ঢাকাসোমবার , ২৯ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বামহাতি মানুষ যে দেশে

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২০ মে ২০২৫, ৫:৫৯ বিকাল

Link Copied!

স্কুলে প্রথম দিন ক্লাসে বসে ছিল রাফি। বই-খাতা সামনে নিয়ে যখন সে লিখতে শুরু করল, পাশে বসা সহপাঠী খেই হারিয়ে ফেলল। রাফির কলম ধরা হাতটা ডান দিকে নয়, বাঁ দিকে। এই ‘বিপরীতমুখী’ আচরণ দেখে শিক্ষকও একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “বাম হাতে লেখা ঠিক না, এটা বদলাতে হবে।” ছোট্ট রাফির মনে তখন একটা প্রশ্নই ঘুরছিল: “আমি কি ভুল কিছু করছি?”

বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ শিশু রাফির মতো প্রতিদিন এমন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়। কারণ তারা বামহাতি, যাদের সংখ্যা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। অথচ এই ‘অন্যরকমতা’কে অনেক সমাজেই সহজভাবে গ্রহণ করা হয় না। বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশের ফলে বামহাতিদের নিয়ে অনেক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠলেও, ভিন্ন দেশে ভিন্নভাবে এই বিষয়টির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে।

একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডস-এ বামহাতিদের হার সবচেয়ে বেশি—১৩.২৩ শতাংশ। এর কাছাকাছি আছে যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়াম, যেখানে এই হার যথাক্রমে ১৩.১০ শতাংশ। কানাডাতে ১২.৮০ এবং যুক্তরাজ্যে ১২.২৪ শতাংশ মানুষ বামহাতি। এইসব পশ্চিমা সমাজে বামহাতিকে একটি স্বাভাবিক বৈচিত্র্য হিসেবে দেখা হয় এবং সামাজিক বা শিক্ষাগত কাঠামোতেও সেই অনুযায়ী সমর্থন তৈরি করা হয়েছে।

এর বিপরীতে, অনেক এশীয় ও ল্যাটিন আমেরিকান দেশে বামহাতির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। যেমন মেক্সিকোতে মাত্র ২.৫০ শতাংশ মানুষ বামহাতি, দক্ষিণ কোরিয়ায় এই হার আরও কম—মাত্র ২ শতাংশ। চীনে বামহাতিদের হার ৩.৫০ শতাংশ, জাপানে ৪.৭০ শতাংশ এবং ভারতে ৫.২০ শতাংশ। এই পার্থক্য শুধুমাত্র জিনতাত্ত্বিক কারণে নয়—বরং এর পেছনে রয়েছে সাংস্কৃতিক বাধ্যবাধকতা, ঐতিহ্য, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ।

উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ এশীয় সমাজগুলোতে বাম হাতে খাওয়া কিংবা কাউকে কিছু দেওয়া অনুচিত বলে বিবেচিত হয়। অনেক পরিবারেই ছোটবেলা থেকেই শিশুদের ডান হাতে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এই চাপের ফলে প্রকৃত বামহাতিরাও ধীরে ধীরে ডান হাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং তাদের প্রকৃত পরিচয় আড়ালেই থেকে যায়।

অন্যদিকে, পশ্চিমা সমাজে এই ধরনের বাধ্যবাধকতা তুলনামূলকভাবে কম। সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস ও দৈনন্দিন জীবনের উপযোগী যন্ত্রপাতি—যেমন কাঁচি, ডেস্ক, কম্পিউটার মাউস—সবকিছুতেই বামহাতিদের উপযোগ বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর ফলে সেখানে বামহাতিরা তাদের প্রকৃতভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় এবং সমাজেও তাদের সংখ্যা প্রকৃতভাবেই বেশি দেখা যায়।

এই বৈচিত্র্য আরও স্পষ্ট হয় যখন ইউরোপীয় দেশগুলোর দিকে নজর দেওয়া হয়। আয়ারল্যান্ডে বামহাতির হার ১১.৬৫ শতাংশ, সুইজারল্যান্ডে ১১.৬১ শতাংশ, ফ্রান্সে ১১.১৫ শতাংশ, ডেনমার্কে ১১ শতাংশ। ইতালি, সুইডেন, নরওয়ে, জার্মানি ও স্পেনে এই হার ৯.৬৩ থেকে ১০.৫১ শতাংশের মধ্যে।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় যে, ইউরোপীয় দেশগুলোতেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। এগুলোর পেছনে স্থানীয় ঐতিহ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা থাকতে পারে। যদিও পশ্চিম ইউরোপে গ্রহণযোগ্যতা বেশি, তবে পূর্ব ইউরোপ বা দক্ষিণ ইউরোপে এখনও কিছু রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান।

এইসব সংখ্যা দেখে মনে হতে পারে এটি নিছক একটি পরিসংখ্যানগত বিষয়। কিন্তু এর পেছনে আছে মানসিক চাপ, আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব, সামাজিক বৈষম্য এবং নিরবে সহ্য করে চলা এক দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। বিশেষত সেই সব দেশে যেখানে বামহাতি হওয়াকে এখনো নেতিবাচক চোখে দেখা হয়।

অনেক সময় বিদ্যালয়ে বামহাতিদের খাতা লেখা, চিত্রাঙ্কন, কিংবা কীবোর্ড ব্যবহার করতেও বাড়তি প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। এমনকি পরীক্ষায় খারাপ হাতের কারণে তাদের লেখা অস্পষ্ট বা ধীরগতির হয়ে পড়তে পারে, যার ফলে মূল্যায়নেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সমস্যা আরও গভীর হয় যখন কোনো শিক্ষকের মানসিকতা হয় একমুখী—যেখানে “বাঁ হাত মানেই ভুল।”

অবশ্য আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে এখন বামহাতিদের নিয়ে ইতিবাচক গবেষণা হচ্ছে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, বামহাতিরা সৃজনশীল কাজে, যেমন সংগীত, চিত্রকলায় তুলনামূলকভাবে দক্ষ। আবার কিছু গবেষণায় বলা হয়, বামহাতিদের মস্তিষ্কের কিছু অংশ দ্বিমাত্রিক চিন্তায় ভালো কাজ করে—যার ফলে কিছু নির্দিষ্ট খাতে তারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে।

তবে এসব দক্ষতা প্রকাশের জন্য দরকার সমাজের সহযোগিতা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ, যেখানে একটি শিশুকে তার প্রকৃত বৈশিষ্ট্য নিয়েই বেড়ে উঠতে দেওয়া হবে।

রাফির গল্পটা এখানেই শেষ হয়নি। উচ্চমাধ্যমিকে গিয়ে সে একজন শিক্ষক পেল যিনি তার বাম হাতে লেখাকে দোষের নয়, বরং বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে দেখেছিলেন। সেই শিক্ষক তাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন নিজের মতো করে কাজ করতে, এবং সেই বিশ্বাসই তাকে তার লেখালেখিতে সাহস জুগিয়েছিল।

এমন শিক্ষকের সংখ্যা বাড়লে সমাজে রাফির মতো শিশুরা হয়তো তাদের বামহাতটি আর গুটিয়ে ফেলবে না। বরং সাহস করে হাত বাড়িয়ে দেবে—নিজের স্বতন্ত্রতাকে গর্বের সঙ্গে প্রকাশ করতে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস