশাপাশি অনেকে “নিখুঁত প্রমাণ” খোঁজে, তাই বিশ্বাসের হার এতটা কমে আসে।

নিম্নমানের প্রতিফলন: ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়া
ইউরোপের উত্তর-পূর্ব কোণে ইসল্যান্ড–এর মানুষ মাত্র ৫৮.০%, আর পাশের নরওয়ে–তে ৩৯.৩% আত্মার পরবর্তী যাত্রা বিশ্বাস করে। উত্তর ইউরোপে সেক্যুলারাইজেশন (ধর্মনিরপেক্ষতা)–এর ধাক্কায় ধর্মীয় রীতিচর্চা অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, ফলে মৃত্যুর পর জীবনের ধারণাও বেশিরভাগ হলেও উদাসীন-নিঃসঙ্গ হয়ে এসেছে।

আরো পশ্চিমে যুক্তরাজ্যে ৪১.৭%, স্পেনে ৩৮.১%, নরওয়ে–র মতোই তারা “ধর্মবিহীন” ভাবনার আঁকোশে ঘেরা। জমিদারসমাজের উত্তরাধিকার, শিল্প বিপ্লবের পুনরুজ্জীবন—এসব পরম্পরা ধর্মীয় অনুভূতিকে স্থানচ্যুত করে, সেখানে বরাবরই মিত্রতা পেয়েছে মানবতাবাদী, বৈজ্ঞানিক ও র‍্যাশ্নাল দর্শন।

রাশিয়ায় ৩৮.৭%, চীনে ১১.৫% মাত্র মানুষ মৃত্যুর পরের জীবনকে গ্রহণ করে—অতিরিক্তই কম। পার্টি-রাষ্ট্র, মার্কসবাদী শিক্ষা, ধর্মনিরপেক্ষ নীতি এসবই ধর্মীয় ব্যস্ততা কমিয়ে দিয়েছে, আত্মার পরবর্তী কাহিনি যেন বারবার আরোহনের সুযোগই পায় না।

সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক কারণ
মৃত্যুর পর জীবন–বিশ্বাসের এই ভিন্নতা ধর্ম, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মীয় বিখ্যাত গ্রন্থগুলো মৃত্যুর পর নবজন্ম, স্বর্গ-নরক বা পুনর্জন্মের ধারণা তুলে ধরে, আর সেই বিশ্বাসগাথা বরাবরই প্রতিটি মসজিদ-গীর্জা, তীর্থ-তীর্থায়ন ও আচার-অনুষ্ঠানে প্রবাহিত হয়।

প্রাচ্যের বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কারে পুনর্জন্মের ধারণা, কর্মফলের ধারাবাহিকতা ও নরকের সীমাবদ্ধতা—এসব প্রতিটি বিশ্বাসিকের মনন-ধারণাকে আরও দৃঢ় করে। মূলত ধর্মগত শাসনব্যবস্থা, ব্রাহ্মণ-পুরোহিত-শিক্ষিতদের প্রভাব, গ্রামীণ-শহুরে সামাজিক বিন্যাস—এসব মিলিয়ে দেশভেদে আত্মার পরবর্তী জীবনকে ভিন্ন মাত্রা প্রদান করে।

সেক্যুলার-আধুনিক যুক্তিবাদী সমাজে ধর্মীয় গুলোর রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব কমে যাওয়ায়, সেখানে মানুষ প্রমাণতত্ত্ব, বায়োমেডিক্যাল গবেষণা আর শববিজ্ঞানের আলোকে পরিচালিত হয়। এছাড়া শিক্ষার বিস্তার, নগরায়নের বৃদ্ধিসহ পশ্চিমা গণমাধ্যমের আধিক্য—এসবেই ধর্মীয় মূল্যবোধ কমে আসে; আত্মার অনন্ত যাত্রার চিত্র-ভাবনা চিরতরে ফিকে হয়ে যেতে পারে।

বিশ্বাসের সামাজিক উপকারিতা ও চ্যালেঞ্জ
মৃত্যুর পর জীবনের আস্থা অনেক সময়ই মানসিক শান্তি, নৈতিকতা, সামাজিক বন্ধন ও পারস্পরিক সাহায্যের উৎস। বিপদে বা অন্ধকারে তারা ভরসা করে ওই অনন্ত যাত্রার দিকে, যেখানে প্রতিটি কর্মের ফল আছে, প্রতিটি ভালুকার উত্তরদায়িত্ব আছে।

আরেকদিকে, অতি ধর্মীয় উন্মাদনা বা ধর্মব্যাপী অসহিষ্ণুতা তৈরি হতে পারে। কিছু সমাজে আত্মার পরবর্তী পৃথিবীর আতিশয্য উদযাপনে অতিরিক্ত রীতিবিরীতি, পুজো-পাঠ ও ভিক্ষা-সঞ্চয়—এসবই কখনো কখনো মানুষের সাময়িক বাস্তব সমস্যা—দারিদ্র্য, অসুস্থতা এবং সামাজিক অবক্ষয়—এগুলোকে আড়াল করতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশে বিশেষ প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে ৯৮.৮% মানুষের এই বিশ্বাস শুধু সংখ্যার খেলা নয়, বরং প্রতিটি গ্রাম-শহরে, প্রতিটি বাড়ির কোণায় সমাজের নিয়মানুবর্তিতা ও ধর্মীয় তীর্থযাত্রার দিকনির্ভরতা। এখানে মানুষ মৃতদেহ দাফন করার আগে যতটা যত্ন আর আয়োজন করে, ততটাই আত্মার পরবর্তী দেশ-স্বরূপে ‘জannat’ বা ‘পুণ্যভূমি’–এ পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। এই বিশ্বাসই তাদের সর্বনাশা দুর্বিপাকেও দৃঢ়তার সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বাসের পরিসর ও আমাদের দায়িত্ব
মৃত্যুর পর জীবন–বিশ্বাসের বিস্তার দেখিয়েছে, কেবল সংখ্যার খেলা নয়, বরং মানব সভ্যতার আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মীয় সাহিত্য, সামাজিক সমবায় এবং ব্যক্তিগত মানসিকতা—all মিলিয়ে সৃষ্টি করে এই অভিজ্ঞতার পরিসর।

আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসকে বুঝতে শেখা, শ্রদ্ধা করা, অতীতে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের আলোকে বর্তমান সংকট-সমাধানে ধর্মীয় অনুভূতির ইতিবাচক দিকগুলো কাজে লাগানো। একইসঙ্গে, অতি উগ্র বা বিদ্বেষপূর্ণ ধর্মাচারে আমাদের সজাগ থাকা। মুক্তচিন্তার দিক ধরেই তৈরি করতে হবে এমন এক বিশ্ব, যেখানে প্রত্যেকে অন্তর থেকে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বৈজ্ঞানিক যুক্তি—এই দুইয়ের সুষম সমন্বয়ে জীবন-শেষের পরের বিষয়টিও গ্রহণ করতে পারে।

একজন বৃদ্ধ পথে হাঁটে, তার পায়ে আছে বেলুনের মতো পাতলা আশ্রয়হীনতার ভয়। কিন্তু তার মন ভরে আছে মৃত্যুর পর জীবনের যাত্রাপথের আলোকরজ্জু—এলোমেলো ইতিহাস, আচার-অনুষ্ঠানের জালের মেলবন্ধন, আত্মার পরবর্তী অন্যায়-ভালোর হিসাব। আমাদের পৃথিবী যত আধুনিকই হোক, রহস্যের আবরণ একবার ছেঁড়ে গেলে মানুষের আস্থা-অনুভূতিই রয়ে যায় সবচেয়ে টেকসই সত্য।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস