
বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছুটা ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে স্মৃতিশক্তির গুরুতর সমস্যা বার্ধক্যের স্বাভাবিক অংশ নয়। নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, নতুন কিছু শেখার পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারেও নজর দিলে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে।
পুষ্টিবিদদের মতে, কিছু খাবারে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান মস্তিষ্কের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এবং প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে খাদ্যতালিকায় এসব খাবার রাখা মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ও স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টিবিদদের সুপারিশ করা ১০টি খাবার—
১. ব্রকলি

ব্রকলিতে প্রচুর ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এগুলো শরীরে প্রদাহ সৃষ্টিকারী ফ্রি র্যাডিকেলের বিরুদ্ধে কাজ করতে সাহায্য করে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা হ্রাসের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।
ব্রকলিতে থাকা ভিটামিন কে স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞানীয় কার্যকারিতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এটি স্মৃতি গঠনের সঙ্গে জড়িত কিছু প্রোটিনকে সহায়তা করে এবং স্নায়ুকোষ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।
ব্রকলি রোস্ট, বেক, গ্রিল বা স্টিম করে খাওয়া যায়। সালাদেও এটি যোগ করা যেতে পারে।
২. ব্লুবেরি

স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে খাদ্যতালিকায় ব্লুবেরি রাখা যেতে পারে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্কের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি প্রদাহ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্লুবেরিতে ফাইবারও রয়েছে। ফাইবার হজমের জন্য উপকারী এবং অন্ত্র ও মস্তিষ্কের পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে সুস্থ অন্ত্র মস্তিষ্কের শেখা ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হিপোক্যাম্পাসকে সহায়তা করতে পারে।
ব্লুবেরি সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি স্মুদি, দই, সিরিয়াল বা ওটমিলের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যায়।
৩. কুমড়োর বীজ

কুমড়োর বীজ ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভালো উৎস। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে, যা স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে জড়িত স্নায়ুকোষকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
এতে জিঙ্ক, ম্যাগনেশিয়াম, কপার ও আয়রনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজও রয়েছে। এসব পুষ্টি উপাদান মস্তিষ্কের স্নায়ু সংকেত, শেখা ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িত।
সালাদ, গ্র্যানোলা বা ট্রেইল মিক্সে কুমড়োর বীজ যোগ করে খাওয়া যায়।
৪. চর্বিযুক্ত মাছ

স্যামন, টুনা ও সার্ডিনের মতো চর্বিযুক্ত মাছ মস্তিষ্কের জন্য উপকারী খাবারের তালিকায় রয়েছে। এসব মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুকোষ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ওমেগা-৩ প্রদাহ কমাতে এবং হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতেও সাহায্য করে। আর মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি পেতে সুস্থ রক্তপ্রবাহের ওপর নির্ভর করে।
তাজা মাছের পাশাপাশি ক্যানজাত স্যামন, টুনা বা সার্ডিনও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
৫. চিয়া বীজ

চিয়া বীজে রয়েছে আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড বা এএলএ, যা উদ্ভিদভিত্তিক ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। এটি মস্তিষ্কের কোষগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগে সহায়তা করে এবং প্রদাহ কমিয়ে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা সমর্থন করতে পারে।
এএলএ স্বাস্থ্যকর কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার মাত্রা বজায় রাখা এবং হজমের ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে।
চিয়া বীজ দিয়ে পুডিং তৈরি করা যায়। এ ছাড়া স্মুদি, ওটমিল, দই কিংবা সালাদেও এটি যোগ করা যায়।
৬. আখরোট

আখরোটে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের জন্য উপকারী। এটি প্রদাহ কমাতে এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্যও এটি উপকারী, যা মস্তিষ্কে সুস্থ রক্তসঞ্চালনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সকালের ওটমিলে আখরোট যোগ করা, সালাদের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া বা হালকা নাশতা হিসেবে খাওয়া যেতে পারে।
৭. রাস্পবেরি

ব্লুবেরির মতো রাস্পবেরিতেও প্রচুর ফ্ল্যাভোনয়েড রয়েছে। এই উপাদান মস্তিষ্ককে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে।
রাস্পবেরিতে ফাইবারও রয়েছে, যা সুস্থ অন্ত্র বজায় রাখতে সহায়তা করে। সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি দই, ওটমিল বা স্মুদিতে রাস্পবেরি যোগ করা যায়।
৮. ডিম

ডিমে রয়েছে বি ভিটামিন এবং কোলিন। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও বিকাশের জন্য বি ভিটামিন গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে কোলিন নিউরোট্রান্সমিটার তৈরিতে ভূমিকা রাখে, যা মেজাজ ও স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ডিম শুধু সকালের নাশতায় নয়, দুপুর বা রাতের খাবার, সালাদ কিংবা হালকা নাশতা হিসেবেও খাওয়া যেতে পারে।
৯. ডার্ক চকলেট

ডার্ক চকলেটে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা জ্ঞানীয় ক্ষমতার জন্য উপকারী হতে পারে। এটি স্নায়ুকোষের প্রদাহ কমানো, মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়ানো এবং স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগে সহায়তা করতে পারে।
তবে চকলেট বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোকোর পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী ৭০ শতাংশ বা তার বেশি কোকোযুক্ত ডার্ক চকলেট বেছে নেওয়া যেতে পারে।
১০. গাঢ় সবুজ শাক

পালং শাক, কেল ও সুইস চার্ডের মতো গাঢ় সবুজ শাক নানা গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ। এতে ভিটামিন কে, ফোলেট, লুটেইন ও বিটা-ক্যারোটিন রয়েছে, যা জ্ঞানীয় কার্যকারিতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
এসব পুষ্টি উপাদান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবেও কাজ করে। ফলে স্নায়ুকোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এবং স্মৃতিশক্তির সমস্যার ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গাঢ় সবুজ শাক সালাদ হিসেবে, অলিভ অয়েল ও রসুন দিয়ে ভেজে কিংবা স্মুদিতে মিশিয়ে খাওয়া যায়।
যেসব খাবার কম খাওয়া ভালো
মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধু উপকারী খাবার খেলেই হবে না, কিছু খাবার কম খাওয়ার দিকেও নজর দিতে হবে। পুষ্টিবিদদের দেওয়া তথ্যে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, পরিশোধিত চিনি ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। এসব খাবার শেখা ও স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে কোনো খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া এবং গোটা শস্য, শাকসবজি, ফল, বাদাম, বীজ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেওয়াই ভালো।
স্মৃতিশক্তি ভালো রাখা শুধু একটি নির্দিষ্ট খাবারের ওপর নির্ভর করে না। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, নতুন কিছু শেখার অভ্যাস এবং ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস-সব মিলিয়েই মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় ব্রকলি, বেরি, মাছ, বীজ, বাদাম, ডিম ও সবুজ শাকের মতো পুষ্টিকর খাবার রাখার অভ্যাস করা যেতে পারে।