
রাস্তায় শুয়ে থাকা মানুষটির দিকে আমরা অনেকেই হয়তো নজর দিই না। শহরের ব্যস্ততায় তাদের উপস্থিতি যেন এক অনাহুত বাস্তবতা—যাকে আমরা মেনে নেই, কিন্তু স্বীকার করি না। অথচ বিশ্বে লাখো নয়, কোটি কোটি মানুষ আজও “বাড়ি” নামক মৌলিক আশ্রয়ের অধিকার থেকে বঞ্চিত। ঘরহীনতা আজ আর শুধু গরিবের সমস্যা নয়—এটি একটি বৈশ্বিক মানবিক সংকট, যার পেছনে রয়েছে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, দুর্যোগ, অব্যবস্থাপনা এবং অনেক ক্ষেত্রে নিছক অমানবিকতা।
এই প্রতিবেদন আমরা উৎসর্গ করছি সেইসব মানুষদের প্রতি, যারা প্রতিদিন ঘরের পরিবর্তে আকাশের নিচে ঘুমান। এখানে তুলে ধরা হলো বিশ্বের সেই ১৫টি দেশের চিত্র, যেখানে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এর মাধ্যমে শুধু সংখ্যার ভয়াবহতা নয়, বরং এর পেছনের সামাজিক বাস্তবতাকেও অনুধাবন করার চেষ্টা করা হয়েছে।

পাকিস্তান: ৮০ লক্ষ গৃহহীন, প্রতিদিনের যন্ত্রণার চিত্র
এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তান, যেখানে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০ লক্ষ। প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ৩৩১ জন ঘরহীন। দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিশেষত বন্যা, খরা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে বহু মানুষ শহরের ফুটপাতেই আশ্রয় খুঁজে নেয়।
সিরিয়া: যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ছিন্নমূল মানুষের ঢল
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিরিয়া, যেখানে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ৫৩ লক্ষ। এই সংখ্যা দেশটির মোট জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ। গৃহযুদ্ধ, আইএস-এর উত্থান-পতন, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ—সবকিছু মিলিয়ে দেশের অভ্যন্তরেই লাখ লাখ মানুষ তাদের ঘর হারিয়েছেন। এই দেশেই প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে ২৩০২ জন গৃহহীন, যা এক কথায় বিস্ফোরক।
বাংলাদেশ: উন্নয়নের গতি, কিন্তু এখনও ৫০ লক্ষের বেশি গৃহহীন
আমাদের নিজস্ব বাস্তবতাও কম করুণ নয়। বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ গৃহহীন, অর্থাৎ প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে ৩০৭ জনের নেই নিজের কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই। বিশেষ করে ঢাকাসহ প্রধান শহরগুলোতে গ্রাম থেকে আসা দরিদ্র মানুষদের বিশাল অংশ ফুটপাত, রেলস্টেশন বা বস্তিতে আশ্রয় নেয়। শহরায়নের চাপে প্রান্তিক মানুষদের নিজস্ব জমি বা ঘর করার সামর্থ্য ক্রমেই কমছে।
ফিলিপাইন ও নাইজেরিয়া: শহরের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষ
ফিলিপাইনে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ৪৫ লক্ষ, অর্থাৎ প্রতি ১০ হাজারে ৪২৪ জন। দেশটির ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িতে বসবাস করা মানুষদের বড় অংশই প্রকৃত অর্থে গৃহহীন বলে গণ্য করা হয়।
নাইজেরিয়ায় সংখ্যাটি ৪৫ লক্ষ, তবে প্রতি ১০ হাজারে তুলনামূলক কম—২০৬ জন। আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক অবকাঠামো ও ভূমি নীতির দুর্বলতা এখানে গৃহহীনতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
উগান্ডা: ভূমি সংকট ও উদ্বাস্তু প্রবাহে সংকট
উগান্ডার চিত্র আরও ভিন্ন। দেশটিতে ৪০.২ লক্ষ মানুষ গৃহহীন, এবং প্রতি ১০ হাজারে সংখ্যাটি ১১২৫ জন—যা এই তালিকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আফ্রিকান অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু সমস্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ভূমি দখলের প্রবণতা গৃহহীনতা বৃদ্ধির মূল কারণ।
আর্জেন্টিনা, সুদান ও নেপাল: তিন মহাদেশের তিন রকম বাস্তবতা
দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনায় ৩৬ লক্ষ গৃহহীন রয়েছে (প্রতি ১০ হাজারে ৭৯৩ জন)। অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে গৃহ ভাড়া সামলাতে না পেরে হাজার হাজার মানুষ খোলা আকাশে জীবনযাপন করছে।
সুদানে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ৩০ লক্ষ, যেখানে রাজনৈতিক সহিংসতা, গৃহযুদ্ধ এবং ধর্মীয় বৈষম্য বিশেষভাবে দায়ী। হিমালয় ঘেরা নেপালেও প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ গৃহহীন। ২০১৫ সালের ভূমিকম্প, দুর্বল অর্থনীতি ও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তার অভাব এই সমস্যার মূলে।
চীন ও ভারত: বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া গৃহহীনতা
বিশ্বের সর্ববৃহৎ দুটি দেশের মধ্যে, চীনে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ২৫.৮ লক্ষ, তবে প্রতি ১০ হাজারে হার খুবই কম—মাত্র ১৯.২ জন। এর মানে, সংখ্যাটি যতটা বিশাল মনে হয়, অনুপাতে তা অনেকটাই কম।
ভারতে ১.১৭ লক্ষ মানুষ গৃহহীন বলে গণ্য হলেও প্রতি ১০ হাজারে হার মাত্র ১২.৬ জন। তবে ভারতের “হাউসলেস” ধারণা অনেক বেশি সীমিত। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ শহরের বস্তিগুলোকে অনেক সময় সরকারিভাবে গৃহনির্ভর বলে বিবেচনা করা হয়।
মিয়ানমার, ইরাক, মিশর ও কঙ্গো: দ্বন্দ্ব, দুর্যোগ ও দারিদ্র্যের দোলাচল
মিয়ানমারে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ১৫ লক্ষ, যার অন্যতম কারণ জাতিগত নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতি। ইরাকে দুই দশকের যুদ্ধ ও আইএস পরবর্তী অস্থিরতায় ২০ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। মিশরে, যেখানে পিরামিডের দেশ বলা হয়, সেখানেও ২০ লক্ষ মানুষ আশ্রয়হীন। আর ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে, যেটি আফ্রিকার খনিজসম্পদে ভরপুর দেশ, ১৫ লক্ষ মানুষ এখনও ঘর ছাড়া, যা আফ্রিকান মানবিক সংকটের প্রতীক।
ঘরহীনতা শুধু গরিবদের সমস্যা নয়
অনেকেই মনে করেন গৃহহীনতা কেবল দারিদ্র্যপ্রবণ দেশের সমস্যা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, উন্নত দেশেও এ সমস্যাটি বিদ্যমান—তবে ভিন্ন রূপে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতেও হাজার হাজার মানুষ ফুটপাত বা আশ্রয়কেন্দ্রে রাত্রি কাটায়। তবে এই তালিকায় তারা নেই, কারণ এক্ষেত্রে সংখ্যার পরিবর্তে অনুপাত গুরুত্বপূর্ণ।
গৃহহীনতা কেন বাড়ছে?
বিশ্বজুড়ে গৃহহীনতার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ:
১. দারিদ্র্য ও বেকারত্ব
২. যুদ্ধ, সহিংসতা ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু সমস্যা
৩. প্রাকৃতিক দুর্যোগ (ভূমিকম্প, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়)
৪. নগরায়ন ও ভূমি অধিগ্রহণ
৫. গৃহনির্মাণের উচ্চ ব্যয়
৬.সরকারি নীতির ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনা
সমাধানের পথ কোথায়?
বিশ্বব্যাপী গৃহহীনতা নিরসনের জন্য যেসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে:
১. সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প
২. ভূমি সংস্কার ও মালিকানার সহজীকরণ
৩. নগর দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয়
৪. উন্নয়নশীল দেশে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও তহবিল
৫. উদ্বাস্তু ও বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসন নীতি
৬. বিভিন্ন এনজিও ও সেবামূলক সংগঠনের কার্যকর ভূমিকা
একটি সমাজ কতটা মানবিক, তা বোঝা যায় তার সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের অবস্থা দেখে। আজ যখন আমরা চাঁদে ঘর বানানোর স্বপ্ন দেখি, তখন পৃথিবীরই কোটি মানুষ ঘরহীন অবস্থায় বেঁচে থাকে—এই বৈপরীত্যই আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার কথা।
ঘরহীনতা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি হাজার হাজার ভাঙা জীবন, বঞ্চিত শিশুকাল, এবং বিপন্ন ভবিষ্যতের নাম। রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি সচেতন মানুষের দায়িত্ব—এই মানুষগুলোর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা গড়ে তোলা।