ঢাকাবুধবার , ৪ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

বিবাহিত জীবনে বিশ্বাসঘাতকতার বৈশ্বিক চিত্র: ২০২৫ সালের একটি পর্যালোচনা

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২০ জুলাই ২০২৫, ১:২৯ বিকাল

Link Copied!

বিবাহ একটি সামাজিক চুক্তি, যা গঠিত হয় ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতে। এই সম্পর্ককে ঘিরে প্রত্যাশা থাকে আজীবন স্থায়িত্ব ও একনিষ্ঠতার। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে বিবাহিত জীবনে বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রতারণা একটি গভীর সামাজিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দেশেই এটি নৈতিকভাবে নিন্দনীয় এবং আইনত অপরাধ হলেও, গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে বহু বিবাহিত পুরুষই তাদের সঙ্গীর প্রতি অনুগত থাকেন না। ২০২৫ সালের একাধিক জরিপ ও গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে এই রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন দেশের বিবাহিত পুরুষদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতার হার, সামাজিক প্রেক্ষাপট, এর পেছনের কারণ এবং এর ফলাফল।

বিশ্বজুড়ে প্রতারণার হার একরকম নয়, বরং অঞ্চলভেদে এর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডে ৫৬ শতাংশ বিবাহিত পুরুষ তাদের স্ত্রীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন বলে রিপোর্ট করা হয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ২৫ শতাংশ, চীনে ১৮ শতাংশ এবং জাপানে ৩১ শতাংশ। এই অঞ্চলে সংস্কৃতি, যৌনতার প্রতি সমাজের মনোভাব, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং নগরায়নের প্রভাবে পারিবারিক বন্ধন অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ইউরোপে বিবাহিত জীবনে প্রতারণার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। ডেনমার্কে ৪৬ শতাংশ, ইতালিতে ৪৫ শতাংশ, ফ্রান্সে ৪৩ শতাংশ এবং জার্মানিতে ৪০ শতাংশ পুরুষ বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে গমন করছেন বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। ইউরোপীয় সমাজে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, যৌন স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার প্রচলন এই প্রবণতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। ফ্রান্সে ‘এক্সট্রা-ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার’ অনেকাংশে সামাজিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে, যেখানে কিছু মানুষ একে জীবনধারার স্বাভাবিক রূপ বলেই মেনে নিয়েছেন।

উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার পরিস্থিতিও প্রায় একই রকম। যুক্তরাষ্ট্রে ৩৯ শতাংশ এবং ব্রাজিলে ৩৮ শতাংশ বিবাহিত পুরুষকে বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, সোশ্যাল মিডিয়া ও ডেটিং অ্যাপের ব্যাপক ব্যবহার এবং নগরজীবনের ব্যস্ততা অনেক ক্ষেত্রেই দাম্পত্য জীবনে অবিশ্বাস এবং দূরত্ব সৃষ্টি করছে।

আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কিছু ক্ষেত্রে প্রতারণার হার তুলনামূলকভাবে কম। মিশরে মাত্র ১০ শতাংশ এবং নাইজেরিয়ায় ২১ শতাংশ বিবাহিত পুরুষ বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে যুক্ত বলে রিপোর্ট করা হয়েছে। এই অঞ্চলে ধর্মীয় বিধিনিষেধ, সামাজিক নীতিমালা এবং পারিবারিক কাঠামো মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে থাকে। তবে বাস্তবতা হলো, এই কম হারের পেছনে অনেক সময় সত্য তথ্য প্রকাশ না করার প্রবণতাও দায়ী থাকে। ধর্মীয় সমাজে যৌনতা ও সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ সীমিত, ফলে অনেকেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গোপন রাখেন।

বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডের সমাজে ‘মিয়া নই’ অর্থাৎ দ্বিতীয় স্ত্রীর মতো সম্পর্ককে একসময় সামাজিকভাবে মেনে নেওয়া হতো। পাশাপাশি দেশটি যৌন পর্যটনের একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হওয়ায় সমাজে যৌনতার প্রতি উদার মনোভাব দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে। ডেনমার্কে নাগরিকদের মধ্যে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং যৌন অভ্যাসে উদারতা প্রচলিত, যেখানে অনেকে ‘ওপেন রিলেশনশিপ’কে স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করেন। ইতালির সামাজিক গঠনে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং ক্যাথলিক বিশ্বাসের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতি এক ধরনের সহনশীলতা দেখা যায়। ফ্রান্সের মানুষ যৌনতা ও রোমান্সকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ মনে করেন এবং এখানে দাম্পত্য জীবনের বাইরে সম্পর্ক গড়ে তোলা বহু যুগ ধরেই একটি চর্চিত বাস্তবতা।

যৌনতার বিষয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধ এবং সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব সবমিলিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা একটি বহুস্তরবিশিষ্ট সামাজিক বাস্তবতা। প্রযুক্তির প্রসার এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, সিগন্যাল, টিনডার, বাম্বলসহ বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে গোপন যোগাযোগ করা সহজ হয়ে গেছে। এসব অ্যাপে পরিচিতি গোপন রেখে নতুন সম্পর্কে জড়ানো এখন একটি সাধারণ প্রবণতা। ফলে সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতা অনেক ক্ষেত্রেই হুমকির মুখে পড়ছে।

তবে এসব জরিপ ও পরিসংখ্যানের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেকেই সামাজিক চাপের কারণে সত্য তথ্য দিতে চান না। অনেক দেশে যৌনতা নিয়ে জরিপ করা এখনো কঠিন বিষয়। আবার অনেক জরিপ শহরভিত্তিক হওয়ায় গ্রামীণ বাস্তবতা উপেক্ষিত থেকে যায়। এসব কারণে প্রকৃত চিত্র হয়তো আরও ভিন্ন হতে পারে।

এ বাস্তবতায় বিশ্বাসঘাতকতা শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং এটি সামাজিক শিক্ষার ঘাটতি, সম্পর্ক রক্ষার কৌশলের অভাব এবং আধুনিক জীবনের চাপের বহিঃপ্রকাশও বটে। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে একে শুধু ভালোবাসা দিয়ে নয়, বরং আন্তরিকতা, স্পষ্ট যোগাযোগ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে রক্ষা করতে হয়। যারা দাম্পত্য জীবনে দীর্ঘমেয়াদে সুখ খুঁজে পান, তারা শুধু আবেগ নয়—বুদ্ধিমত্তা ও দায়বদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দেন।

এই সমস্যা সমাধানে যৌনতা ও সম্পর্কবিষয়ক শিক্ষা, বিবাহপূর্ব ও বিবাহোত্তর কাউন্সেলিং, খোলামেলা আলাপ এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। সমাজ যত দ্রুত এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক আলোচনায় আসবে, তত দ্রুতই সম্পর্কের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্গঠিত হবে।

এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে Durex Global Sexual Wellbeing Survey, Statista, Pew Research Center, World Values Survey এবং Psychology Today-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক উৎসের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। সবশেষে বলা যায়, বিশ্বাসঘাতকতা কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সামাজিক সংকট—যার সমাধান প্রয়োজন সমবেত সচেতনতা, শিক্ষা ও মূল্যবোধের পুনর্গঠন।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

Xiaomi Unveils REDMI 17 5G Featuring a Snapdragon 5G Processor

স্ন্যাপড্রাগন ফাইভজি প্রসেসরসহ রেডমি ১৭ ফাইভজি উন্মোচন করল শাওমি

আগামী গ্রীষ্মের আগে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে: প্রধানমন্ত্রী

পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়তে সব প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দুই বিভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা

নেপালে অবতরণের সময় দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ, নিহত ১

বুয়েটের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হলেই মিলবে ই-রিকশার নিবন্ধন

সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হলে ডিলারশিপ বাতিল: কৃষিমন্ত্রী

গ্যাস সংকটের মধ্যে নোয়াখালীতে নতুন গ্যাসের সন্ধান

এক দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে পাঁচ গুণের বেশি

হিমালয়ে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা, ঝুঁকির মুখে প্রায় ৩ লাখ মানুষ

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে জরুরি প্রস্তুতি, কীসের আশঙ্কায় খাবার-পানি মজুতের পরামর্শ?