
মুম্বাইয়ের একটি অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসকারী অঞ্জলি ও রোহিতের বিবাহিত জীবন দীর্ঘদিন ধরে অসুখী। তবুও তারা আলাদা হওয়ার কথা ভাবতেই পারছে না – পরিবারের চাপ, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা তাদের এই অসুখী সম্পর্কে আটকে রেখেছে। তাদের এই গল্প ভারতের মাত্র এক শতাংশ তালাকের হারের প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে স্টকহোমের এক অ্যাপার্টমেন্টে এলিনা ও মাইকেল শান্তিপূর্ণভাবে তাদের বিবাহবিচ্ছেদের পেপারস সাইন করছেন। সুইডেনের পঞ্চাশ শতাংশ তালাকের হার যেন তাদের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে।
বিশ্বজুড়ে তালাকের হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কিছু দেশে এই হার আশ্চর্যজনকভাবে কম, আবার কোথাও অবিশ্বাস্যভাবে বেশি। এই পার্থক্যের পেছনে কাজ করে সমাজের গভীরে প্রোথিত কিছু কারণ – আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং নারীর অবস্থান।
ভারতের মতো দেশগুলোতে তালাকের নিম্ন হার বোঝার জন্য আমাদের দেখতে হবে সমাজের গভীরে প্রোথিত রক্ষণশীল মূল্যবোধকে। এখানে বিবাহকে শুধু দুটি মানুষের মধ্যে সম্পর্ক নয়, বরং দুই পরিবারের মধ্যে এক অচ্ছেদ্য বন্ধন হিসেবে দেখা হয়। তালাক শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি সমগ্র পরিবারের জন্য এক ধরনের সামাজিক কলঙ্ক বয়ে আনে। এমনকি যেসব নারী সহিংসতার শিকার হন, তারাও প্রায়শই এই সামাজিক চাপের কারণে নির্যাতন সহ্য করে বিবাহিত থাকতে বাধ্য হন।
অন্যদিকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে তালাকের উচ্চ হার সেই সমাজগুলোর উদার ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দর্শনের প্রতিফলন। সুইডেন, ডেনমার্কের মতো দেশগুলোতে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী, এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা সমুন্নত। এসব দেশে তালাককে ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে গৃহীত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তালাকের হার বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি একটি জটিল চিত্র। একদিকে সৌদি আরবের মতো দেশে পুরুষরা খুব সহজেই তালাক দিতে পারেন, অন্যদিকে নারীরা তালাক চাইতে গেলে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হন। ইরানের চৌদ্দ শতাংশ তালাকের হার এই অঞ্চলের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি, যা হয়তো সমাজের পরিবর্তনশীলতার ইঙ্গিত দেয়।
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে তালাকের হার বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি ব্রাজিলের একুশ শতাংশ থেকে কলম্বিয়ার ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি পরিসর। এই অঞ্চলে ক্যাথলিক ধর্মের প্রভাব সত্ত্বেও তালাকের হার বাড়ছে, যা হয়তো সমাজের আধুনিকায়নেরই ফল।
এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতে তালাকের হার বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি জাপানের পঁয়ত্রিশ শতাংশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার ছেচল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি চিত্র। এই দেশগুলোতে ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ ও আধুনিকতার মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে, যা তালাকের হারে প্রতিফলিত হচ্ছে।
তালাকের এই বৈশ্বিক চিত্র আমাদের শেখায় যে, প্রতিটি সমাজের নিজস্ব গতিশীলতা আছে। কোনো সমাজের তালাকের হার শুধুমাত্র একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি সেই সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো, নারীর অবস্থান এবং সামাজিক মূল্যবোধের একটি জটিল সমীকরণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে তালাকের হার আরও বাড়তে পারে। এর পেছনে কাজ করবে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং আইনি ব্যবস্থার সহজীকরণ। তবে প্রশ্ন থেকে যায় – তালাকের উচ্চ হার কি আসলে সমাজের জন্য খারাপ? নাকি এটি একটি সুস্থ সমাজেরই প্রতিচ্ছবি যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের জীবন বেছে নিতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর এককভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এটা নিশ্চিত যে, একটি আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা সেইটাই, যেখানে মানুষ না শুধু বিবাহ বাঁধার স্বাধীনতা পায়, বরং প্রয়োজনে শান্তিপূর্ণভাবে বিচ্ছেদেরও সুযোগ পায় – সমাজের কুন্ঠা বা আর্থিক অনিশ্চয়তা ছাড়াই।