ঢাকাসোমবার , ২৭ জুলাই ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য
  3. লাইফস্টাইল

৩৪ টুথপেস্টের ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক, উদ্বেগ শিশুদের পণ্যেও

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৮ সকাল

Link Copied!

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করা আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাস। দাঁত পরিষ্কার ও মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে যে টুথপেস্ট ব্যবহার করা হয়, সেটিই যদি অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উৎস হয়, তাহলে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে বাজারজাত ৩৪টি টুথপেস্টের ওপর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি কণা শনাক্ত হয়েছে মেডিপ্লাস ফ্লোরাইড জেল টুথপেস্টে। শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ESDO) পরিচালিত এক বছরব্যাপী গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের সুপারশপ, খুচরা দোকান ও পাইকারি বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাটি করা হয়। গবেষণার পাশাপাশি সারাদেশে ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর জরিপও চালানো হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের Environmental Health and Ecotoxicology Laboratory-তে স্টেরিওমাইক্রোস্কোপি ও FTIR স্পেকট্রোস্কোপি ব্যবহার করা হয়।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো সাধারণত ৫ মিলিমিটারের কম আকারের অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। এগুলো দুইভাবে তৈরি হতে পারে। কিছু কণা শুরু থেকেই ছোট আকারে তৈরি করা হয়, যাকে প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। আবার বড় প্লাস্টিক বর্জ্য সূর্যের আলো, তাপ, ঘর্ষণসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হলে সেগুলোকে সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়।

টুথপেস্টে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক দাঁত ব্রাশের সময় অল্প পরিমাণে গিলে ফেলার মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে টুথপেস্ট অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। আবার ব্রাশ করার পর টুথপেস্ট ধুয়ে ফেলার মাধ্যমে এসব কণা বর্জ্য পানির সঙ্গেও পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কোন টুথপেস্টে কত মাইক্রোপ্লাস্টিক

গবেষণায় সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে মেডিপ্লাস ফ্লোরাইড জেল-এ—প্রতি ১০০ গ্রামে ৩২০টি কণা। এরপর রয়েছে ক্লোজআপ রেড হট ও ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ, দুটিতেই ১৬০টি করে কণা।

এ ছাড়া কোডোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলা (স্ট্রবেরি)-তে ১৪০টি, সিগন্যাল গ্রিন টি-তে ১২০টি, পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট ও হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ার-এ ১০০টি করে এবং সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্ট-এ ৮০টি কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়া অন্য টুথপেস্টগুলোর মধ্যে রয়েছে—পেপসোডেন্ট সেনসিটিভ এক্সপার্ট, হোয়াইট প্লাস রেড, হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভ জেল, মেরিল বেবি (স্ট্রবেরি), সিগন্যাল হোয়াইটেনিং, মেডিপ্লাস টিজিপি, এম.পিএম. হারবাল, মেডিপ্লাস ডিএস, পেপসোডেন্ট জার্মিচেক, মেরিল বেবি (অরেঞ্জ), ম্যাজিক হারবাল, মেসওয়াক, ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ স্যাশে, ডেন্টিন জেল, পেপসোডেন্ট কিডস (অরেঞ্জ), ক্লোজআপ লেমন সি সল্ট, ব্রাশ আপ হোয়াইটেনিং জেল এবং হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটি।

শিশুদের টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক

গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো শিশুদের টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। ছয়টি শিশুতোষ টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতে এসব কণা পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে কোডোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলা (স্ট্রবেরি)-তে প্রতি ১০০ গ্রামে ১৪০টি, মেরিল বেবি (স্ট্রবেরি)-তে ৬০টি, মেরিল বেবি (অরেঞ্জ)-এ ৪০টি এবং পেপসোডেন্ট কিডস (অরেঞ্জ)-এ ২০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।

শিশুরা ব্রাশ করার সময় অনেক সময় টুথপেস্ট গিলে ফেলে। ফলে তাদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য এক্সপোজার নিয়ে উদ্বেগ তুলনামূলক বেশি। তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি সরাসরি কোনো রোগ সৃষ্টি করে—এমন চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

শরীরে ঢুকলে কী হয়

মানুষের রক্ত, মল, প্রস্রাবসহ বিভিন্ন জৈব নমুনা এবং শরীরের কিছু টিস্যুতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে এসব কণা শরীরে পাওয়া গেছে বলেই সেগুলো কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।

গবেষণাগুলোতে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবসহ বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। তবে মানুষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব সম্পর্কে সরাসরি প্রমাণ এখনো সীমিত।

অর্থাৎ, মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট টুথপেস্ট ব্যবহার করলে নিশ্চিতভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে এখনই করা যায় না। বরং বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা, নিয়মিত নজরদারি ও পণ্যের নিরাপত্তা যাচাই প্রয়োজন।

কেন টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগ

টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোবিড বা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ব্যবহারের বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত। যুক্তরাষ্ট্রে মাইক্রোবিডযুক্ত কিছু রিন্স-অফ কসমেটিকস ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাত নিষিদ্ধ করার আইন রয়েছে; এর আওতায় কিছু টুথপেস্টও পড়ে। তবে মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) জানিয়েছে, ওই আইন মূলত পরিবেশগত উদ্বেগ থেকে করা হয়েছিল, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রমাণিত হওয়ার কারণে নয়।

তাই টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি একদিকে ভোক্তা নিরাপত্তা ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে এসব কণা ব্যবহারের পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে।

৮ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়নি

গবেষণায় ৩৪টি নমুনার মধ্যে আটটিতে শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। এগুলো হলো—

প্যারোডন্ট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার
জেনফ্রেশ
প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো)
সেনসোডাইন ফ্রেশ জেল
কোলগেট ম্যাক্সফ্রেশ
ক্লোজআপ রেড হট জিঙ্ক ফ্রেশ টেকনোলজি
কোডোমো (অরেঞ্জ)
কোলগেট অ্যাকটিভ সল্ট

এর মধ্যে কোডোমো অরেঞ্জ ও প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো) শিশুদের জন্য তৈরি টুথপেস্ট।

তবে কোনো নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত না হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেটি সব ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ-এটি কেবল ওই গবেষণায় ব্যবহৃত পরীক্ষাপদ্ধতিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়নি, এমনটাই বোঝায়।

সচেতনতার বিকল্প নেই

গবেষণার ফলাফল সামনে আসায় ভোক্তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনভাবে পণ্য নির্বাচন করা। টুথপেস্ট কেনার সময় পণ্যের উপাদান, প্রস্তুতকারক ও মান নিয়ন্ত্রণের তথ্য দেখা যেতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে টুথপেস্ট ব্যবহারের সময় তাদের তত্ত্বাবধান করা এবং টুথপেস্ট গিলে না ফেলার অভ্যাস তৈরি করাও জরুরি।

একই সঙ্গে শুধু ভোক্তার সচেতনতার ওপর নির্ভর না করে বাজারে থাকা টুথপেস্টের নিয়মিত মান পরীক্ষা, মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তকরণে কার্যকর নজরদারি এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি। কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু একটি পণ্যের বিষয় নয়; এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উদ্বেগ।

গবেষণায় ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর চালানো জরিপে ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা আগে কখনো মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে শোনেননি। ফলে গবেষণার ফলাফল শুধু টুথপেস্টের মান নিয়েই নয়, ভোক্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

রাজবাড়ীতে রেলগেটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, বিচ্ছিন্ন ৬ ওয়াগনের ধাক্কায় নিহত ২

প্রযুক্তির বিপ্লব: বৃষ্টির ফোঁটা থেকেই মিলবে বিদ্যুৎ

জুলাইয়ের ২৫ দিনেই ২৩০ কোটি ডলারের কাছাকাছি রেমিট্যান্স

আগাম ভিসা ছাড়াই এশিয়ার যেসব দেশে যেতে পারেন বাংলাদেশিরা

হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, নতুন রোগী ১১৬০

রাঙ্গাবালীতে ৩ লাখ টাকার অবৈধ জাল জব্দ, পুড়িয়ে ধ্বংস

বাউফলে সড়ক দুর্ঘটনায় ভিক্ষুক নিহত

দেশের ২০ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ: মির্জা ফখরুল

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন মেনে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রচারের আহ্বান

মাটি থেকেই তৈরি হচ্ছে খাঁটি লবণ!

আধুনিক সুবিধায় দ্রুত চালু হবে খানজাহান আলী বিমানবন্দর

২০২৭ সালের মধ্যে রাজশাহীতে মিলবে পদ্মার বিশুদ্ধ পানি