
হাসান মাহমুদ: জ্বর বা সামান্য কাশির জন্য আমরা যে অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে অভ্যস্ত, সেই ওষুধই এখন আমাদের শরীরে কাজ করছে না —এটিই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নীরব মহামারি। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার এই সংকট থেকে বাঁচাতে বিজ্ঞানীরা এখন নতুন এক যুদ্ধের পরিকল্পনা করছেন, আর এই যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র হলো ‘ব্যাকটেরিওফায’। সহজ কথায় এটি এমন এক ভাইরাস, যা মানুষের কোনো ক্ষতি না করে শুধুমাত্র রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করে।
মানুষের অসচেতনতায় ওষুধের যথেচ্ছ বা অসম্পূর্ণ ব্যবহার এবং ব্যাকটেরিয়ার প্রাকৃতিক বিবর্তন বা টিকে থাকার লড়ায়ের কারণে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার অ্যান্টিবায়োটিক আজ তার ধার হারাচ্ছে। আবার যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে ব্যাকটেরিয়াগুলো এখন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, যাদের চিকিৎসা পরিভাষায় বলা হচ্ছে ‘সুপার-বাগ’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সতর্কতা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় এক কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। অর্থাৎ, ছোটখাটো অস্ত্রোপচার বা সাধারণ সংক্রমণও এখন প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। এই চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানীরা ফিরে গেছেন প্রায় ১০০ বছর আগের এক বিস্ময়কর আবিষ্কারের দিকে—যার নাম ‘ব্যাকটেরিওফায’।
ব্যাকটেরিওফায কি?:
১৯১৭ সালে অণুজীববিজ্ঞানী ফেলিক্স ডি’হেরেল প্রথম ফাযের কার্যকারিতা শনাক্ত করেন। কিন্তু ১৯৪০-এর দশকে পেনিসিলিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিকের বিপ্লব ঘটলে এই ফায থেরাপি হারিয়ে যায় স্মৃতির অতলে। ব্যাকটেরিওফায হলো প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকা এমন এক ভাইরাস, যা শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে। এটি যেন ব্যাকটেরিয়া শিকারের এক নির্ভুল ‘স্মার্ট টর্পেডো’। মানবদেহের কোষে প্রবেশ না করে এটি সরাসরি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার কোষের দেয়ালে নিজের ডিএনএ প্রবেশ করিয়ে দেয়, যা ভেতর থেকে ব্যাকটেরিয়াটিকে বিস্ফোরিত করে ধ্বংস করে ফেলে।
কেন এটি অনন্য?:
প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক এবং ব্যাকটেরিওফাযের মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার ফলে শরীরের ভালো-মন্দ উভয় ধরনের ব্যাকটেরিয়াই ধ্বংস হয়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। কিন্তু ফায থেরাপি এতটাই সুনির্দিষ্ট যে, এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াকেই খুঁজে বের করে। এছাড়া, ব্যাকটেরিয়া ওষুধের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্স গড়ে তুললেও, ফাযগুলো বিবর্তিত হয়ে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে—যা তাদের অজেয় করে তোলে।
বৈশ্বিক গবেষণা ও সাফল্য:
২০২৬ সালের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের শীর্ষ ল্যাবরেটরিগুলোতে ফায থেরাপির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নতুন গতি পেয়েছে। সম্প্রতি স্ট্যানফোর্ড ও অক্সফোর্ডের গবেষকরা এমন সব জটিল সংক্রমণের নিরাময় ঘটিয়েছেন, যেখানে বছরের পর বছর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যর্থ হয়েছে। জার্নাল অব নেচার এবং দ্য ল্যানসেট-এর মতো আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে ধারাবাহিকভাবে এই থেরাপির অবিশ্বাস্য সব তথ্য উঠে আসছে। আধুনিক এআই টুল ব্যবহার করে এখন খুব দ্রুত নির্দিষ্ট রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় ফায শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
সান দিয়েগোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ইনোভেটিভ ফায অ্যাপ্লিকেশনস অ্যান্ড থেরাপিউটিকস’-এর সহ-পরিচালক ড. স্টেফানি স্ট্রেটল। তিনি নিজের স্বামীকে ফায থেরাপির মাধ্যমে সুপার-বাগের হাত থেকে বাঁচিয়ে বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যাকটেরিওফায হলো প্রকৃতির বিস্ময়কর এক উদ্ভাবন। যখনই কোনো ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্স গড়ে তোলে, ফায তখনই সেই ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করার নতুন কৌশল খুঁজে বের করে। আমরা যখন কোনো রোগীর ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করি, তখন এটি একটি নির্ভুল মিসাইলের মতো শুধু লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করে, শরীরের ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোকে অক্ষত রাখে। ফায থেরাপি এখন আর গবেষণাগারের কোনো কল্পনা নয়, এটি একটি প্রমাণিত জীবনরক্ষাকারী বাস্তব।’
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিনের অ্যাসোসিয়েট অধ্যাপক এবং ব্যাকটেরিওফায গবেষক ড. পল বল্ট বলেন, মানুষ মনে করে অ্যান্টিবায়োটিক হলো যুদ্ধের শেষ অস্ত্র। কিন্তু ব্যাকটেরিয়া যেভাবে বিবর্তিত হচ্ছে, তাতে আমাদের হাতে থাকা অস্ত্রের গুদাম ফুরিয়ে আসছে। আমরা ল্যাবে ফায নিয়ে কাজ করার সময় দেখছি যে, এরা শুধু ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংসই করে না, বরং ব্যাকটেরিয়া যখন বায়োফিল্ম (এক ধরনের সুরক্ষা স্তর) তৈরি করে নিজেকে আড়াল করে, ফায সেই স্তর ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। এই ধরনের নিখুঁত আক্রমণের ক্ষমতা অন্য কোনো ওষুধের নেই। এটিই হবে আগামীর ‘লিভিং মেডিসিন’।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বর্তমানে নীরব মহামারি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ড্রেনেজ সিস্টেম, পুকুর এমনকি নদীগুলোর পানিতেও এমন সব সুপার-বাগের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ক্রয়, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই যথেচ্ছ ব্যবহার এবং ওষুধের ডোজ সম্পন্ন না করার প্রবণতা—এই তিন মিলে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের হটস্পটে পরিণত করেছে।
এই চরম সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ফায থেরাপির জন্য এক বিশাল ‘আকর’ বা খনি হতে পারে। অণুজীববিজ্ঞানীদের মতে, ব্যাকটেরিয়া যেখানে টিকে আছে, সেখানেই তাদের শিকারি ভাইরাস বা ‘ফায’ বিদ্যমান। আমাদের দেশের অসংখ্য নদী, জলাশয় ও ড্রেন থেকে হাজার হাজার ব্যাকটেরিওফায সংগ্রহ করা সম্ভব। এই ফাযগুলোকে যদি সঠিকভাবে চিহ্নিত ও ল্যাবে পরিশোধন করা যায়, তবে তা বাংলাদেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন এবং বিভিন্ন দেশের সফল মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশে যদি একটি জাতীয় ‘ফায ব্যাংক’ তৈরি করা যায়, তবে এটি হবে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বর্তমানে অনেক জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় এবং সেগুলোও অনেক সময় কাজ করছে না। নিজস্ব ফায ব্যাংক গড়ে উঠলে বিদেশি ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা যেমন কমবে, তেমনি আইসিইউতে থাকা রোগীদের মতো সংকটাপন্ন রোগীদের সাশ্রয়ী ও কার্যকর চিকিৎসা প্রদান সম্ভব হবে।
তবে এই লক্ষ্য অর্জনে কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর জন্য প্রয়োজন নীতিনির্ধারকদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ বরাদ্দ এবং বায়ো-টেকনোলজিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, আইসিডিডিআর,বি এবং সরকারি গবেষণাগারগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণই আমাদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা যখন সুপার-বাগের আতঙ্কে উদ্বিগ্ন, তখন গবেষকগণ ফায থেরাপিকে দেখছেন নতুন আশার আলো হিসেবে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ড. স্টেফানি স্ট্রেটল যেমনটি বলেন, ‘এটি একটি নির্ভুল মিসাইলের মতো’, তেমনি স্ট্যানফোর্ডের ড. পল বল্ট একে আখ্যায়িত করেছেন ‘লিভিং মেডিসিন’ বা জীবন্ত ওষুধ হিসেবে। তাদের গবেষণাগারের সাফল্য এখন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) সংকটাপন্ন রোগীদের জীবনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করছে।