ঢাকাবুধবার , ১ জুলাই ২০২৬
  1. সর্বশেষ

রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে ব্যর্থ বিশ্ব, সংকটে বাংলাদেশ

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১ জুলাই ২০২৬, ৪:০৫ বিকাল

Link Copied!

হাসান মাহমুদ: কক্সবাজারের উখিয়ার পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পে দিগন্তজোড়া পলিথিনের ছাপরা ঘর। সূর্যাস্তের আলোয় যখন পুরো পৃথিবী শান্ত হয়ে আসে, তখন স্বামীহারা ফাতেমা বেগম তার দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে অপলক তাকিয়ে থাকেন দূরের পাহাড়ের দিকে—যেখানে তার জন্মভূমি, কিন্তু সেখানে ফেরার কোনো পথ আজ আর খোলা নেই। ফাতেমার মনে পড়ে রাখাইনের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা, যার দুঃস্বপ্ন আজও তার ঘুমের ঘোরে তাড়া করে বেড়ায়। ফাতেমার মতো এমন অসংখ্য মা উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়গুলোতে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন। তারা আজ কেবল শরণার্থী নয়, তারা এক হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মের প্রতিনিধি।

সম্প্রতি জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) তাদের ‘প্রজেক্টেড গ্লোবাল রিসেটেলমেন্ট নিডস ২০২৬-২৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা কেবল কিছু পরিসংখ্যান নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ২৪ লাখ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদার এক করুণ আর্তনাদ। এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে।

প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট:
চলতি বছরের জুন মাসের মাঝামাঝি জেনেভায় জাতিসংঘের সদর দপ্তরে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। এটি মূলত একটি জটিল গবেষণামূলক কাজ, যেখানে ইউএনএইচসিআর-এর ‘ডিভিশন অফ ইন্টারন্যাশনাল প্রোটেকশন’ এবং ‘গ্লোবাল ডেটা সার্ভিস’ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি আশ্রয়দাতা দেশের মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। প্রতিবেদনটির মূল লক্ষ্য হলো—বিশ্বনেতাদের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরা এবং ২০২৭ সালের মধ্যে শরণার্থী পুনর্বাসনের একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রদান করা।

প্রতিবেদনটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো পুনর্বাসনের হারের আশঙ্কাজনক পতন। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে মাত্র ৩৭ হাজার শরণার্থী পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। কেন এই ভয়াবহ পতন? বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন।

রাজনৈতিক রক্ষণশীলতা ও জাতীয়তাবাদ: পশ্চিমা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের ফলে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব তীব্র হয়েছে। অনেক দেশ জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে তাদের সীমান্ত ও পুনর্বাসনের দরজা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।

অর্থায়নের স্থানান্তর: ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নতুন সংঘাতের কারণে মানবিক সহায়তার তহবিলগুলো অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দাতারা এখন দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটের তুলনায় সাম্প্রতিক সংঘাতের দিকে বেশি নজর দিচ্ছেন, ফলে রোহিঙ্গা সংকটের তহবিলে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: প্রতিটি দেশে শরণার্থী যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া এতটাই জটিল ও আমলাতান্ত্রিক যে, অনেক ক্ষেত্রে পুনর্বাসনের আবেদন মঞ্জুর হওয়ার আগেই আবেদনকারীর জীবন বিষিয়ে ওঠে বা তিনি পুনরায় ঝুঁকির মুখে পড়েন।

# বিশ্বজুড়ে শরণার্থী পুনর্বাসনে চরম ব্যর্থ, বলছে জাতিসংঘ
# বাংলাদেশ বহন করছে ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভার
# পুনর্বাসনের হার গত বছরের তুলনায় অর্ধেক কমে এসেছে
# রক্ষণশীলতা ও জাতীয়তাবাদ সংকটকে আরও গভীর করছে
# রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইউনিসেফের উদ্বেগ প্রকাশ
# শিবিরের ভেতর অপরাধ ও উগ্রবাদ বৃদ্ধি পাওয়া চরম শঙ্কা
# শরণার্থীদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সময়ের বড় দাবি
# কার্যকর গ্লোবাল প্যাক্ট ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান অসম্ভব

জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কঠোর বার্তা:
এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের নীতিনির্ধারকরা। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সহকারী হাই কমিশনার (সুরক্ষা) রাউফ মাজু সাম্প্রতিক এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ যে অসামান্য উদারতা দেখিয়েছে, তা বিশ্ববাসীর জন্য একটি উদাহরণ। কিন্তু কেবল সহমর্মিতা দিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমরা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাঁধে এই বিশাল দায়িত্ব একা চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দায় এড়াতে পারি না। সময় এসেছে উন্নত দেশগুলোকে তাদের পুনর্বাসন কোটা কয়েক গুণ বাড়ানোর।’

অন্যদিকে, শরণার্থী শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইউনিসেফের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক সঞ্জয় উইসেসেকেরা বলেন, ‘আমরা যদি এখনই এই শিশুদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ না করি, তবে একটি পুরো প্রজন্ম হারিয়ে যাবে। শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা এই শিশুরা কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক বাধ্যবাধকতা।’

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
ইউএনএইচসিআর-এর চলতি বছরের জুন মাসের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ। গত আট বছরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভার বহন করে বাংলাদেশ মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কিন্তু এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। গত আট মাসে নতুন করে প্রায় ৬০-৭০ হাজার রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ সেই চাপকে আরও তীব্র করেছে।

এদিকে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের আগমনের ইতিহাস কয়েক দশকের। ১৯৭৮, ১৯৯২, ২০১২ এবং ২০১৭—এই চারটি বড় ধাপে রোহিঙ্গাদের স্রোত এসেছে বাংলাদেশে। তবে ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর যে গণহারে রোহিঙ্গারা প্রবেশ করে, তা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয়।

নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সামাজিক প্রভাব:
সাড়ে ১২ লাখ মানুষের এই বিশাল জনস্রোত কেবল মানবিক সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের বাজারে এই বিশাল জনসংখ্যার প্রভাব স্পষ্ট। শিবিরের ভেতরে ও বাইরে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি, চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং স্থানীয়দের সাথে শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদী মনোমালিন্য সামাজিক সংহতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয়রা নিজেদের এলাকায় এখন সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। এই উদ্বেগ কেবল একটি অঞ্চলের নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। শিবিরের ভেতরে উগ্রবাদী সংগঠনের তৎপরতা এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর রোহিঙ্গা তরুণদের টার্গেট করা নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়মিত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে আরসা (এআরএসএ) বা এ ধরনের সশস্ত্র গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ক্যাম্পের পরিবেশকে বারবার রক্তক্ষয়ী করে তুলেছে।

মানবিক পরিস্থিতির অবনতি:
শিবিরগুলোর মানবিক পরিস্থিতির চিত্র ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। দীর্ঘ আট বছর ধরে চলা এই অনিশ্চিত জীবনে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। একদিকে অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে একটি বিশাল প্রজন্ম শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে বেড়ে উঠছে। এই শিক্ষাবঞ্চিত ও কর্মসংস্থানহীন তরুণ প্রজন্ম শিবিরের ভেতরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা উগ্রবাদী সংগঠনের টার্গেটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সহায়তা ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে শিবিরের ভেতরের এই অবক্ষয় এখন কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মিয়ানমারের প্রত্যাবাসন নাটক:
মিয়ানমারের বর্তমান জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য যোগ্য হিসেবে ঘোষণা করাকে বিশ্লেষকরা কেবল মিয়ানমারের দীর্ঘমেয়াদী কূটচাল হিসেবে দেখছেন। আট বছরে একজন রোহিঙ্গাও ফিরে না যাওয়ার বাস্তবতায়, এই সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব কেবলই একটি প্রহসন। ২০১৮ সালের চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন ৩০০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও গত আট বছরে তার বাস্তবায়ন হয়েছে শূন্য। বর্তমান জন্মহার বিবেচনায় এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা শেষ হতে ১২ থেকে ২৪ বছর সময় লেগে যাবে, যা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে।

আন্তর্জাতিক মহলের দায়বদ্ধতা ও বর্তমান পরিস্থিতি:
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সমস্যাকে ‘বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে উপস্থাপন করার পেছনে জোরালো যুক্তি রয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অনেকগুলোই ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী হওয়া সত্ত্বেও তারা বর্তমানে দায়বদ্ধতা এড়ানোর ক্ষেত্রে নির্লজ্জতার পরিচয় দিচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উত্তর আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো ধনী রাষ্ট্রগুলো যখন নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তাদের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। তখন প্রশ্ন ওঠে—মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাগুলো কি কেবল নির্দিষ্ট দেশের জন্য?

জলবায়ু উদ্বাস্তু ও ‘৫০ বাই ৩৫’ ভিশন:
প্রতিবেদনে শরণার্থী সংজ্ঞার বাইরে থাকা ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ বা ‘ক্লাইমেট রিফিউজি’দের নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তীব্র খরায় লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের সুরক্ষা দেওয়ার মতো কোনো আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো নেই। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে এখন জলবায়ু উদ্বাস্তুদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে।

একই সঙ্গে আশার আলো হিসেবে কাজ করছে ‘৫০ বাই ৩৫’ ভিশন, যার লক্ষ্য হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী শরণার্থী সংকট অর্ধেকে নামিয়ে আনা। এর জন্য প্রয়োজন পুনর্বাসন কোটা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো, শরণার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের স্বনির্ভর করে তোলা এবং ডিজিটাল পরিচয়পত্র প্রদানের মাধ্যমে তাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা। মূলত, এই রূপরেখাটি শরণার্থীদের জন্য কেবল বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা নয়, বরং একটি মর্যাদাপূর্ণ ও স্বনির্ভর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়।

কূটনৈতিক কৌশল:
বাংলাদেশ এখন আর কেবল ত্রাণ সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে কোটা ভিত্তিক পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। বর্তমান বিএনপি সরকারের মূল কূটনৈতিক অবস্থান হলো—ত্রাণের মোহ থেকে বেরিয়ে এসে বড় দেশগুলোকে দায়বদ্ধতার আওতায় আনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, এই সংকটকে কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার গণ্ডিতে আটকে রাখা একটি বড় ভুল। তিনি বলেন, বিশ্বমঞ্চে আমাদের এখন এমন একটি ‘গ্লোবাল প্যাক্ট’-এর দাবি তোলা উচিত, যা কেবল ত্রাণ নয়, বরং দায়বদ্ধতার বন্টন নিশ্চিত করবে। এটি এমন একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম হবে, যেখানে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোটায় শরণার্থী গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় শরণার্থীদের দায়ভার কোনো একটি দেশের ওপর ছেড়ে দেওয়া অমানবিক এবং অকার্যকর।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, এই ‘গ্লোবাল প্যাক্ট’-এর সফলতার জন্য আমাদের ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতিকে আরও সংহত করতে হবে। আমাদের কেবল পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, বরং মিয়ানমারের মিত্রদেশগুলো—যাদের ওপর জান্তা সরকারের সরাসরি প্রভাব রয়েছে—তাদেরকে এই চুক্তির আওতায় আনতে হবে।

তার মতে, এই চুক্তিতে যদি আঞ্চলিক শক্তিগুলো (ভারত, চীন ও আসিয়ানভুক্ত দেশসমূহ) সরাসরি সম্পৃক্ত না হয়, তবে কোনো আন্তর্জাতিক প্যাক্টই টেকসই হবে না। তাই, বাংলাদেশের উচিত এই দেশগুলোকে মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে রাজি করানো, যাতে তারা বাধ্য হয়েই শরণার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন পরিবেশ নিশ্চিত করতে সম্মত হয়।’

গত ২০ জুন জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘রোহিঙ্গা সংকট: মানবিক সহায়তা ও স্থায়ী সমাধান’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের একটি প্যানেল আলোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি বিশ্ববিবেকের চরম ব্যর্থতার দলিল। গত আট বছর ধরে বাংলাদেশ ১১ লক্ষাধিক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বকে দৃষ্টান্ত দেখালেও আজ এটি আমাদের অর্থনীতির ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক মহলের নজর সরে যাওয়ায় আমাদের প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা ধীর হয়ে পড়ছে। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, কেবল ত্রাণ সহায়তায় এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব নয়। মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপের পাশাপাশি শরণার্থীদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জরুরি। বিশ্ব সম্প্রদায়কে বুঝতে হবে, এই বিপর্যয় উপেক্ষা করা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও এক অশনিসংকেত।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

নিকোটিন ও তামাকজাত দ্রব্যের ওপর প্রস্তাবিত কর কমানোর প্রতিবাদে বিএনটিটিপি’র বিবৃতি

‘তীর’ ব্র্যান্ডের নামে নকল গমের ভূষি তৈরি, প্রতিষ্ঠানকে লাখ টাকা জরিমানা

পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে বাসচাপায় প্রাণ গেল সপ্তম শ্রেণির ছাত্রের

সারা দেশে আরও পাঁচ দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস, সাগরে লঘুচাপের সম্ভাবনা

ভেনেজুয়েলার জোড়া ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে প্রায় ৫৯ হাজার ভবন

নেপালে বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাব, নিধন করা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ হাঁস-মুরগি

উজানের ভারী বৃষ্টিতে উত্তরের নদ-নদীর পানি বাড়ছে, স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা

তৃণমূল পর্যন্ত শিশুদের আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে: সমাজকল্যাণমন্ত্রী

ময়ূর নদের বুকে দৃষ্টিনন্দন দুই সেতু, বদলে যাবে খুলনার প্রবেশপথ

দেশের বাজারে স্বর্ণ-রুপার দামে বড় পতন, আজ কত টাকায় বিক্রি হচ্ছে ভরি

বর্জ্য সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ, অতিরিক্ত ফিতে কোটি টাকার বাণিজ্য

মেক্সিকোতে ৬ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প