ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

বৃষ্টিহীন মরুভূমিতে নতুন আশার বৃষ্টি: বৈদ্যুতিক ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তিতে সাফল্য পেল আমিরাত

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৩ জুলাই ২০২৫, ১:২৩ বিকাল

Link Copied!

দীর্ঘমেয়াদী খরার কবলে থাকা দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। প্রচণ্ড রোদ, শুকনো আবহাওয়া আর বিরল বৃষ্টিপাত দেশটির জলসম্পদ ব্যবস্থাকে করে তুলেছে চরম চ্যালেঞ্জপূর্ণ। কিন্তু এবার এই মরুভূমির আকাশে দেখা দিয়েছে এক নতুন আশার মেঘ। কারণ বিজ্ঞানীরা সফল হয়েছেন এমন এক প্রযুক্তি প্রয়োগে, যেখানে ড্রোনের মাধ্যমে মেঘে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে সৃষ্ট হচ্ছে কৃত্রিম বৃষ্টি—তাও আবার কোনো রাসায়নিক উপাদান ছাড়াই।

এই অভিনব পদ্ধতির নাম ইলেকট্রিক্যাল ক্লাউড সিডিং (Electrical Cloud Seeding)। এটি মূলত এমন এক প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে আর্দ্র মেঘের ক্ষুদ্র পানিকণাগুলোকে একত্র করে বড় করা হয়, যাতে তারা ভারী হয়ে বৃষ্টির আকারে ঝরে পড়ে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে ড্রোনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে, পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করেই।

কখন শুরু, কবে সাফল্য?
সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২১ সালে এই প্রযুক্তির গবেষণা ও পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু করে। এরপর ২০২২ সালের জুলাই মাসে প্রথমবারের মতো উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসে, যখন আবুধাবি ও আল আইন অঞ্চলে বৈদ্যুতিক শক ব্যবহার করে আকাশে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি নামানো হয়। সেই মুহূর্তের ভিডিও, উপগ্রহচিত্র ও স্থানীয় আবহাওয়া সংস্থার রিপোর্টে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, ড্রোন চালু হওয়ার ১৫–২০ মিনিটের মধ্যেই বৃষ্টিপাত শুরু হয়।

এরপর ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মধ্যে প্রযুক্তিটি আরও পরিপক্ব করা হয় এবং এখন এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—বিশেষত খরাপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে পানি সরবরাহের জন্য।

কিভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?
ড্রোনের সঙ্গে যুক্ত থাকে বিশেষ ধরনের আইনাইজিং প্রোব, যেগুলো আর্দ্র মেঘের মধ্যে প্রবেশ করলে সেখান থেকে নির্গত হয় ঋণাত্মক চার্জ। এই চার্জ মেঘের ভেতর ছোট ছোট পানিকণাগুলোর উপর প্রভাব ফেলে। কণাগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিশে বড় আকার ধারণ করে। একসময় তা এতটাই ভারী হয়ে ওঠে যে বৃষ্টির ফোঁটায় পরিণত হয়ে মাটিতে ঝরে পড়ে।

পুরো প্রক্রিয়াটি খুবই দ্রুত ঘটে—মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটেই শুরু হয়ে যেতে পারে বৃষ্টিপাত। বিশেষত মরুভূমির ছোট ছোট মেঘের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে কাজ করছে, যা অতীতে সম্ভব ছিল না।

পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এতে কোনো রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার করা হয় না। ফলে বৃষ্টির পানিতে কোনো ধরনের বিষক্রিয়া বা মাটির দূষণের ঝুঁকি থাকে না। ঐতিহ্যবাহী ক্লাউড সিডিংয়ে (যেমন: সিলভার আয়োডাইড ব্যবহার) পরিবেশগত ঝুঁকি থাকলেও, ইলেকট্রিক্যাল ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তি একেবারেই ঝুঁকিমুক্ত ও টেকসই।

এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও জলের উৎসগুলোতে দূষণের আশঙ্কা না থাকায় এটি নিরাপদ ও পুনঃব্যবহারযোগ্য একটি সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রযুক্তির কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ
এই ড্রোনগুলো রাডার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে সুনির্দিষ্ট মেঘ চিহ্নিত করে তার মধ্য দিয়ে ড্রোন পাঠানো হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ড্রোনের গতি, উচ্চতা এবং অবস্থান এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে সর্বোচ্চ কার্যকারিতা পাওয়া যায়। সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়, দূরবর্তীভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং অপারেশনের খরচও তুলনামূলকভাবে কম।

উল্লেখযোগ্য ফলাফল
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইতিমধ্যে এই প্রযুক্তির প্রাথমিক ব্যবহারিক প্রয়োগে দেখা গেছে, যেসব অঞ্চলে মাসের পর মাস কোনো বৃষ্টি হয় না, সেখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এই প্রযুক্তি ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ঘটাতে সক্ষম।

দেশটির জন্য এটি এক বিরাট অর্জন। কারণ আমিরাতের ৯০ শতাংশ পানি আসে সমুদ্রের পানি শোধন করে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি। এখন কৃত্রিম বৃষ্টির মাধ্যমে সেই চাপ অনেকটা হ্রাস পাবে বলে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা।

বিশ্বজুড়ে সম্ভাবনা
বিশ্বের জলবায়ু পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। খরাপ্রবণ দেশ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে পানির চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এ অবস্থায় ইলেকট্রিক্যাল ক্লাউড সিডিং হয়ে উঠতে পারে এক যুগান্তকারী সমাধান। সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং দ্রুত ফলদায়ী হওয়ায় এটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে অন্যান্য দেশও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে শুধু খরাপ্রবণ এলাকাগুলোতেই নয়, বনাঞ্চল ও কৃষিজমিতে টার্গেটেড বৃষ্টি নামিয়ে খরা, দাবানল ও কৃষিক্ষতি রোধ করা সম্ভব হবে। এছাড়া বড় শহরগুলোতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বা বায়ুদূষণ কমাতেও এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রযুক্তির এমন ব্যবহার প্রমাণ করে, বিজ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ মানুষের দুঃসময়ের সঙ্গী হতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোনের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক ক্লাউড সিডিংয়ের সফল প্রয়োগ শুধু এক দেশের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে খরার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। একসময় যে মরুভূমিতে সূর্য ছাড়া কিছু দেখা যেত না, সেখানে এখন ড্রোনের ডানায় ভর করে বৃষ্টি নামে—ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি হয়ে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস