
আধুনিক বৈশ্বিক অস্থিরতার যুগে আকাশ শক্তি একটি দেশের প্রতিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচিত। যুদ্ধবিমান, যার মধ্যে রয়েছে ফাইটার, মাল্টিরোল জেট ও ইন্টারসেপ্টর, সশস্ত্র বাহিনীর সবচেয়ে কার্যকর ও কৌশলগত অংশগুলোর মধ্যে একটি। এসব বিমান কেবল আকাশসীমা রক্ষা করেই ক্ষান্ত হয় না, বরং তা দেশের সীমান্ত পেরিয়ে শক্তি প্রদর্শন, প্রতিরোধ সৃষ্টি এবং প্রচলিত যুদ্ধ বা সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে কৌশলগত সহায়তা দেয়। বিশ্বের এমন দশটি দেশ রয়েছে, যাদের যুদ্ধবিমানের সংখ্যা এবং কার্যকারিতা বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোয় গভীর প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান বহরের অধিকারী। দেশটির বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী এবং মেরিন কর্পস মিলিয়ে প্রায় ২,৮২৬টি যুদ্ধবিমান পরিচালনা করে, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এই বহরে রয়েছে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ বিমান যেমন F-22 র্যাপটর এবং F-35 লাইটনিং II, পাশাপাশি চতুর্থ প্রজন্মের F-15, F-16 এবং নৌবাহিনীর F/A-18 হর্নেটের মতো পরীক্ষিত মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। যুক্তরাষ্ট্রের এই শ্রেষ্ঠত্ব তাদের বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট, বিশ্বমানের অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রি এবং বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতির কারণে গড়ে উঠেছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন ঘাঁটি থাকায় তারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতাও ধরে রেখেছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন, যার যুদ্ধবিমান সংখ্যা প্রায় ১,৬২৪। গত দুই দশকে চীন পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্স এবং নেভাল এভিয়েশনের মাধ্যমে একটি বিশাল আধুনিকীকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি J-20 স্টেলথ ফাইটার, J-10 এবং J-11 এর মতো উন্নত যুদ্ধবিমান চীনের বিমানবাহিনীকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। চীনের অ্যারোস্পেস প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে এভিক এবং চেংদু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন, সরকারের বিপুল বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি অধিগ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান প্রণালী ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য চীন এই বিমান শক্তিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে।
রাশিয়া, যার বহরে প্রায় ১,৫৯১টি যুদ্ধবিমান রয়েছে, এখনো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী আকাশ শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়, যদিও তারা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। রাশিয়ার বিমান বাহিনীর মূল ভরসা সোভিয়েত আমলের MiG-29, Su-27, Su-30 ও Su-35 যুদ্ধবিমান, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পঞ্চম প্রজন্মের Su-57 স্টেলথ ফাইটার। দেশটির সামরিক কৌশল বহুমুখী অভিযানে সক্ষমতা, আকাশে প্রাধান্য ও গভীর স্ট্রাইক ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে গঠিত, যার পেছনে রয়েছে তাদের বিস্তৃত স্থলসীমান্ত ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক আগ্রহ। সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক অভিযানে তাদের বিমানবাহিনীর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে।
ভারত, প্রায় ৬৯৪টি যুদ্ধবিমান নিয়ে, তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে। ভারতীয় বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী মিলে একাধিক উৎস থেকে সংগৃহীত প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করে। রাশিয়ান Su-30MKI ও MiG-29, ফরাসি Rafale ও দেশীয় HAL Tejas বিমান ভারতের বহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক ভারতের বিমান সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ভারতীয় বিমানবাহিনী এখন নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধ, স্ট্র্যাটেজিক স্ট্রাইক ও ইন্টারঅপারেবিলিটি বৃদ্ধির দিকে মনোযোগী। তাদের বহরে রাশিয়ান, পশ্চিমা ও দেশীয় প্রযুক্তির সমন্বয় একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা এশিয়ার আকাশে ভারতের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করে।
উত্তর কোরিয়া আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় ৫৭২টি যুদ্ধবিমান নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। তবে সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও এসব বিমানের গুণগত মান তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে। উত্তর কোরিয়ার বিমানবাহিনীর বেশিরভাগ বিমান সত্তরের দশকের সোভিয়েত MiG-21 ও MiG-23। কিছু MiG-29 থাকলেও সেগুলোর প্রযুক্তি এখন পুরনো হয়ে গেছে। তবুও এই বিশাল বহর দেশটির প্রতিরক্ষা কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা মূলত প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ তৈরি করে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে দুর্বল হলেও উত্তর কোরিয়া সংখ্যার মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার হাতে রয়েছে প্রায় ৪৬৬টি যুদ্ধবিমান, যা আধুনিক প্রযুক্তি এবং উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে। দেশটির F-15K, F-16 ও F-35A বিমান তাদের বহরের মূল অংশ। পাশাপাশি দেশীয়ভাবে নির্মিত KF-21 ‘Boramae’ ফাইটার জেট দক্ষিণ কোরিয়ার বিমান প্রযুক্তিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। দেশটি তার ভূরাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় বিমানবাহিনীকে সর্বদা প্রস্তুত রাখে এবং মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
পাকিস্তান, যার হাতে রয়েছে প্রায় ৪৩৮টি যুদ্ধবিমান, তাদের বিমানবাহিনীতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের F-16, চীনের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মিত JF-17 Thunder এবং পুরোনো Mirage III ও Mirage V যুদ্ধবিমান। ভারতের সঙ্গে সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখা পাকিস্তানের জন্য একটি মূল কৌশলগত লক্ষ্য। সীমিত বাজেট সত্ত্বেও পাকিস্তান প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে কার্যকর একটি বিমানবাহিনী গড়ে তুলেছে। JF-17 প্রোগ্রাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এটি কম খরচে আধুনিকীকরণের পথ খুলে দিয়েছে।
মিশর, প্রায় ৩৪১টি যুদ্ধবিমান নিয়ে, আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় আকাশ শক্তি। তাদের বহরে রয়েছে মার্কিন F-16, রাশিয়ান MiG-29 এবং ফরাসি Rafale। বহরটির বৈচিত্র্য দেশটির বহুমুখী কূটনৈতিক অবস্থান প্রতিফলিত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিশর যুদ্ধবিমানের আধুনিকীকরণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। সিসাই উপদ্বীপে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, সুয়েজ খাল রক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারে এ বিমানবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সৌদি আরবের হাতে রয়েছে প্রায় ৩২৫টি যুদ্ধবিমান, যার মধ্যে রয়েছে উন্নত মানের F-15, ইউরোপীয় Typhoon এবং আধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানে এই বিমানবাহিনী সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। ইরানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সৌদি বিমানবাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ ক্ষমতা হিসেবে কাজ করছে। বিশাল অর্থনৈতিক সামর্থ্য সৌদি আরবকে আধুনিক বিমান কিনতে এবং প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ করার সুযোগ দিয়েছে। ভিশন ২০৩০-এর অংশ হিসেবে দেশটি স্থানীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগও নিচ্ছে।
জাপান তালিকার দশম স্থানে রয়েছে, যার হাতে রয়েছে প্রায় ২৯৭টি যুদ্ধবিমান। দেশটির সংবিধান যুদ্ধবিরোধী হলেও আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা Japan Air Self-Defense Force আধুনিক ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত। F-15J, দেশীয়ভাবে উন্নত F-2 এবং নতুন করে যুক্ত হওয়া F-35A বিমান জাপানের আকাশ প্রতিরক্ষার মূল অস্ত্র। চীন ও উত্তর কোরিয়ার হুমকি বেড়ে যাওয়ায় জাপান তার প্রতিরক্ষা নীতিতে পরিবর্তন এনে বিমান শক্তি বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক জোটও দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাকে আরও কার্যকর করে তুলেছে।
সবশেষে বলা যায়, এসব দেশের যুদ্ধবিমান বহরের আকার ও প্রকৃতি তাদের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং প্রযুক্তিগত লক্ষ্য অনুযায়ী গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো সংখ্যায় ও গুণমানে বিশ্বে শীর্ষে থাকলেও চীন ও রাশিয়া দ্রুত সেই ব্যবধান কমিয়ে আনছে। ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও পাকিস্তান নিজেদের নিরাপত্তা বাস্তবতার আলোকে বিমান শক্তিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে মিশর, সৌদি আরব ও জাপান নিজেদের আঞ্চলিক অবস্থান এবং মিত্রদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আকাশ শক্তিকে আধুনিক ও সক্ষম রাখছে। এই দশটি দেশই প্রমাণ করছে যে আধুনিক যুদ্ধ এবং প্রতিরক্ষায় আকাশ এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি।