
অন্ধকারে আলোর খোঁজে মানুষ যাত্রা শুরু করে। কখনো জীবিকার জন্য, কখনো নিরাপত্তার জন্য, কখনো স্বাস্থ্যসেবার আশায়। পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে ছুটে চলে মানুষ—যেখানে জীবন একটু ভালো হবে, যেখানে সন্তান একটু নিরাপদে বড় হবে, যেখানে বৃদ্ধ বাবা-মা একটু চিকিৎসা পাবে। কিন্তু সব দেশ তো সমান নয়, সবখানেই তো জীবন একরকম নয়। কিছু দেশ আছে যেখানে জীবনধারণ রীতিমতো যুদ্ধ। সেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত লড়ছে দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা, দূষণ, মূল্যস্ফীতি কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে।
২০২৫ সালের ‘কোয়ালিটি অব লাইফ ইনডেক্স’ বা ‘জীবনমান সূচক’ আমাদের সামনে তুলে ধরেছে সেই চিত্র। এই সূচক তৈরি করেছে ‘নম্বেও’ নামের একটি স্বাধীন গবেষণা সংস্থা, যারা বিশ্বব্যাপী জনসাধারণের তথ্যভিত্তিক অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে একটি তুলনামূলক তালিকা তৈরি করে। এখানে বিবেচনায় নেওয়া হয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচক—যেমন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয়, ক্রয়ক্ষমতা, পরিবেশ দূষণ, যানজট এবং আবহাওয়াগত সুবিধা। সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে উঠে এসেছে এমন ২৫টি দেশের নাম, যেখানে ২০২৫ সালে মানুষের জীবনমান সবচেয়ে নিচে।
নাইজেরিয়া, এই তালিকার শীর্ষে। আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল দেশ, যেখানে তেলসম্পদ থাকার পরেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন রীতিমতো কষ্টকর। রাজনৈতিক দুর্নীতি, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট, জঙ্গিবাদ ও সংঘাত—সবকিছু মিলিয়ে নাইজেরিয়ায় বসবাস করা যেন প্রতিদিন এক সংগ্রাম। মানুষ বাঁচে, কিন্তু বাঁচার আনন্দ নেই। জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা ভঙ্গুর, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক এবং জীবনযাত্রার খরচ ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। যদিও বিগত দুই দশকে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে, তৈরি পোশাক খাত বিশ্বে একটি শক্ত অবস্থান নিয়েছে, তবে এই উন্নয়ন সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সমানভাবে পৌঁছায়নি। স্বাস্থ্যসেবার মান, নাগরিক নিরাপত্তা, যানজট, বায়ুদূষণ এবং নগর ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক দুর্বলতা বাংলাদেশকে জীবনমান সূচকে নিচে নামিয়ে এনেছে। ঢাকার মতো শহরে জীবনযাপন এখন মধ্যবিত্তদের জন্যও কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিচ্ছন্ন পানীয় জল, স্বাস্থ্যসেবা, ট্রাফিক, বিশুদ্ধ বায়ু—এসব যেন বিলাসিতা।
ভেনেজুয়েলা, দক্ষিণ আমেরিকার একটি তেলসমৃদ্ধ দেশ, তৃতীয় অবস্থানে। একসময় এই দেশ ছিল মহাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামের পতন দেশের ভেতরে এক অভাবনীয় মানবিক সংকট তৈরি করেছে। মুদ্রাস্ফীতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে মানুষের হাতে টাকা থাকলেও বাজার থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা সম্ভব হয় না। হাজার হাজার মানুষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে।
চতুর্থ স্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা, আমাদের প্রতিবেশী দ্বীপরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, খাদ্য ও জ্বালানির অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর মানুষের আস্থা কমেছে, এবং এই অনাস্থার ফলেই বারবার বিক্ষোভ, সরকারবিরোধী আন্দোলন দেখা দিয়েছে।
পঞ্চম স্থানে রয়েছে মিশর। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের সাথে লড়ছে। কায়রো এবং আলেকজান্দ্রিয়ার মতো বড় শহরগুলিতে বায়ু দূষণ ভয়াবহ, যানজট নিত্যদিনের সঙ্গী। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল, এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসা খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
ইরান, ষষ্ঠ স্থানে। দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক স্বৈরতান্ত্রিকতা—সব মিলিয়ে জনজীবন দুঃসহ হয়ে উঠেছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, নারীদের অধিকার হরণ এবং ধর্মীয় পুলিশি ব্যবস্থা ইরানের তরুণ প্রজন্মকে হতাশ করে তুলেছে। তারা ক্রমেই দেশত্যাগে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
পরবর্তী দেশগুলোও কমবেশি একই ধরণের সমস্যার মুখোমুখি। পেরু, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, লেবানন—এই দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং জননিরাপত্তার অভাব মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে লেবাননের অবস্থা ভয়াবহ; ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘণ্টায় ঘণ্টায় বন্ধ হয়, মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্যদ্রব্য কিনে খাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
আফ্রিকার কেনিয়া কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান—এই দেশগুলোর মধ্যবিত্ত শ্রেণি চরম চাপে আছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু আয় বাড়ছে না। স্বাস্থ্যসেবা সবার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, স্কুল-কলেজগুলোও যথাযথ শিক্ষাদান করতে পারছে না। দুর্নীতি যেন প্রশাসনের রক্তে মিশে গেছে।
এই তালিকায় রয়েছে আলবেনিয়া ও কাজাখস্তানের মতো ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার দেশও। আলবেনিয়া ইউরোপের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি, যেখানে কর্মসংস্থান সীমিত, এবং তরুণরা শিক্ষার পরপরই দেশের বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। কাজাখস্তান, যার বিশাল ভূখণ্ড আছে, কিন্তু জীবনমানের ক্ষেত্রে এখনও শহর-কেন্দ্রিক একচ্ছত্রতা বিদ্যমান; গ্রামীণ মানুষরা উন্নয়নের সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
চিলি, কলম্বিয়া, মরক্কো—এই তিনটি দেশের ক্ষেত্রেও জীবনযাত্রার ব্যয়, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রধান সংকট হিসেবে উঠে এসেছে। মরক্কোর গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে শিক্ষা ও চিকিৎসা সহজলভ্য নয়, এবং কলম্বিয়ায় মাদকচক্র ও সহিংসতা এখনও বড় সমস্যা।
আযারবাইজান, ইউক্রেন, রাশিয়া—এই দেশগুলোর অবস্থান তালিকার শেষে হলেও সমস্যা কম নয়। ইউক্রেন ২০২২ সালের যুদ্ধ পরবর্তী ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই ২০২৫-এ পা রেখেছে। পুনর্গঠন চলছে, কিন্তু মানুষের জীবন এখনও নিরাপদ নয়। বিদ্যুৎ, খাদ্য, পানি—এই মৌলিক জিনিসগুলো পাওয়া এখনো সহজ নয়। রাশিয়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকছে, এবং রাজনৈতিক রূঢ়তা জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।
তিউনিসিয়া, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা—এই তিনটি দেশ বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত। ব্রাজিলে সামাজিক বৈষম্য, অপরাধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং দুর্নীতির প্রভাব মানুষের ওপর মারাত্মক। আর্জেন্টিনায় দীর্ঘকাল ধরে মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিয়েছে, মানুষের সঞ্চয় ভেঙে পড়ছে, ক্রয়ক্ষমতা কমছে।
তালিকায় থাকা প্রতিটি দেশেরই সমস্যা ভিন্ন, কিন্তু একটি বিষয়ে সবাই একমত—মানুষ ভালো থাকতে চায়। জীবন মানে শুধু শ্বাস নেওয়া নয়, বরং সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা, নিরাপদে ঘুমানো, পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা। সেই জীবনের জন্যই মানুষ ঘর ছাড়ে, দেশ ছাড়ে, অজানার পথে পা বাড়ায়।
এই সূচক আমাদের মনে করিয়ে দেয় উন্নয়ন শুধু জিডিপি বাড়ানো নয়। উন্নয়ন মানে হলো—সবার জন্য নিরাপদ সমাজ গঠন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং জনঅংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা।
যেখানে এই বিষয়গুলো নিশ্চিত হয়েছে, সেখানে মানুষ একধরনের মানসিক শান্তি পায়। আর যেখানে এগুলো নেই, সেখানে ভোগ্যপণ্য থাকলেও মানুষ স্বস্তিতে বাঁচতে পারে না। এই তালিকা তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি একটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবিক সংকেত। প্রতিটি দেশের জন্য এই তালিকা একটি আয়না, যেখানে তারা নিজেদের চেহারা দেখতে পারে, এবং অনুধাবন করতে পারে তারা কোথায় পিছিয়ে আছে, কোথায় উন্নয়ন দরকার।
২০২৫ সালের শেষে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, কিছু দেশের জন্য উন্নয়ন মানে একটি অলঙ্কার, যার ঝলকে বাস্তবতা ঢাকা পড়ে যায়। মানুষ বলছে, “আমরা উন্নয়ন চাই না, আমরা মানুষ হিসেবে বাঁচতে চাই।” রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই চাওয়ার সম্মান করা, এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
যতক্ষণ না প্রতিটি মানুষ এই পৃথিবীতে সম্মানজনকভাবে বাঁচার অধিকার পাবে, ততক্ষণ উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থাকবে। আর সেই অসম্পূর্ণতাই ফুটে উঠেছে এই জীবনমান সূচকের সবচেয়ে নিচের ২৫টি দেশের তালিকায়।