
শহরের শেষপ্রান্তে একটা পুরোনো রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ে একটা বিশ্ববিদ্যালয়। উঁচু দেয়াল, ঘন সবুজ গাছের সারি, আর তার মাঝখানে শত শত তরুণ-তরুণীর কোলাহল। প্রতিদিন পৃথিবীর কোথাও না কোথাও এমন দৃশ্য চোখে পড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের। কিন্তু আপনি কি জানেন কোন দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে? এবং কেন? এর পেছনের গল্পটাও কিন্তু বেশ বৈচিত্র্যময়।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের চোখ রাখতে হবে ২০২৩ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত সংকলিত এক গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানে, যেখানে বিশ্বের শীর্ষ ২৫টি দেশকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যায় এগিয়ে আছে। এ তালিকা শুধু সংখ্যার দিক দিয়ে নয়, উচ্চশিক্ষার বিস্তার, জনসংখ্যা, নীতিনির্ধারণী লক্ষ্য, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বোঝার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারত। বিস্ময়কর হলেও সত্য, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫,৩৪৯টি। এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়—বরং এক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ভারত তার বিশাল জনসংখ্যাকে শিক্ষিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ‘গাঁও গাঁও মে বিদ্যালয়, শহর শহর মে বিশ্ববিদ্যালয়’—এই ভাবনাকে সামনে রেখেই তৈরি হয়েছে এক বিশাল শিক্ষাজাল।
এর পরেই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, যেখানে রয়েছে ৩,২৭৭টি বিশ্ববিদ্যালয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি সম্প্রতি শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। একটি দ্বীপ-রাষ্ট্র হওয়ায়, অঞ্চলভিত্তিক সমতা নিশ্চিত করতেই তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছড়িয়ে দিয়েছে সারা দেশে। ধর্মীয় শিক্ষার প্রচলন এবং স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রয়াস তাদের এই সংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
তৃতীয় স্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে রয়েছে ৩,১৮০টি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়, বরং গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক নেতৃত্ব তৈরির কেন্দ্র। হার্ভার্ড, এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড কিংবা ক্যালটেক—এসব নাম সারা বিশ্বের তরুণদের স্বপ্নের গন্তব্য। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিজ দেশের শিক্ষার্থীর চেয়েও বেশি।
৪ নম্বরে রয়েছে চীন, যার বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ২,৪৯৫টি। চীন গত দুই দশকে শিক্ষাখাতে যে বিপ্লব ঘটিয়েছে, তা অবাক করার মতো। কমিউনিস্ট শাসনের অধীনেও তারা প্রযুক্তিনির্ভর, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থায় দারুণভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা ‘ডাবল ফার্স্ট ক্লাস ইউনিভার্সিটি’ প্রকল্প চালু করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের স্থান সুসংহত করছে।
পঞ্চম স্থানে আছে ব্রাজিল, যার রয়েছে ১,২৬৪টি বিশ্ববিদ্যালয়। দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ এই দেশটি স্বাস্থ্য, প্রকৌশল ও কৃষি-শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও সরকারী ও বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। একই পথ অনুসরণ করছে মেক্সিকো, যার অবস্থান ছয় নম্বরে। তাদের রয়েছে ১,১৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়।
এরপর রয়েছে রাশিয়া ও জাপান, যথাক্রমে ১,০১০ ও ৯৯২টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। রাশিয়া ঐতিহাসিকভাবে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলভিত্তিক শিক্ষায় এগিয়ে, বিশেষ করে সোভিয়েত যুগে গড়ে ওঠা সিস্টেম আজো কার্যকর। জাপানেও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্র শক্তিশালী।
অষ্টম, নবম ও দশম স্থানে রয়েছে ফ্রান্স (৬২৫), জার্মানি (৪৬১) ও ইরান (৪৪০)। ইউরোপের এসব দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত গবেষণাকেন্দ্রিক এবং বেশ সুনামসম্পন্ন। ইরান তুলনামূলক রক্ষণশীল সমাজ হলেও প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিক্ষায় তাদের অগ্রগতি লক্ষণীয়।
পরবর্তী তালিকায় রয়েছে পোল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা ও ফিলিপাইন—যাদের প্রত্যেকের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৬৬ থেকে ৪০৮-এর মধ্যে। দক্ষিণ কোরিয়া এবং কানাডা দুটি দেশই শিক্ষার মান ও প্রযুক্তি-নির্ভর গবেষণায় বিখ্যাত। ফিলিপাইনেও উচ্চশিক্ষা ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে, বিশেষ করে বিদেশে কাজ করতে যাওয়া তরুণদের জন্য ইংরেজি-ভিত্তিক উচ্চশিক্ষা জনপ্রিয়।
পাকিস্তান ও মালয়েশিয়া যথাক্রমে ১৬ ও ১৭ নম্বরে, যাদের রয়েছে ৩৫৯ ও ৩৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দুটি দেশেই ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষা সমান্তরালে চলে। শিক্ষার ধর্মনিরপেক্ষতা ও কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনে তারা এখন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
ব্রিটেন তালিকায় ১৮ নম্বরে (৩৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়)। যদিও এই সংখ্যা তুলনামূলক কম, তবে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক মান সর্বজনবিদিত। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ কিংবা লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস-এর মত প্রতিষ্ঠান বিশ্বশিক্ষার মানদণ্ড নির্ধারণ করে।
ইউক্রেন, কলম্বিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া, স্পেন, তিউনিসিয়া ও তুরস্ক—এই সাতটি দেশ যথাক্রমে ১৯ থেকে ২৫ নম্বরে রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উচ্চশিক্ষায় তাদের ঐতিহ্য রয়েছে। নাইজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার মত আফ্রিকান দেশগুলো এখন শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন রূপান্তরের দিকে এগোচ্ছে।
এই তালিকাটি শুধু সংখ্যা নয়—বিশ্বে শিক্ষা বিস্তারের বৈচিত্র্য, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতিফলন ঘটায়। উন্নয়নশীল দেশগুলো যেখানে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের বিস্তারে ব্যস্ত, সেখানে উন্নত দেশগুলো এখন মান, গবেষণা ও প্রযুক্তির সমন্বয়কে প্রধান্য দিচ্ছে।
তবে সংখ্যাই শেষ কথা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান, শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত, গবেষণা, আন্তর্জাতিক র্যাংকিং, ও কর্মসংস্থানে সাফল্য—এই প্রতিটি সূচকই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি নির্ধারণ করে। তবুও, এই সংখ্যাগুলো আমাদের একটি চিত্র দেয়—বিশ্ব এখন জ্ঞানের প্রতিযোগিতায়, আর শিক্ষাই সেই প্রতিযোগিতার প্রধান হাতিয়ার।