
এক সকালে, হালকা কুয়াশায় ঢাকা গ্রামের পেছনের পাকা রাস্তা ধরে হাঁটছিলেন আশি ছুঁইছুঁই বৃদ্ধ শামসুল হক। মাথায় সাদা টুপি, হাতে লাঠি, আর চোখে হাজারো অভিজ্ঞতার ছায়া। পথের ধারে বসে থাকা এক স্কুলছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, এখনকার দিনে মানুষ কতো বছর বাঁচে বলো তো?” ছেলেটি একটু ভেবে বলল, “অনেকেই বলে ৭০, কেউ কেউ ৮০, আবার কেউ নাকি ৯০-ও পেরোয়।” বৃদ্ধ হেসে বললেন, “আমার দাদার বয়স হয়েছিল ৯২, আর আমি তো ৭৮-এ এসেও ভাবি—আর কতোদিন?”
এই সরল প্রশ্নটিই আজ বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য, উন্নয়ন ও জীবনের মান নিয়ে ভাবার মূল ভিত্তি। মানুষ বাঁচে কতদিন? এই প্রশ্নের উত্তরে পাওয়া তথ্য আমাদের বলে দেয় একটি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস, জীবনধারা, অর্থনৈতিক অবস্থা এমনকি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও। ২০২৩ সালের ওয়ার্ল্ডোমিটারের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে গড় আয়ু সর্বোচ্চ যে দেশগুলোতে, তাদের তালিকায় রয়েছে হংকং, ম্যাকাও, জাপান, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ আরও কিছু উন্নত ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার দেশ।
এ তালিকায় সবচেয়ে উপরের স্থানে রয়েছে হংকং, যেখানে গড় আয়ু ৮৫.৮৩ বছর। শহরটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত অত্যন্ত উন্নত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও দীর্ঘায়ু মানুষের জন্য। পরবর্তী স্থানেই রয়েছে ম্যাকাও—৮৫.৫১ বছর। আর জাপান, যার প্রবীণ জনগোষ্ঠী ও স্বাস্থ্যসচেতন সংস্কৃতি বহুদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে—৮৪.৯৫ বছর গড় আয়ু নিয়ে।
জাপানের জীবনযাত্রা পদ্ধতি, খাদ্যাভ্যাস (বিশেষত মৎস্য ও শাকসবজি নির্ভর), মানসিক শান্তি, ও সক্রিয় প্রবীণ সমাজ এই উচ্চ আয়ুর অন্যতম কারণ। দেশটির ওকিনাওয়া দ্বীপকে বলা হয় “সুপারসেন্টেনারিয়ানের ভূখণ্ড”—যেখানে শতবর্ষীদের সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে বেশি।
এশিয়া মহাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হচ্ছে সিঙ্গাপুর। দেশটির গড় আয়ু ৮৪.২৭ বছর। সুশৃঙ্খল নাগরিক জীবন, আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিমার বিস্তৃত কাভারেজ এই ফলাফলের প্রধান উপাদান।
তালিকায় ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানও উল্লেখযোগ্য। সুইজারল্যান্ড (৮৪.৩৮ বছর), ইতালি (৮৪.২০), স্পেন (৮৪.০৫), মাল্টা (৮৩.৮৫), সুইডেন (৮৩.৬৫), নরওয়ে (৮৩.৫৫) ও ফ্রান্স (৮৩.৩৫)—এসব দেশে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা উন্নত, এবং নাগরিকদের স্বাস্থ্যসচেতনতা অনেক উচ্চ।
এই দেশগুলোতে সাধারণত হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ইত্যাদি নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়। তাছাড়া, উচ্চ শিক্ষা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, এবং নিরাপদ খাদ্য সরবরাহও মানুষের দীর্ঘায়ুতে ভূমিকা রাখে।
অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও লুক্সেমবার্গও তালিকায় রয়েছে ৮২ থেকে ৮৪ গড় আয়ু নিয়ে। উন্নত বিশ্বের আরেক উদাহরণ যুক্তরাজ্য—যাদের গড় আয়ু বর্তমানে ৮২.৩১ বছর। একই গড় আয়ু নিয়ে স্লোভেনিয়া ও জার্মানি তালিকার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, চিত্র কিছুটা ভিন্ন। কাতার (৮১.৭৩), সংযুক্ত আরব আমিরাত (৮০.৪৬), কুয়েত (৮০.৪৫), মালদ্বীপ (৮১.০৭) এবং বাহরাইন (৮০.৬৯) অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে থাকলেও ভারত, ইরাক, এবং উজবেকিস্তানের চিত্র একেবারেই আলাদা।
ভারতে গড় আয়ু ৭২.০৩ বছর, আর ইরাকে মাত্র ৭২.০৫ বছর। উজবেকিস্তানে তা আরও কম—৭১.৭৮। এই তুলনামূলক নিম্ন আয়ুর পেছনে রয়েছে বিশুদ্ধ পানি, জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, অপুষ্টি, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব।
তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যটি হলো—এই যে উন্নত বিশ্বে মানুষ গড়ে ৮৩-৮৫ বছর পর্যন্ত বাঁচছে, আর বিশ্বের আরও অনেক অঞ্চলে এখনও ৭০ বছর পেরুনোটাই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্যবিধি, খাদ্যনিরাপত্তা, জনসচেতনতা এবং মৌলিক চিকিৎসা সুবিধার অপ্রতুলতা এই বৈষম্যের মূল কারণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নারীদের আয়ু পুরুষদের চেয়ে সাধারণত বেশি হয়ে থাকে। এই প্রবণতা প্রায় সব দেশেই লক্ষণীয়। এর পেছনে জেনেটিক উপাদান, জীবনযাত্রা পদ্ধতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ও অভ্যাসের তারতম্য বড় কারণ।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ হওয়া সত্ত্বেও তালিকায় পিছিয়ে রয়েছে—গড় আয়ু মাত্র ৭৯.৭৪ বছর। এর পেছনে রয়েছে স্থূলতা, অস্ত্রজনিত সহিংসতা, মাদকাসক্তি ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়বহুলতা।
বাংলাদেশের কথা এই তালিকায় নেই, তবে পূর্ববর্তী বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গড় আয়ু বর্তমানে প্রায় ৭৩ বছর। এটি আশাজনক, তবে উন্নত বিশ্ব থেকে এখনও অনেক পিছিয়ে। এখানে অপুষ্টি, নিরাপদ পানির অভাব, দূষণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা সেবার সীমাবদ্ধতা দীর্ঘায়ুর পথে বড় বাধা হয়ে আছে।
তবে ভালো দিক হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেকেই ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে মনোযোগ দিচ্ছে। টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টিবিষয়ক শিক্ষা, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন, এবং গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।
জীবনের পরিসমাপ্তি ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে তার মান এবং সময় কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। উন্নত জীবনধারা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মানসিক প্রশান্তি এবং সামাজিক নিরাপত্তা—এই উপাদানগুলোই দীর্ঘজীবনের চাবিকাঠি।
বৃদ্ধ শামসুল হকের সেই সকালে জিজ্ঞেস করা প্রশ্নের উত্তর আজ হয়তো এই তথ্য দিয়ে বোঝানো যায়—একটি দেশের মানুষ কতদিন বাঁচবে, তা নির্ভর করে কেবল গাছের ছায়া আর প্রাকৃতিক বাতাসের ওপর নয়, বরং রাষ্ট্রের নীতিমালা, নাগরিকের সচেতনতা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর। আর এ কারণেই বিশ্বের একেক অঞ্চলে জীবন এত ভিন্ন, আয়ুর মান এত বৈচিত্র্যময়।