ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

যেখানে যুদ্ধের কোনো স্থান নেই: ২০২৫ সালের শান্তিপূর্ণ দশ রাষ্ট্র

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২৬ জুন ২০২৫, ১০:৩০ সকাল

Link Copied!

বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙে আজ। জানালার কাঁচে ছোট্ট শিশিরবিন্দুরা দাঁড়িয়ে আছে নিরবে। এমন সকালের সাথে একটা প্রশ্ন যেন মনের কোণে চুপচাপ বসে থাকে—আসলে কোথায় গেলে মানুষ সত্যিকার অর্থে ‘শান্তি’ খুঁজে পেতে পারে? এই প্রশ্নই যেন আমাদের এক নতুন যাত্রার ডাক দেয়—একটি যাত্রা যেখানে আমরা খুঁজে বের করব বিশ্বের দশটি সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশকে। গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০২৫ অনুসারে, এসব দেশ শুধু অশান্তি থেকে মুক্ত নয়, বরং নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতি, এবং মানবিক সহাবস্থানের এক চিত্ররূপ।

যাত্রার শুরু হয় সেই দেশ থেকে, যেটি গত দেড় দশক ধরে সবার ওপরে রয়েছে—আইসল্যান্ড। উত্তরের বরফে মোড়া এই দ্বীপজাত দেশটি যেন শান্তির প্রকৃত প্রতিচ্ছবি। এখানে যুদ্ধ নেই, সামরিক বাহিনী নেই, এমনকি পুলিশ সদস্যদেরও অধিকাংশ সময়ে অস্ত্র বহনের প্রয়োজন হয় না। ছোট্ট সমাজ, উচ্চমানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, এবং গভীর সামাজিক বন্ধন আইসল্যান্ডকে গড়ে তুলেছে এক আদর্শ শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে। দেশের মানুষজন যেন প্রকৃতির ভাষা বোঝে, এবং সেটিকে রক্ষা করাই তাদের সামাজিক দায়িত্ব।

এরপর আমাদের পা পড়ে আয়ারল্যান্ডে—সবুজ উপত্যকার দেশে, যেখানে ইতিহাস আর আধুনিকতা একসাথে সহাবস্থান করে। এক সময় সংঘর্ষ আর দাঙ্গার আখড়া হিসেবে পরিচিত এই দেশটি গত দুই দশকে শান্তিপূর্ণ সমাজে রূপান্তরিত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং সামগ্রিক কল্যাণ ব্যবস্থায় আগ্রগতি আনার পাশাপাশি আয়ারল্যান্ড বৈদেশিক নীতিতেও নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছে। ফলে দেশটি এখন শান্তিপূর্ণতার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি মডেল।

তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে নিউজিল্যান্ড। প্রশান্ত মহাসাগরের কোলে অবস্থিত এই দ্বীপদেশটি যেন প্রকৃতি ও মানবিকতাকে একই সুতোয় গেঁথে রেখেছে। মাওরি সংস্কৃতি ও পশ্চিমা মূল্যবোধের সম্মিলনে গড়ে ওঠা একটি বহুত্ববাদী সমাজ, যেখানে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করা হয় উদারতার সাথে। পুলিশ এখানে অস্ত্রবিহীন, সামাজিক নিরাপত্তা কার্যকর, এবং রাজনীতি বেশিরভাগ সময় গঠনমূলক আলোচনার মধ্য দিয়ে চলে। এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে সহিংসতা প্রায় নেই বললেই চলে।

চতুর্থ স্থানে রয়েছে ফিনল্যান্ড। ‘সিসু’—এই ফিনিশ শব্দটি বোঝায় মনের জোর ও ধৈর্য, যা যেন পুরো জাতির মধ্যেই রক্তের মতো প্রবাহিত। বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা, কম দুর্নীতিপূর্ণ প্রশাসন, এবং সমতার সংস্কৃতি ফিনল্যান্ডকে শান্তিপূর্ণতার দৃষ্টান্ত করে তুলেছে। এখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সমাজিক বিভাজন তৈরি হয় না। বরফে মোড়া এই দেশ তাই উত্তরের নিঃশব্দ সুর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব মানচিত্রে।

পঞ্চম স্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড—পাহাড়ঘেরা এক স্বপ্নের রাজ্য, যা যুগের পর যুগ নিরপেক্ষতার প্রতীক। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিরপেক্ষ থেকে দেশটি প্রমাণ করেছে, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা কিভাবে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে। দেশটির প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক ভোটাধিকার এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি সমাজে দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে। পাশাপাশি উন্নত অর্থনীতি, শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, এবং আন্তঃসম্পর্কে বিশ্বাসের ভিত্তি সুইজারল্যান্ডকে শান্তির আলোকবর্তিকা করে তুলেছে।

এরপর আমাদের পা পড়ে সিঙ্গাপুরে—একটি শহররাষ্ট্র, যা এশিয়ার বুকে গড়ে তুলেছে স্থিতিশীলতার ব্যতিক্রমী মডেল। কঠোর আইন, জনসচেতনতা, এবং প্রশাসনিক দক্ষতা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ নগর হিসেবে গড়ে তুলেছে। যদিও সমালোচকরা একে কখনো কখনো ‘আধা-গণতান্ত্রিক’ বলেন, তবে নাগরিক নিরাপত্তা, শিক্ষায় সমান সুযোগ এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা এই ছোট্ট দেশটিকে শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী এখানে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে।

সপ্তম স্থানে রয়েছে অস্ট্রিয়া—সঙ্গীত ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। ভিয়েনার রাস্তায় হাঁটলে বোঝা যায় কিভাবে ইতিহাস আর আধুনিকতা মিলে সমাজে ভারসাম্য তৈরি করে। ইউরোপের মাঝে অবস্থান করেও অস্ট্রিয়া সামরিক সংঘাতে জড়ায়নি দীর্ঘদিন। এখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জনমত নির্ভর প্রশাসন এবং মানবিক মূল্যবোধ একে শান্তির পরিণত রূপ দিয়েছে। অভিবাসীদের নিয়েও দায়িত্বশীল নীতি অনুসরণ করেছে দেশটি, যা সমাজে সহনশীলতা তৈরি করেছে।

অষ্টম স্থানে রয়েছে পর্তুগাল—আটলান্টিকের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক শান্তিময় উপকূলরাষ্ট্র। পর্তুগাল হয়তো ইউরোপের সবচেয়ে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ নয়, তবে মানবিক উন্নয়নের সূচকে দেশটির অগ্রগতি বিস্ময়কর। মাদকবিরোধী আইন সংস্কার, অপরাধ কমানোর কৌশল, এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে পর্তুগাল আজ শান্তির ক্ষেত্রে অন্যতম উদাহরণ। দেশটির রাজনীতি তুলনামূলকভাবে কম মেরুকরণপূর্ণ, ফলে সংঘাতের আশঙ্কাও কম।

ডেনমার্ক, তালিকার নবম স্থানটি দখল করে রয়েছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এই ছোট্ট দেশটি শান্তির সুনাম অর্জন করেছে তার সমতা-ভিত্তিক সমাজ কাঠামোর মাধ্যমে। এখানে শিক্ষার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার এবং অভিবাসন নীতিও উন্নতমানের। ডেনমার্কে দুর্নীতির হার খুবই কম, প্রশাসন কার্যকর এবং পুলিশ-বিচার ব্যবস্থা জনগণের আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস সমাজে সহনশীলতা ও সংহতি বাড়িয়েছে।

শেষে রয়েছে স্লোভেনিয়া—এক সময়ের যুগোস্লাভিয়ার অংশ হলেও এখন এক নির্ভরযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত। মধ্য ইউরোপে অবস্থিত এই দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন বিখ্যাত, তেমনি বিখ্যাত এর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সমাজকল্যাণ ব্যবস্থা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ বিষয়ে স্লোভেনিয়ার অগ্রগতি প্রশংসনীয়। জনসংখ্যা কম হলেও সামাজিক সহনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দেশটিকে শান্তির পথে পরিচালিত করেছে।

এই দশটি দেশের প্রত্যেকটির গল্প আলাদা, ভূগোল আলাদা, ইতিহাস ভিন্ন। কিন্তু তাদের মাঝে একটি সাধারণ সুতোর বন্ধন রয়েছে—তারা সকলে সহনশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা, এবং মানবিক মূল্যবোধকে সবচেয়ে বড় করে দেখে। এসব দেশ কেবলমাত্র যুদ্ধবিমুখ নয়, তারা এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছে যেখানে মানুষ নিরাপদ, সম্মানিত এবং সুযোগপ্রাপ্ত বোধ করে।

তবে শান্তি শুধু প্রশাসনের অবদান নয়—এটি গড়ে ওঠে নাগরিকদের সচেতনতা, শিক্ষা, রাজনৈতিক সংযম, এবং সর্বোপরি পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে। এই দশটি দেশ বিশ্ববাসীর সামনে এক বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—যেখানে শক্তির নয়, বরং নীতির ভিত্তিতে শান্তি অর্জন সম্ভব। পৃথিবী হয়তো পুরোপুরি শান্তিময় হবে না কখনোই, কিন্তু এই দশটি দেশের দিকে তাকিয়ে অন্তত বলা যায়—শান্তির স্বপ্ন এখনও অসম্ভব নয়।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস