ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২৯ অক্টোবর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

১১৩০ কোটি টাকার তীর রক্ষা বাঁধ, কাজ শেষের আগেই ভাঙনে বিলীন ২০০ মিটার

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ অগাস্ট ২০২৬, ৩:৩৯ বিকাল

Link Copied!

পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে শরীয়তপুরের জাজিরায় ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে তীর রক্ষা বাঁধ। তবে কাজ শেষ হওয়ার আগেই নির্মাণাধীন বাঁধের বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে তিনটি এলাকায় প্রায় ২০০ মিটার বাঁধ নদীতে বিলীন হয়েছে। একই সঙ্গে নদীগর্ভে গেছে দোকানপাট ও গ্রামীণ সড়কের অংশ। ভাঙনের মুখে অন্তত ২৫টি পরিবার বসতবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও প্রায় ৩০০ পরিবার।

এ ঘটনায় নদীতীরের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অনেকে ঘরবাড়ি ও মূল্যবান মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ বসতভিটার গাছপালাও কেটে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। স্থানীয়দের প্রশ্ন, পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে প্রকল্প নেওয়ার পরও কাজ শেষ হওয়ার আগেই বাঁধ ভেঙে গেলে এর স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা কতটা?

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু এলাকার নাওডোবা থেকে জাজিরা ইউনিয়নের পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত নদীর দক্ষিণ তীরে ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। ৩৯টি প্যাকেজে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা।

পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের জিরো পয়েন্ট থেকে পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত ৮ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার অংশের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের মার্চে। ২০২৫ সালে প্রকল্পের একটি অংশে ভাঙন দেখা দিলে আরও দুই কিলোমিটার এলাকা প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয়। এরপরও নতুন করে ভাঙন দেখা দেওয়ায় প্রকল্পের কার্যকারিতা ও কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া ও ফরাজীকান্দি এবং নাওডোবা ইউনিয়নের পৈলান মোল্যারকান্দি ও আলম খারকান্দি এলাকায় ভাঙন তীব্র হয়েছে। এসব এলাকায় অন্তত সাতটি দোকান নদীতে বিলীন হয়েছে। কাথুরিয়া-মাঝিরঘাট সড়কের প্রায় ৫০ মিটার অংশও নদীগর্ভে চলে গেছে। এতে ওই সড়কে অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

কাথুরিয়া এলাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের তিনটি খুঁটি তারসহ নদীতে পড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। আকস্মিক ভাঙনে দিন-রাত আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

কাথুরিয়া গ্রামের রাহিমা বেগমের (৫৫) চার শতক বসতভিটা গত সোমবার পদ্মায় বিলীন হয়েছে। ১৮ বছর আগে স্বামীকে হারানো রাহিমা দুই সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকতেন। সংসারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় ঢাকায় হকারি করে কাপড় বিক্রি করেন তিনি।

বাড়ির শেষ মালামাল সরানোর সময় রাহিমা বলেন, ‘পরিবারে আয় করার মতো কেউ নাই। ঢাকায় হকারি কইরা কাপড় বিক্রি করি। বাড়ি ভাইঙা নিতে এলাকায় আইছি।’

কাথুরিয়ায় জ্বালানি তেল, এলপিজি ও মুদিপণ্য বিক্রি করতেন রেজাউল করিম। গত রোববার রাতে তার দোকানটি মালামালসহ নদীতে তলিয়ে যায়। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে বাঁধের কাজ চললেও নদীভাঙন থামেনি। চোখের সামনে দোকানসহ সব হারিয়ে তিনি এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

কাথুরিয়া গ্রামের নাজমা বেগমের (৬৫) জীবনেও পদ্মার ভাঙন বারবার বিপর্যয় ডেকে এনেছে। গত দুই দশকে ছয়বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে প্রায় ১০ বিঘা ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। এবার শেষ সম্বল হিসেবে থাকা ২০ শতক জমির বাড়িটিও ভাঙনের মুখে।

বাড়ির মালামাল সড়কের পাশে সরিয়ে রেখেছেন নাজমা। তিনি বলেন, ‘মধ্যবিত্ত কৃষি পরিবার ছিল আমাদের। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়েছি। শেষ আশ্রয়ের বাড়িটিও বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সন্তান ও অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না।’

ভাঙনের খবর পেয়ে পাউবোর কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কর্মকর্তারা বলছেন, আকস্মিকভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে। বাঁধসংলগ্ন প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা বর্তমানে ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পাউবো সূত্র জানায়, তীর রক্ষা বাঁধের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার এলাকায় নদীতীরে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছিল। বর্ষায় নদীর পানি ও স্রোত বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে নদীতে ওই কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্পের প্রয়োজনীয় ব্লক তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

শরীয়তপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, প্রকল্পের কাজ চলার সময় গত বছরও কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছিল। পরে ওই অংশের নকশা পরিবর্তন করা হয়। নকশা অনুমোদনের পর বর্ষার আগেই সেখানে আবার কাজ শুরু করা হয়েছিল। এর মধ্যেই নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, পদ্মার তীব্র স্রোত ও ভাঙন বিবেচনায় নিয়েই যখন তীর রক্ষা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তখন কাজ শেষ হওয়ার আগেই নির্মাণাধীন বাঁধের বড় অংশ ভেঙে পড়ল কেন এবং এর দায় কার? তাদের মতে, হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও যদি মানুষের বসতভিটা ও যোগাযোগব্যবস্থা রক্ষা করা না যায়, তাহলে প্রকল্পের নকশা, বাস্তবায়ন ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বর্ষায় পানি ও স্রোত আরও বাড়লে ভাঙন কোন দিকে গড়াবে, তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন নদীতীরের বাসিন্দারা। তাদের দাবি, স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে আরও পরিবারকে বসতভিটা হারিয়ে পথে বসতে না হয়।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চাঁদপুরের বাবুরহাটে সড়ক ও ফুটপাত দখল, ব্যবস্থা নিতে আদালতের নির্দেশ

শব্দদূষণের নতুন ৪ উৎস শনাক্ত করল পরিবেশ অধিদপ্তর

Renewable Energy Fest 2026 Ends with Call for a Just, Inclusive and Green Energy Transition

ন্যায্য ও সবুজ জ্বালানি রূপান্তরের আহ্বানে শেষ হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসব

ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা, সতর্ক করল বিশ্বব্যাংক

স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ৬৪

Bangladesh Completes First Government-Led Inter-Ministerial Climate Negotiator Training Ahead of COP31

কপ৩১ সামনে রেখে প্রথমবার সরকারি উদ্যোগে জলবায়ু নেগোশিয়েটরদের প্রশিক্ষণ

তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে ডিএসসিসি

DSCC to Take Effective Measures to Control Tobacco Use

স্ট্রোকে দ্রুত চিকিৎসা কমাতে পারে পঙ্গুত্ব ও মৃত্যুঝুঁকি

ঢাকা মেডিকেলে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট, ভোগান্তিতে রোগী ও স্বজনরা